যুক্তরাজ্যে হার্ড ইমিউনিটির ব্যর্থতা

চীনে ভাইরাসের ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়ার কথা জানা সত্ত্বেও যুক্তরাজ্য সময়মতো লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয়নি। হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে ভেবে ছড়াতে দেওয়া হয়েছিল ভাইরাস। পরে সমালোচনার মুখে সরকার বদল করে তাদের মত। কেন হার্ড ইমিউনিটি তৈরির চেষ্টা সত্ত্বেও যুক্তরাজ্যে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেল? লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

ছড়িয়ে পড়ছিল ভাইরাস

১২ মার্চ, ২০২০। যুক্তরাজ্যে জীবনযাপন প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিকভাবেই চলছে। সারা দিন ধরে লাখ লাখ মানুষ বাইরে আছে, ঘুরছে, শপিং করছে, ট্রেনে করে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরছে। সে সন্ধ্যাতেই উইম্বলে অ্যারেনাতে লুইস কাপলাডি ১২,০০০ দর্শকের সামনে গান গেয়ে শোনান। তবে অনুষ্ঠানে আসার আগে সবার কাছে অনুরোধ ছিল হাতে করে হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়ে আসার। কারণ ঠিক এর আগের দিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসকে বিশ্ব মহামারী হিসেবে ঘোষণা করেছিল। করোনা সংক্রমণের পরও যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় এমন অনেক অনুষ্ঠান হচ্ছিল। বিশ্বজুড়ে যখন এর প্রকোপ ক্রমশ বৃদ্ধির দিকে তখন যুক্তরাজ্য বেশ স্বাভাবিক। মহামারী ঘোষণা আসার দিনই ইতালি নিত্যব্যবহার্য নয় এমন সব জিনিসের দোকান বন্ধ করে দেয়। আয়ারল্যান্ড সব স্কুল বন্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু প্রশ্ন ছিল, যুক্তরাজ্য কি লকডাউন করতে আরও সময় নেবে? এই যে মানুষের ভিড় সেটা কি এভাবেই চলমান থাকবে? করোনাভাইরাসকে মহামারী ঘোষণার আগেই ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ থেকে বিশ্বের সব দেশকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাস নিয়ে প্রস্তুত থাকার কথা বলে। কিছু দেশ সে নির্দেশ মেনে ভাইরাস ছড়ানো শুরু হলেই টেস্ট এবং ট্রেস করা শুরু করে। কিন্তু ১২ মার্চ পর্যন্ত, যুক্তরাজ্যের সবই ছিল, শুধু হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের দিকে নজর দিয়ে বৃহৎ আকারে ভাইরাস টেস্ট করার সদিচ্ছাটা ছিল না। সেই সময় যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সংখ্যা ছিল ৫৯০, আগের সপ্তাহের তুলনায় সংখ্যাটা ছিল চার গুণ বেশি। সরকার থেকে লকডাউনের কোনো ঘোষণা এলো না। বরং বলা হলো, ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে, কারও মধ্যে ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দিলে অন্তত এক সপ্তাহের জন্য আইসোলেশনে থাকতে হবে। একটি প্রেস কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, তার বিজ্ঞান বিষয়ক প্রধান পরামর্শক স্যার প্যাট্রিক ভ্যালেন্স এবং প্রধান মেডিকেল অফিসার প্রফেসর ক্রিস উইট্টি মিলে স্কুল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং জনগণকেও জনবহুল স্থানে যেতে নিষেধ করলেন না। বরং সব ধরনের অনুষ্ঠান চালু রাখার অনুমতি মিলল। বরিস জনসন বললেন, বিজ্ঞানের পরামর্শ অনুযায়ী, পাবলিক ইভেন্টগুলো বন্ধ করে দিলে ভাইরাস ছড়ানোতে অন্যভাবে প্রভাব পড়তে পারে। প্রফেসর উইট্টি বলেন, এখনই সামাজিক দূরত্ব মানা শুরু করাটা খুব বেশি তাড়াতাড়ি হয়ে যায়, মানুষ এতে বিরক্তও হয়ে পড়তে পারে। এতে করে এই বিষয়েই মানুষ দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। স্যার প্যাট্রিক হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে বলেন, ‘সবাইকে হয়তো এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব না। যদিও এটা একদমই কাম্য নয়। কিন্তু ভবিষ্যতে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার জন্য আমাদের ইমিউনিটির প্রয়োজন।’ সেই সম্মেলনে বরিস জনসন জনগণকে নিয়মিত হাত ধোয়ার কথাও মনে করিয়ে দেন। ঠিক এই সম্মেলনের পরের দিন দশ হাজার মানুষ শেলটেনহাম রেসকোর্সে গোল্ড কাপ দেখতে যায়। শুরু হয়, হার্ড ইমিউনিটি এবং সরকারের করণীয় নিয়ে নানা আলোচনা।

