কয়েক মাস আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ থাকার পর বিমানের ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ফ্লাইটের টিকিট বিক্রি নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে ট্রাভেল এজেন্টদের সংগঠন আটাব। তাদের অভিযোগ পছন্দের ট্রাভেল এজেন্সিকে টিকিট পাইয়ে দেওয়ার জন্য বিমানের বিশেষ ফ্লাইটের টিকিট বিক্রির ঘোষণা দেওয়া হয় রাত ৮টায়। এ ঘোষণার খবরও সিন্ডিকেটভুক্ত এজেন্সিগুলোকে ফোনের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়। বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইওকে বিষয়টি জানিয়ে প্রতিকার চেয়েছে ভুক্তভোগী ট্রাভেল এজেন্টরা। এমনকি বিষয়টি সুরাহার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছে তারা।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী দেশে আটকা পড়েছেন। তাদের অনেকেরই স্কুল, কলেজ, চাকরি বা ব্যবসায় সমস্যা হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেকেরই চাকরি চলে গেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছার জন্য তাদের কাছে বিমানের টিকিট সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে এখন টিকিট বিক্রি হচ্ছে। বিমানের বিভিন্ন অফিসে টিকিট সংশ্লিষ্ট কাজে যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন। এ সুযোগে ঘটছে ব্যাপক অনিয়ম।
বিষয়টি জানতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোকাব্বির হোসেন গতকাল সোমবার রাতে বলেন, ‘আমি কোনো বিষয়ে কথা বলব না।’
তবে বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আটাব একটি চিঠি পাঠিয়েছে তা সত্য। তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।
আটাবের সাধারণ সম্পাদক মো. মাজহারুল এইচ ভূঁইয়া গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে আমরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। তিন মাসেরও বেশি আকাশপথের যাত্রা বন্ধ ছিল। সংগঠনের প্রায় চার হাজার সদস্য জীবিকার সংকটে পড়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হওয়ার পর আমরা আশাবাদী হয়ে উঠি। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিকভাবে যাত্রীদের টিকিট বিক্রয় করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা বিমান কর্তৃপক্ষকে বলে আসছি, সব এজেন্ট যাতে টিকিট বিক্রয় করতে পারে সে ব্যবস্থা করতে। একটি টিকিট বিক্রয় করতে পারলে সাত ভাগ লাভ হয়। তিনি বলেন, করোনার কারণে বিমানমন্ত্রী ও সচিব মহোদয়ের সঙ্গে আমরা দেখা করতে পারিনি। দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারব বলে আশা করছি। তবে আমরা বিষয়টি সুরাহা করার জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়েছি। আশা করি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সমাধান করে আমাদের রক্ষা করবেন।
বিমানের কয়েকটি সূত্র বলছে, গত ১৩ জুলাই ঢাকা থেকে লন্ডনের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ফ্লাইটের ঘোষণা দেওয়া হয় ২ জুলাই। রাত ৮টায় এ ঘোষণা দিয়ে পরের দিন শুক্রবার দুপুরে টিকিট বিক্রির জিডিএস সিস্টেম ওপেন করার ঘোষণা দেওয়া হয়। সিট বুকিংয়ের পর টিকিট ইস্যুর জন্য ২০ মিনিট সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়ার কথা থাকলেও বিমান তা করেছে ১২ ঘণ্টা। অর্থাৎ পরবর্তী ১২ ঘণ্টার মধ্যে টিকিট ইস্যু করতে হবে। ২০ মিনিট সময় নির্দিষ্ট থাকলে ফেইক বা ভুয়া বুকিং দেওয়ার সুযোগ কমে যেত। ফেইক বুকিং দিলেও তা ২০ মিনিট পর বাতিল হয়ে যেত। কিন্তু ১২ ঘণ্টা সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়াতে পছন্দের এজেন্সিগুলো সুবিধা পেয়েছে। এতে টিকিট বিক্রিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।
