ডাক্তার নার্সদের টাকাও মেরে খেয়েছেন সাহেদ

হেন অপকর্ম নেই যে তা করেননি বহুমাত্রিক জালিয়াতিতে আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম। প্রতিটি সেক্টরই যেন গিলে খাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। বছরখানেক আগে রাজধানীর উত্তরার খ্যাতনামা একটি হোটেল ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে প্রায় নিজের নামেই করে ফেলেছিলেন সাহেদ। আর এ ক্ষেত্রে তাকে বেশি সহায়তা করেছেন পুলিশের দুই কর্মকর্তা ও তিন সাংবাদিক। ওই হোটেলটি নিজের মালিকানাধীন দেখিয়ে একটি ব্যাংক থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থাও পাকাপোক্ত করে ফেলেছিলেন। ওই হোটলেই করোনা চিকিৎসায় নিয়োজিত রিজেন্ট ও কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালের নার্সদের রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পাশাপাশি উত্তরা রিজেন্সি হোটেলে রাখা হতো চিকিৎসকদের। ওই দুই হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের থাকা-খাওয়ার বিল বাবদ বরাদ্দ ৫০ লাখ ১৮ হাজার ৪০০ টাকা সাহেদ আত্মসাৎ করেছেন বলে তথ্য মিলেছে। এছাড়া ডাক্তার-নার্সদের নিয়মিত দেওয়া হতো নিম্নমানের খাবার। আর এসব কাজে সাহেদকে সহযোগিতা করতেন কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ইতিমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে ওই দুই কর্মকর্তার নামে অভিযোগ গিয়েছে। যেকোনো সময় তাদের বরখাস্তের আদেশ আসতে পারে বলে জানা গেছে।

এদিকে নানা প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে সাহেদ প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। চাকরি দেওয়া, সরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের বদলি, রিকশা-ভ্যানের ভুয়া লাইসেন্স প্রদান ও জেল থেকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছাড়ানোর নামেসহ নানা উপায়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে এসব টাকা কামিয়েছেন তিনি। রিমান্ডে সাহেদ ও তার দুই সহযোগী গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে যেসব চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন তা খতিয়ে দেখতে এবং আরও তথ্য সংগ্রহে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক টিম। সাহেদকে দুই সহযোগীসহ গত বৃহস্পতিবার থেকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে র‌্যাব। ১০ দিনের রিমান্ডের প্রথম ৫ দিন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে।

সাহেদকে জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাহেদের প্রতারণার ক্ষেত্র ছিল বিভিন্ন সেক্টর। গত কয়েক বছরে চাকরি দেওয়া, সরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের বদলি, রিকশা-ভ্যানের ভুয়া লাইসেন্স প্রদান ও জেল থেকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছাড়ানোর নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য তিনি স্বীকার করেছেন। রিমান্ডে সাহেদ ও তার দুই সহযোগীর দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সাহেদের সঙ্গে জড়িতদের তালিকা তৈরি করে শিগগিরই সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হবে।’

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাহেদ একজন উঁচুমানের প্রতারক। তার কাছ থেকে নতুন নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সব সেক্টরেই তার প্রতারণা রয়েছে। তাকে যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তথ্য-প্রমাণ মিললেই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাহেদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৬০টি অভিযোগ পেয়েছে র‌্যাব। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে চাকরির আশ্বাসে অর্থ আত্মসাৎ, বদলি-তদবির, রিকশা-ভ্যানের ভুয়া লাইসেন্স প্রদান, পদ্মা সেতু প্রকল্পে পাথর-বালু ও বিটুমিন সাপ্লাইয়ের নামে প্রতারণা। সবশেষ জেল থেকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছাড়ানোর নামে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে মেরে দিয়েছেন সাহেদ।’

জাল টাকা উদ্ধারের ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় র‌্যাবের করা মামলাটি তাদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলেও জানান এ র‌্যাব কর্মকর্তা।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সরকার বেশ কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। তার মধ্যে প্রতারক সাহেদের মালিকানাধীন উত্তরা ও মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালকেও বাছাই করে। সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের রাখার জন্য কয়েকটি হোটেল নির্বাচিত করা হয়। এর মধ্যে কুয়েত-মৈত্রী ও রিজেন্ট হাসপাতালের জন্য নির্বাচন করা হয় উত্তরার মিলিনা হোটেল। বছরখানেক আগে ওই হোটেলটি জোর করে দখলে নেন সাহেদ। আর এ দখলবাজির পেছনে দুজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা ও তিন সাংবাদিককে সাহেদ ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নার্সদের থাকার জন্য হোটেল মিলিনার ৩৬টি কক্ষ চূড়ান্ত করা হয়। তাদের থাকা ও খাওয়া বাবদ প্রতিদিনই সরকারি বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করতেন সাহেদ। গত তিন মাসে নার্সদের জন্য বরাদ্দ করা ৫০ লাখ ১৮ হাজার ৪০০ টাকা তিনি লোপাট করেছেন বলে তথ্য মিলেছে। আর এ কাজে সাহেদকে কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার মো. সেহাব উদ্দিন ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আলিমুজ্জামান সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নার্সদের খাবার বিলসহ অন্যান্য জিনিসপত্র কেনার নামে সাহেদ বড় দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছিল। নার্সদের যে খাবার দেওয়ার কথা ছিল তার ধারেকাছেও ছিল না খাবারের মান। এই নিয়ে নার্সরা একের পর অভিযোগ করেছিলেন। সাহেদ হোটেলটি (মিলিনা) নিজের বলে চালিয়ে দিয়ে প্রতিটি কক্ষের জন্য প্রতিদিন ৮ হাজার ৫০০ টাকা করে টাকা হাতিয়ে নিতেন। এমনকি চিকিৎসকদের আবাসস্থল রিজেন্সি হোটেলের টাকাও সে মেরে দিয়েছে।’

এ র‌্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বছরখানেক আগে সাহেদ মূল মালিককে তাড়িয়ে দিয়ে মিলিনা হোটেলটি দখলে নেয়। এ হোটেলের নাম করে একটি ব্যাংক থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার বিষয়টিও চূড়ান্ত করেছিলেন। কিন্তু তার জালিয়াতি ধরা পড়ার পর ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষের টনক নড়ে। হোটেল মালিক আনোয়ার হোসেনকে পুলিশের দুই কর্মকর্তা ও তিন সাংবাদিক ভয়ভীতি দেখিয়েছিল বলে আমরা তথ্য পেয়েছি।’