বিবিসি রেডিও ফোরের একটি প্রোগ্রামে এসে সংক্রমিত হওয়ার শীর্ষ সংখ্যা নিয়ে সরকারের করণীয় কী তা নিয়ে স্যার প্যাট্রিক আলোচনা করেন। বলেন, ‘সরকার চেষ্টা করছে এই শীর্ষ সংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য। কিছু লোক আক্রান্ত হওয়ার কারণে কিন্তু অনেকের মধ্যেই হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে। তাহলে যত বেশি মানুষ আক্রান্ত হবে তত সংক্রমণের হার কমে আসবে। তবে অসুস্থ ব্যক্তিদের অবশ্যই ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকার চেষ্টা করতে হবে।’ গণহারে এই রোগ ছড়িয়ে দেওয়াটা আসলেই ভালো কোনো সিদ্ধান্ত হবে কি না সে বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, তিনি চান না অল্প সময়ে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হোক। সংক্রমিত হওয়ার শীর্ষ অবস্থাকে এভাবেই সমঅবস্থানে আনতে হবে। চাইলেই এটিকে বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই আক্রান্ত হওয়ার শীর্ষ অবস্থানে গিয়েই আপনাকে থামতে হবে। যতক্ষণে আপনি অনুমান করছেন ততক্ষণে অনেক মানুষের মধ্যে ইমিউনিটি তৈরি হয়ে গেছে। এটা আসলে নিজে থেকেই প্রতিরক্ষামূলক অংশে পরিণত হয়। ভাইরাস নিয়ে অতীতের ঘটনাগুলোর কথাও বলেন তিনি।

হার্ড ইমিউনিটি ও সরকারি সিদ্ধান্ত

রোগের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে যখন নিজ থেকেই প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় তখন সেটিকে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বলা হচ্ছে। দুইভাবে এটি সম্ভব। একটি পদ্ধতি হচ্ছে ভ্যাক্সিনেশন। কিছু মানুষ যখন ভ্যাক্সিন গ্রহণ করে তখন তার আশপাশের মানুষের মধ্যে আপনা থেকেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। কিন্তু একদম নতুন একটি ভাইরাসের বেলায়, যেটি নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে, ভ্যাক্সিন এখনো বাজারে আসেনি, সেটি আসলে কতটা হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করতে পারবে তা প্রশ্নবিদ্ধ। আরেকটি মাধ্যম হচ্ছে, মানুষের রোগে আক্রান্ত হওয়া এবং নিজ থেকেই ইমিউনিটি তৈরি হওয়া। যদি আবার ভাইরাস ছড়ায়, তখন বুঝতে হবে ইমিউনিটি তৈরি হওয়া মানুষগুলো সুরক্ষিত আছে। যদি একটি জনসংখ্যার বেশিরভাগ মানুষ সুরক্ষিত থাকে তবে ভাইরাস বেশি ছড়াতে পারবে না। কিন্তু এখানে দুটো সমস্যা আছে। ১) একটি হচ্ছে নতুন কোনো ভাইরাস (যেমন-করোনাভাইরাস) সংক্রমণের বেলায় এটি স্পষ্ট করে বলা যায় না যে, রোগটিতে কতজন মানুষ সুরক্ষা পেয়েছে, বিশেষ করে যখন আপনি জানেন না এটি কতদিন স্থায়ী থাকবে। ২) যদি জনগণের মধ্যে অধিকাংশই এতে আক্রান্ত হয়ে যায়, তবে হাজার হাজার মানুষ মারা যাবে।