নানা বাধা পেরিয়ে যেসব সাধারণ এজেন্সি টিকিট বুক করতে পেরেছিল টিকিট ইস্যু করতে গিয়ে দেখে এগুলো নন-চ্যাঞ্জেবল এবং নন-রিফান্ডেবল। এ কারণে সাধারণ এজেন্সিগুলো টিকিট ইস্যু করতে পারেনি বা সিট বাতিল করতে বাধ্য হয়।
গত ৯ জুলাই বিষয়টি বিমানের এমডি ও সিইও মো. মোকাব্বির হোসেনের নজরে আনে টিকিট বিক্রির সংগঠন ট্রাভেল এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আটাব)। সংগঠনের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বিমানের সিলেট অফিসের ডিএমডিসহ আরও দুই কর্মকর্তার পছন্দমতো কিছু এজেন্সিকে টেলিফোনে জানিয়ে দেওয়া হয় নন-চ্যাঞ্জেবল এবং নন-রিফান্ডেবল শর্তটি ৫ জুলাই তুলে নেওয়া হবে। ঠিকই ৫ জুলাই এক মেইলের মাধ্যমে এই শর্ত দুটি প্রত্যাহার করা হয়।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত ২১ জুন লন্ডন ফ্লাইটের মাধ্যমে বিমানের আন্তর্জাতিক রুটে পুনরায় ফ্লাইট চালু করা হয়। এ পর্যন্ত লন্ডনে যেসব ফ্লাইট গেছে তার প্রায় সবটিতেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করা হয়েছে। আটাব আরও বলেছে, অর্থের বিনিময়ে সিট হোল্ডিং টিকিটধারীকে সিট বুকিং দেওয়া হয়েছে। বিমানের কর্মকর্তারা পছন্দের এজেন্সির টিকিট নিজেরা বুকিং দিয়ে কনফার্ম করেছেন। টিকিটের জন্য যাত্রীরা বিমান অফিসে গেলে তাদের আগামী অক্টোবর মাসের শিডিউল দেওয়া হয়। অথচ পরে ফোনে অনেক টাকার বিনিময়ে এ সিট জুলাই মাসেই দেওয়া হয়। গত ২১ ও ২৮ জুনের ফ্লাইটে অনেক সিট বিমান অফিসের কর্মকর্তারা নিজেরা কনফার্ম করে দিয়েছেন। এতে বিমান দুর্নাম কামিয়েছে এবং রাজস্ব হারিয়েছে। তদন্তের জন্য আটাব ৩৩টি সিটের তথ্য বিমানের এমডিকে পাঠিয়েছে। বিমান কর্মকর্তারা নিজেরা এসব সিটের শ্রেণি পরিবর্তন এবং কনফার্ম করেছেন। আটাব বলেছে, এই মুহূর্তে এসব ক্লাসের সিট পাওয়া অকল্পনীয়। এছাড়া বিমান যেসব চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনা করেছে সেগুলোর রেজিস্ট্রেশন সিরিয়াল সামনে-পেছনে নেওয়ার মাধ্যমেও আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। একই স্টেশনে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার কারণে এসব কর্মকর্তা এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্প্রতি ইতালি কর্তৃপক্ষ আগামী ৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশের ফ্লাইট চলাচল নিষিদ্ধ করেছে। বর্তমানে লন্ডন, আরব আমিরাতে নিয়মিত ফ্লাইট চলাচল করছে। আগামী ৪ আগস্ট থেকে কুয়েতে ফ্লাইট চলাচল শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তাছাড়া মালয়েশিয়াসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশ থেকে বিশেষ ফ্লাইটে যাত্রী আসা-যাওয়া করছেন।
আটাবের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সারা দেশে সাড়ে তিন হাজার এজেন্ট রয়েছে। তার মধ্যে চট্টগ্রামে ৩০০, সিলেটে ২০০, ঢাকায় ২৯১, রাজশাহীতে ২০টি, খুলনায় ২টি ও বরিশালে ২টির বেশি এজেন্ট রয়েছে। বেশিরভাগ এজেন্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারা আশা করছেন বিমান কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সুরাহা করবেন।