বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে নকল মাস্ক সরবরাহের মামলায় গ্রেপ্তার ছাত্রলীগের সাবেক নেত্রী শারমিন জাহানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কর্র্তৃপক্ষ। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে ঢাবি কর্র্তৃপক্ষ।
নিম্নমানের মাস্ক সরবরাহের অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন-১ শাখার সহকারী রেজিস্ট্রার শারমিনের মালিকানাধীন অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনালে বিরুদ্ধে গত বৃহস্পতিবার রাতে শাহবাগ থানায় মামলা করেন বিএসএমএমইউর প্রক্টর অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ। ওই মামলায় গত শুক্রবার রাতে ছাত্রলীগের সাবেক নেত্রী শারমিনকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শারমিনকে বরখাস্তের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার মোছাম্মৎ শারমিন জাহানের শিক্ষা ছুটিতে থাকা অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি ব্যতীত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান ও চাকরি শৃঙ্খলা পরিপন্থী। অধিকন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা হওয়ায় ও পুলিশের রিমান্ডে থাকায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করেছেন। এমতাবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার মোছাম্মৎ শারমিন জাহানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে ৭ (সাত) কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য নোটিস প্রদান করা হয়েছে।’
শারমিনের সহযোগী ২ বিএসএমএমইউ কর্মকর্তা শনাক্ত : নকল মাস্ক সরবরাহে জড়িত শারমিনের একাধিক সহযোগীর তথ্য পেয়েছে পুলিশ। যাদের মোটা অঙ্কের কমিশন দিয়ে বিএসএমএমইউতে মানহীন মাস্ক সরবরাহের কাজ বাগিয়ে নিয়েছিলেন শারমিন। শারমিনের সিন্ডিকেটের অন্যতম এই দুই ব্যক্তি হলেন বিএসএমএমইউ হাসপাতালের প্রশাসন বিভাগের একজন পরিচালক এবং আরেকজন সহকারী পরিচালক। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি ডিবির তদন্তকারী কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট এক ডিবি কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শারমিন করোনা সুরক্ষাসামগ্রী ও মাস্ক সরবরাহের কাজ পেয়েছিলেন বিএসএমএমইউ হাসপাতালের প্রশাসন বিভাগের দুজন কর্মকর্তার মাধ্যমে। তাদের নাম-পরিচয় শারমিন প্রকাশ করেছে। এখন তদন্তের প্রয়োজনে ওই কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শিগগিরই তলব করা হবে।’
তদন্তকারী ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘শারমিনের কাজ পাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুই করেছিলেন হাসপাতালটির একজন পরিচালক ও একজন সহকারী পরিচালক। তারা দুজন শারমিনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়।’
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএসএমএমইউর মামলার তদন্তে শারমিন ছাড়াও যাদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তাদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, রিমান্ডে শারমিনকে মূলত তার সহযোগীদের বিষয়েই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে মাস্ক তৈরির বিষয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। এখন ওই মাস্ক সরবরাহে সহযোগিতাকারী কারা বা কাদের মাধ্যমে তিনি এ ধরনের মানহীন মাস্ক সরবরাহ করেছেন সে বিষয়ে তদন্তে জোর দেওয়া হয়েছে।
ডিবির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শারমিনের একার পক্ষে এ ধরনের মানহীন সামগ্রী সরবরাহ করা সম্ভব নয়। এতে যারা কাজ পেতে সহযোগিতা থেকে শুরু করে তৈরি ও সরবরাহ চেইনে জড়িত থেকে কাজ করেছেন তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। শারমিনকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক টেন্ডার প্রক্রিয়াও মানা হয়নি।’
বিএসএমএমইউ হাসপাতালে কভিড-১৯ চিকিৎসকদের জন্য ১১ হাজার মাস্ক সরবরাহের কাজ পেয়েছিলেন শারমিন। এর মধ্যে তিনি সরবরাহ করেছিলেন তিন হাজার ৪৬০টি মাস্ক। ৭৩০ টাকা দরে প্রায় ৮০ লাখ টাকার মাস্ক সরবরাহ করার কথা ছিল তার। এখন তার বিরুদ্ধে নকল এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসকরা বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ করলে প্রথমে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন। পরে বিষয়টির সত্যতা পাওয়ায় শাহবাগ থানায় শারমিনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
শারমিন জাহান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা ছুটি নিয়ে ২০১৬ সালে চীন সরকারের শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে উহান হোয়াজং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এইচইউএসটি) পিএইচডি করতে যান। কভিড১৯ শুরু হলে উহানে লকডাউনের পর গত ২৩ জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরে আসেন। এর মধ্যে চীনে থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালের মার্চে অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনাল নামে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে নিজের ব্যবসা শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতকোত্তর শারমিন ২০০২ সালে ছাত্রলীগের বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের গত কমিটিতে তিনি মহিলা ও শিশুবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন। বর্তমান কমিটিতে কোনো পদ না পেলেও দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত।
শারমিনের বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগে বলা হয়, শারমিনের মালিকানাধীন অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনাল ২৭ জুন ১১ হাজার মাস্ক সরবরাহের কার্যাদেশ পায়। এর বিপরীতে অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনাল ৩০ জুন প্রথম দফায় ১৩০০, ২ জুলাই দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় ৪৬০ ও ১০০০ এবং চতুর্থ দফায় ৭০০ মাস্ক সরবরাহ করে। কিন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ দফায় পণ্য ‘সামগ্রিক গুণগতমানের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী পাওয়া যায়নি’ অভিযোগ করে এজাহারে বলা হয়, ‘কোনো কোনো ফেইস মাস্কের বন্ধনী ছিঁড়ে গেছে, কোনো মাস্কের ছাপানো ইংরেজিতে লেখা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। এ ধরনের ত্রুটিতে কর্র্তৃপক্ষ বুঝতে পারে, মাস্ক নিম্নমানের ছিল। এর ফলে কভিড-১৯ এর সম্মুখযোদ্ধাদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারত। এ বিষয়ে ১৮ জুলাই অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী শারমিন জাহানকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় বিএসএমএমইউ। ২০ জুলাই লিখিত জবাবে শারমিন দুঃখপ্রকাশ করেন, যা আসামির দোষ স্বীকারের শামিল। শারমিন জাহানের বিরুদ্ধে এ মামলায় দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ দুটি ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছর এবং সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।