১৩ মার্চ, স্যার প্যাট্রিক বলেন, যুক্তরাজ্যের অন্তত ৬০ শতাংশ মানুষ অর্থাৎ ৪০ মিলিয়ন মানুষের এই রোগে আক্রান্ত হতে হবে হার্ড ইমিউনিটি পাওয়ার জন্য। ‘সমাজের মাধ্যমেই আসলে ইমিউনিটি আসবে। দীর্ঘ সময়ের জন্য একে প্রতিহত করতে হলে এটাই সবচেয়ে জরুরি’। এই মন্তব্যের পর বিভিন্ন জায়গা থেকে নেতিবাচক মন্তব্য আসা শুরু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ম্যাটারনাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ বিভাগের সাবেক পরিচালক এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের হেলথ অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের প্রফেসর অ্যান্থনি কস্টেলো বলেন, ‘অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সুরক্ষার কথা ভেবে হুমকিস্বরূপ একটি নীতি বানিয়ে ফেলা কতটা যুক্তিসংগত?’ ১৪ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে ডক্টর মার্গারেট হ্যারিস বলেন, ‘আমরা ভাইরাস সম্পর্কে এখনো খুব বেশি কিছু জানি না। আমরা এখনো সবকিছু নিয়ে ধারণা করছি, কিন্তু এ মুহূর্তে আমাদের আসলে নজর দিতে হবে আমরা কী করছি সেদিকে।’ ওই দিন, গণিত থেকে শুরু করে জেনেটিক্স পর্যন্ত দুইশ জনেরও বেশি বিজ্ঞানী কভিড-১৯ এর বিস্তারকে মোকাবিলা করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা প্রবর্তনের আহ্বান জানিয়ে একটি খোলাচিঠিতে স্বাক্ষর করে সরকারকে পাঠান। তাতে লেখা ছিল, ‘সামাজিক দূরত্ব বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়। যত দ্রুত সম্ভব অতিরিক্ত আরও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’

বিশেষজ্ঞদের এই কথাগুলো সরকার একরকম উড়িয়ে দিয়েছিল। এসব নিয়ে পরে অবশ্য বেশ সমালোচনা হয়। ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল কেয়ারের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘স্যার প্যাট্রিকের মন্তব্যের আসলে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। হার্ড ইমিউনিটিটা আমাদের কোনো পরিকল্পনার অংশ নয়, বরং মহামারীতে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি একটি পদ্ধতি।’ ঠিক সেই সন্ধ্যায় ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এর ওয়েবসাইটে হেলথ সেক্রেটারি ম্যাট হ্যাংককের লেখা একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা ছিল, ‘বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মিলে আমাদের একটি পরিকল্পনা আছে। হার্ড ইমিউনিটি এই পরিকল্পনার অংশ নয়। এটি বৈজ্ঞানিক একটি পদ্ধতি, কোনো লক্ষ্য বা কৌশল নয়।’ ১৫ মার্চ, বিবিসির একটি অনুষ্ঠানে হেলথ সেক্রেটারি বলেন, হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে কখনো সরকারের পরিকল্পনা ছিল না। এই ঘটনার পর টেলিগ্রাফ লেখে, সরকার নিজেদের পরিকল্পনা থেকে ইউ-টার্ন নিয়েছে। দ্য এক্সপ্রেস লেখে, অনেক নেতিবাচক প্রক্রিয়ার পর হার্ড ইমিউনিটির পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে, সরকারিভাবে অস্বীকৃতি জানানো সত্ত্বেও ১৩ মার্চ স্যার প্যাট্রিক ভ্যালেন্স হার্ট অফ দা হেলথ সার্ভিসে (যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের কর্মীদের সহায়তা করার প্রতিষ্ঠান) এক আলোচনায় জানান সরকার হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে কাজ করছে।

মেডিকেল জার্নাল ‘দ্য ল্যান্সেট’ এর এডিটর রিচার্ড হর্টন বলেন, ‘এইসব আসলে বিশৃঙ্খলা ছাড়া কিছুই না। চীনের ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ার পর এখান থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল। যাতে আমরা ব্যর্থ। এভাবে মহামারী সামলানো যায় না। কীভাবে এই প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে সেটি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট কাঠামো মানা হয়নি। হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে প্রত্যেকটা বিষয় এখন লিপিবদ্ধ রাখা জরুরি কারণ এই ভাইরাসের কারণে আরও একটি ইতিহাস তৈরি হতে যাচ্ছে।’ এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে একজন সরকারি মুখপাত্র বলেন, ‘এটি একটি নতুন ভাইরাস। অনাকাক্সিক্ষত বৈশ্বিক মহামারী। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে সুরক্ষা, বিলম্ব, স্থায়িত্ব, গবেষণা, প্রশমন, সহ্যক্ষমতা সবকিছু নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করা। কাজেই সরকারের লক্ষ্য কেবল হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে কাজ করা এই তথ্য একদম ভিত্তিহীন।’

