সরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ এবং আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি প্রেসের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত ১৫ থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত আলাদা আলাদা অভিযান চালিয়ে চক্রটির হোতাসহ পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে সংস্থাটি। সিআইডি বলছে, সংঘবদ্ধ এ চক্রটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস থেকে প্রশ্ন বের করে বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তা বিক্রি করত। এভাবে প্রশ্ন ফাঁস করে তারা কোটি কোটি টাকার সম্পদ বানিয়েছেন। তাদের এফডিআর হিসাবে জমা আছে লাখ লাখ টাকা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সিআইডির অভিযানে গ্রেপ্তাররা হলেন এসএম সানোয়ার হোসেন, জসিমউদ্দিন ভ‚ঁইয়া মুন্নু, মো. পারভেজ খান, জাকির হাসান দিপু ও মোহাইমিনুল ইসলাম বাঁধন। চক্রের হোতা জসিম ও তার ১৪ সহযোগীসহ অজ্ঞাতপরিচয় ১৫০ থেকে ২০০ জনের বিরুদ্ধে গত ২০ জুলাই মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা করেছে সিআইডি।
গতকাল দুপুরে সিআইডি সদর দপ্তরের সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন ফাঁস চক্রের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন সিআইডির সাইবার পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) শাহ আলম, বিশেষ সুপার এসএম আশরাফুল আলম, অতিরিক্ত বিশেষ সুপার কামরুল আহসান ও জ্যেষ্ঠ সহকারী সুপার সুমন কুমার দাস।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জ্যেষ্ঠ সহকারী সুপার সুমন কুমার দাস বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন একটি প্রেসে ১৯৮৮ সাল থেকে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের প্রশ্ন ছাপা হতো। ওই প্রেসের সঙ্গে প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্রের একটা যোগাযোগ ছিল। তাদের পরিবারের সদস্য কেউ কেউ ওই প্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এছাড়া প্রেসের কোনো সদস্য বা প্রশ্ন প্রণয়নের সঙ্গে যারা জড়িত থাকে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল চক্রটির। এর ভিত্তিতে এরা প্রশ্নগুলো প্রেস থেকে নিয়ে একটি বাসায় এসে পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের পড়াত। আমরা তদন্ত করছি, শিগগিরই এ বিষয়ে জানাতে পারব।’
লিখিত বক্তব্যে সুমন কুমার দাস বলেন, ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর এ চক্রের অন্যতম দুই হোতা সানোয়ার হোসেন ও মোহাইমিনুল ইসলাম বাঁধনকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করে সিআইডি। বাঁধনের কাছ থেকে বিভিন্নজনের কাছ থেকে নেওয়া ২ কোটি ২৭ লাখ টাকার চেক উদ্ধার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে সানোয়ার হোসেন জানান, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁসসহ বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্রের সঙ্গেও জড়িত। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় চক্রের অন্য হোতা জসিমউদ্দিন ভুইয়া মুন্নু এবং তার সহযোগী জাকির ও পারভেজকে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জসিম জানান, ২০১৩ সাল থেকে তারা ধারাবাহিকভাবে সরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে আসছেন। তার এ চক্রের সঙ্গে ৫০ জনের বেশি সহযোগী জড়িত। চক্রটি প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে আয়ের অর্থ দিয়ে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হয়েছেন।
সিআইডি কর্মকর্তা সুমন কুমার জানান, চক্রের হোতা জসিমউদ্দিনের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকার ৩৯টি চেক, ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা মূল্যের পারিবারিক সঞ্চয়পত্র, ১৪টি মোবাইল ফোন এবং তিনটি গাড়ি ও দুটি বাড়িসহ অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়া পারভেজের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের ৮৪ লাখ টাকার চেক এবং জাকিরের কাছে ৫৭ লাখ টাকার এফডিআর ও চেক পাওয়া গেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রেস এবং পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে প্রশ্ন বের করে সমাধান ও ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া দুটি চক্রকে চিহ্নিত করে সিআইডির সাইবার পুলিশ। ওই মামলায় ১২৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিটও দেয় সিআইডি। যার মধ্যে গ্রেপ্তার ছিল ৪৭ জন। এদের মধ্যে ৪৬ জনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।’