কালোবাজারে ট্রেনের টিকিট

ঈদে দুর্ভোগ নিয়ে বাড়ি ফেরার চিরচেনা দৃশ্য নেই। ঈদুল আজহা আসন্ন হলেও বাস, লঞ্চ ও ট্রেন স্টেশনে ভিড় কম। বরাবরের মতো অগ্রিম টিকিট বিক্রির তোড়জোড়ও নেই। গণপরিবহন সংশ্লিষ্টরা করোনা ও বন্যা পরিস্থিতিতে যাত্রী সংকটে লোকসানের আশঙ্কা করছেন। তবে এরই মধ্যে ঈদযাত্রায় ট্রেনের অগ্রিম টিকিট নিয়ে অভিনব জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শনিবার টিকিটপ্রত্যাশী কয়েকজন দেশ রূপান্তরকে জানান, সকাল ৬টায় টিকিট ছাড়ার এক মিনিটের মধ্যেই সব গায়েব হয়ে যাচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও সংশ্লিষ্ট অ্যাপসে ঢোকা যায় না। ঢুকতে পারলেও বিকাশ নম্বর তুলতে তুলতে আসন শূন্য দেখাচ্ছে। একটি জালিয়াত চক্র টিকিট হাতিয়ে নিয়ে পরে সেগুলো চড়া মূল্যে বিক্রি করছে বলে জানান তারা।

বাংলাদেশ রেলওয়ে ফ্যানস ফোরাম নামে একটি ফেইসবুক পেজে আল জামি নামে একজন লেখেনÑ ‘ঠিক ৬টায় ঢুকেও একটা টিকিট পেলাম না, সব জালিয়াতি করে ফেলেছে। আজিব দেশ... লজ্জা লাগে। লজ্জা বিডি রেইল।’ তার মতো অনেকেই ট্রেনের অগ্রিম টিকিট জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন।

এ বিষয়ে রেল সচিব সেলিম রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জালিয়াতি বন্ধে আমরা অনলাইন স্মার্ট পদ্ধতি নিয়েছি। এখন এখানেও জালিয়াতি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টিকিট কিনতে এনআইডি লাগবে এবং একজন তিনটির বেশি কিনতে পারবেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘তিন শতাধিক কোচ থাকলেও বর্তমানে দেশের ১৭টি রুটে ৩৬টি চলাচল করছে। ঈদে যাত্রীর চাপ বাড়লেও ট্রেন বাড়ানো হবে না।’

এদিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাজধানী থেকে দূরপাল্লার বাস চললেও যাত্রী কম। আসন অর্ধেক ফাঁকা রেখে বাকি অর্ধেকেও যাত্রী মিলছে না। ফলে ঈদে বিভিন্ন রুটে বাসের সংখ্যা বাড়ানো হবে কিনা, তা নিয়ে মালিকরা দ্বিধায় রয়েছেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার কারণে মাত্র ৪০ শতাংশ বাস চলাচল করলেও মালিকরা লোকসান দিচ্ছেন। ঈদ আসন্ন হলেও বন্যায় উত্তরাঞ্চলের জেলা তলিয়ে যাওয়ায় যাত্রী বেশি হবে না। ফলে এখনো বাস বাড়ানোর সময় আসেনি। আরও কয়েক দিন গেলে যাত্রীর চাপ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।’

আগামী ১ আগস্ট বাংলাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করা হবে। এ হিসাবে আগামী ৩১ জুলাই থেকে সরকারি ছুটি শুরু। প্রতি বছর ঈদ ঘিরে সড়ক ও রেলপথে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়েন, যা বছরের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চলাচল। এছাড়া নৌ এবং আকাশপথেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যাত্রী স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে গ্রামে যান। কিন্তু এ বছরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে পরবর্তী দুই মাসের বেশি সময় দেশের পরিবহন ব্যবস্থা কার্যত অচল ছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ঈদুল ফিতর হয়। ঈদের পর ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্তে গণপরিবহন চালু হলেও মালিকরা যাত্রী সংকটের দাবি করে আসছেন। ইতিমধ্যে করোনা সংকটে লাখো মানুষ গ্রামে ফিরে গেছেন বলা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ। এসবের প্রভাবেই এবারের ঈদযাত্রায় যাত্রীদের চাপ কম বলে মনে করছেন গণপরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল সকালে গাবতলী বাস টার্মিনালে দেখা যায়, কাউন্টারগুলো ফাঁকা। হাতেগোনা কিছু যাত্রী ঘোরাঘুরি করছেন। হানিফ পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার মোহাম্মদ শুভ দেশ রূপান্তরকে জানান, স্বাভাবিক সময়ে উত্তরাঞ্চলে তাদের ২০টির বেশি বাস চলাচল করলেও এখন তা ৭টিতে ঠেকেছে। ঢাকা-দিনাজপুর একটি ট্রিপে খরচ ১৮-২০ হাজার টাকা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যে ২০ আসন থাকছে, তাও পূর্ণ হচ্ছে না। ফলে জনপ্রতি এক হাজার টাকা ভাড়া নিয়েও লোকসান দিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

লোকাল বাস মানছে না স্বাস্থ্যবিধি : গাবতলীতে দূরপাল্লার কাউন্টারে ভিড় না থাকলে আমিনবাজার সেতুর দুই পাড়ে অনেক যাত্রী বাসের অপেক্ষা করছেন। তারা উত্তরাঞ্চলগামী কিছু লোকাল বাসে দরকষাকষি করে উঠছেন। এসব বাসের সব আসনে যাত্রী নেওয়া হচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। কয়েকজন যাত্রী জানান, হানিফ-শ্যামলীর বাসে ১ হাজার টাকা ভাড়া। এজন্য ঝুঁকি নিয়ে তারা পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে যাচ্ছেন।

লঞ্চে স্বাস্থ্যবিধি ভেঙে পড়ার শঙ্কা : আগে প্রতিদিন ৮০-৯০টি লঞ্চ চলাচল করলেও এখন কমে ৪০-৫০টি হয়েছে। তবে কর্র্তৃপক্ষের আশা, এবারের ঈদযাত্রায় নৌপথে যাত্রীর ঢল নামবে। ফলে ভেঙে পড়তে পারে স্বাস্থ্যবিধি।

গতকাল সদরঘাট ঘুরে দেখা যায়, বিআইডব্লিউটিএ’র দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগ নিয়ে লঞ্চগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। বেশিরভাগ যাত্রীর মুখে মাস্ক নেই। লঞ্চেও নেই পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থা।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক আলমগীর কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছি। প্রবেশমুখে থার্মাল স্ক্যানারে তাপমাত্রা নির্ণয়ের সঙ্গে জীবাণুনাশক টানেল দিয়ে সবাইকে প্রবেশ করতে হবে। তবে ঈদযাত্রায় যাত্রীদের চাপ পড়লে শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।’

তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার সচিব ছিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, ‘ঈদে যাত্রী বাড়ার তেমন সম্ভাবনা দেখছি না। স্বাস্থ্যবিধি মানতে গিয়ে এমনিতেই প্রতিদিন লোকসান দিচ্ছি। এভাবে কতদিন লঞ্চ চালাতে পারব, তা জানি না। এখন ঈদে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে প্রশাসন কঠোর, লঞ্চ ভাড়াও বাড়াতে হবে।’