দমন বনাম প্রশমন

সরকারের এই যে হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে চিন্তা সেটা অবশ্যই অসুবিধার বলে কিছু বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন। ২০০০-০৭ সাল পর্যন্ত সরকারের বিজ্ঞান বিষয়ক পরামর্শদাতা ছিলেন স্যার ডেভিড কিং। এবার করোনাভাইরাস নিয়ে সরকারের চেষ্টা নিয়ে তিনি বেশ সমালোচনা করেন। ‘আমি শুনেছি সরকার হার্ড ইমিউনিটির পক্ষে কাজ করেছে। আবার কীভাবে যেন তারা নিজেরাই এটি অস্বীকার করেছে। বিষয়টি অবাক করার মতো।’ অনেক বিশেষজ্ঞই এখন বলছেন, যদি এই লকডাউন আরও আগে দেওয়া হতো, তবে মৃত্যুসংখ্যা অনেক কম হতো। ১০ জুন, মহামারীবিদ এবং সাবেক সরকারি পরামর্শদাতা প্রফেসর নিল ফার্গুসন বলেছিলেন, যে সময়ে লকডাউন করা হয়েছে তার যদি এক সপ্তাহ আগেও এটি করা হতো, তাহলে বর্তমানের চেয়ে না হলেও মৃত্যুসংখ্যা অর্ধেক কম হতো। অথচ ফার্গুসনের এই বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য ছিল, ‘আমাদের বিচার করার জন্য এই সময়টা বেশি জলদি হয়ে যাচ্ছে। আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সরকারের বিজ্ঞান বিষয়ক পরামর্শ গ্রুপের (স্যাজ) সঙ্গে আলোচনা করে। সেখানে ফার্গুসনও ছিলেন। আমরা তখন সেটাই করেছি যেটা আমাদের দেশের জন্য ভালো মনে হয়েছে।’ সায়েন্টিফিক প্যান্ডেমিক ইনফ্লুয়েঞ্জা গ্রুপ অন মডেলিং (এসপিআই-এম) এর একজন সদস্য এবং ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির পরিসংখ্যানবিদ ডক্টর থমাস হাউজ বলেন, ‘যখন সুনামি আসে তখন কিন্তু আমরা সুনামিকে আটকানোর চেষ্টা করি না। আমরা শুধু চেষ্টা করি ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা যেন অন্তত কম হয়। ঠিক সেরকমভাবে প্রথমে উদ্দেশ্য ছিল ভাইরাসকে দমন করা। ইনফেকশন সংখ্যা একদম শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা। পরে আবার প্রশমন ব্যবস্থাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যেন অন্তত আক্রান্ত সংখ্যা কমে আসে।’

 (এসপিআই-এম) এর আরও একজন সদস্য, ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির মডেলিং টিমের প্রধান এবং মহামারীবিদ প্রফেসর ইয়ান হল বলেন, ‘হার্ড ইমিউনিটি ছিল প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। এলোমেলোভাবে রোগের বিস্তার করে হার্ড ইমিউনিটি পাওয়া যাবে এমন যে কথা বলা হয়েছে সেগুলো সত্য নয়। সরকার শুধু চেষ্টা করেছে মৃত্যুসংখ্যা যেন কম হয়।’ হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল কেয়ার সিলেক্ট কমিটির চেয়ারম্যান জার্মি হান্ট বলেন, ‘মহামারীতে এই ধরনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ভুল। নেতাদের কাছে কঠোর লকডাউন অথবা হার্ড ইমিউনিটি প্রশমন দুই ধরনের সুযোগ বাছাই করার সুযোগ ছিল। তারা লকডাউন বেছে নেয়নি। স্যাজ কিন্তু পূর্ব এশিয়াতে ছড়ানো ভাইরাসে মডেল নিয়ে কাজ করেনি। তাই এই ভাইরাসকেও তারা স্বাভাবিকই ভাবছে। দুঃখজনক হলেও সত্য আমরা এ মুহূর্তে ফ্লু পলিসি মেনে চলছি, সার্সের মতো কোনো ভাইরাসের পলিসি নয়।’

অবশেষে লকডাউন

যুক্তরাজ্যে যখন ইতালির মতো অবস্থার সৃষ্টি হয় তখন প্রফেসর হল এবং ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে তার দল মিলে কীভাবে যুক্তরাজ্য-জুড়ে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে সপ্তাহজুড়ে তার একটি মডেল বানান। মধ্য মার্চের দিকে, চীনের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে বলেন, চীন সরকারের প্রতিক্রিয়া দেখার পরেও কেন যুক্তরাজ্যের সরকার এখনো দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। প্রফেসর তাদের বলেন, বিজ্ঞানীরা আসলে এখনো নিশ্চিত নন, চীনের মতো একই অবস্থা যুক্তরাজ্যেরও হবে, কারণ দুটি ভিন্ন ভিন্ন দেশ। নিজে বলেছেন বটে, এই কথাটি তাকে এবং তার দলকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করল। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিলেন ইনফেকশন সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার জন্য ৫/৬ দিন সময় লাগছে। কিন্তু ম্যানচেস্টার টিম খেয়াল করল, এই সময় আরও কম। ইতালির মতো যুক্তরাজ্যে আক্রান্তের সংখ্যাও ক্রমাগত বাড়ছে। মাত্র তিন দিনের মধ্যেই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। এই রিপোর্টটি প্রকাশিত হয় ২০ মার্চ। তারা এই মডেলটি এসপিআই-এমকে জমা দিলে তারা রিপোর্ট নিয়ে কাজ করে আরও ৩ দিন। এই সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে চলে যায়। এর আগে ১৬ মার্চ, প্রফেসর ফার্গুসনের নেতৃত্বে ইমপেরিয়াল কলেজের একটি দল একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে তিনটি ঘটনা উল্লেখ ছিল। ১) কিছুই করার দরকার নেই। ভাইরাসকে ছড়াতে দেওয়া হোক ২) ভাইরাস ছড়ানোর পরও কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করা যায় ৩) মহামারীকে নিজ গতিতেই এগোতে দিয়ে একে দমন করা এবং যত দ্রুত সম্ভব আক্রান্ত সংখ্যা কমিয়ে আনা। মডেলে বলা হয়েছিল, প্রথম ঘটনায় মৃত্যুসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৫ লাখে। যদি ঘটনা দ্বিতীয়টি মানা হয়, সেক্ষেত্রে মৃত্যুসংখ্যা দাঁড়াবে আড়াই লাখে। এই রিপোর্ট প্রকাশের এক সপ্তাহ পর, বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৬ মার্চ সরকার সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করে, ১৮ মার্চ সব স্কুল এবং ২০ মার্চ ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট, ক্লাব, থিয়েটার, সিনেমা হল এবং জিমসহ সব কিছু জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করে দেয়। এরপর ২৩ মার্চ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন লকডাউন ঘোষণা করেন। নিত্যব্যবহার্য নয় এমন সব দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়। দরকারি জিনিসের জন্য বাড়ি থেকে অনলাইনে অর্ডার করার সুযোগ করা হয়।

হার্ড ইমিউনিটি

লকডাউন শুরু হওয়ার চার মাস পর এসেও বিজ্ঞানীরা জানেন না, করোনাভাইরাসের বিপক্ষে ইমিউনিটি তৈরি হলেও সেটি কতদিন স্থায়ী হবে। কেউ জানে না কবে নাগাদ ভ্যাক্সিন আসবে। প্রফেসর হল বলেন, ‘যুক্তরাজ্য শেষ পর্যন্ত হার্ড ইমিউনিটি পেতে সক্ষম হবে। ভ্যাক্সিন ছাড়াই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। রোগ প্রশমনের জন্য ধীরে ধীরে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং শুরু করতে হবে। এক সময় আমরা অবশ্যই হার্ড ইমিউনিটিতে পৌঁছাব। কিন্তু তার জন্য না হলেও বছরখানেক লেগে যাবে।’ প্রফেসর ফার্গুসনের মতে, দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনা ছাড়া কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারবে না। ভ্যাক্সিন যতদিন না আসে একটি পদ্ধতি ধরেই আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে। তবে ভয় হচ্ছে, যদি এই লকডাউন তুলে দিয়ে সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যায়, তখন হয়তো ভাইরাসের বিস্তার দেশে-বিদেশে আরও ব্যাপক আকারে ছড়াবে। নিউজিল্যান্ড এবং তাইওয়ানের মতো বেশ কিছু দেশে ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা কম। তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেই এটি সম্ভব হয়েছে।’

নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং বৈজ্ঞানিক পরামর্শ বিষয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে। প্রধানমন্ত্রী যদিও এই বিষয় নিয়ে তদন্ত করতে বলেছেন, কিন্তু সেটি নিয়েও কোনো সময় বেঁধে দেওয়া হয়নি। সমালোচকরা বলছেন, যদি প্রথমবার সংক্রমণের পরও সরকার কোনো শিক্ষা নিতে না পারে তবে দ্বিতীয়বার আবার একই অবস্থা হলে তখন ভয়াবহ অবস্থা সামাল দেওয়ার মতো হয়তো আর হাতে সময় থাকবে না।