‘ল্যাবের ভুলেই’ শাজাহান খানের মেয়ের নেগেটিভ রিপোর্ট

সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শাজাহান খানের মেয়ে ঐশী খানের করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট ‘ভুল করে’ দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট ল্যাব। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের (এনআইএলএমআরসি) পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান গতকাল সোমবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। তিনি জানান, ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের ভুলের কারণে এই সমস্যা তৈরি হয়েছিল।

এর আগে গত রবিবার করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিয়ে লন্ডনে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে যান শাজাহান খানের মেয়ে ঐশী খান। তবে অনলাইনের রেজাল্টের সঙ্গে তার হাতে থাকা করোনার রিপোর্টে মিল না পাওয়ায় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাকে ফেরত পাঠান। এ নিয়ে গতকাল দুপুরে বাবা শাজাহান খানকে সঙ্গে নিয়ে নিজের কভিড টেস্টের রিপোর্ট সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলমের কাছে তিনি অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে ঐশী দাবি করেন, অধিদপ্তর ভুল রিপোর্ট দেওয়ায় তার ও তার বাবার সম্মানহানি হয়েছে, যা অমার্জনীয় অপরাধ। তিনি অবিলম্বে বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় মানুষকে যাতে অযথা হয়রানি হতে না হয়, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানান।

ঐশী খানের অভিযোগের বিষয়ে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘পিসিআর টেস্টে ফলস নেগেটিভ আসতে পারে। সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান সকালে (গতকাল) আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বিষয়টি আমরা ত্বরিত গতিতে খতিয়ে দেখছি। আমরা ব্যবস্থা নেব। এখানে লুকানোর কিছু নেই। যদি আমাদের ভুল হয়, সেটা আমরা বলব। আর মেশিনে ভুল হলে সেটাও জানাব। কারও ব্যক্তিগত ইচ্ছায় যদি হয়ে থাকে, সেটারও সুষ্ঠু সমাধান হবে। তিনজন এ বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।’

পরে ল্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয় ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের ভুলেই রিপোর্ট নেগেটিভ লেখা হয়। ভুলের বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করে এদিন এনআইএলএমআরসি পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কর্মরত মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের কর্মবিরতির কারণে গত ২৫ জুলাই প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিদেশগামী যাত্রীদের নমুনা সংগ্রহের প্রথম দিকে শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠানে এসব নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হতো। গত ২৪ জুলাই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন বুথ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তা পাঠানোর পর সন্ধ্যায় গ্রহণ করা হয়। ২৪ ঘণ্টায় রিপোর্ট দেওয়ার বাধ্যবাধকতার মধ্যে আমরা একটু ব্যত্যয়ের মধ্যে পড়ে যাই। পরদিন সরকারি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও অন্যরা নমুনা পরীক্ষার কাজ শুরুর পর সেদিন ৪০২টি নমুনা পরীক্ষা করতে সময় একটু বেশি লেগে যায়। এতে যাত্রীদের তথ্য একটি ফর্মের মাধ্যমে এমআইএস শাখার সফটওয়্যারে এন্ট্রি দেওয়া হয়। সেখান থেকে তথ্য শিট আসে। সেই তথ্য এন্ট্রি দেওয়ার জন্য এখানেও ডাটা এন্ট্রি অপারেটররা কাজ করেন। সময় বেশি লেগে যাওয়ার কারণে আমাদের সমন্বয়ক ইমিগ্রেশন বুথ এবং ডিএনসিসি বুথে কথা বলার পর ওইদিন যাদের বিমানযাত্রা ছিল তাদের যাত্রা যেন বিঘিœত না হয়, সেজন্য এখান থেকে রিপোর্ট তৈরি করে তাদের ইমেইলে পাঠানো হয়।’

তিনি বলেন, ‘ফলাফল আসার পর তথ্য শিটে কম্পিউটারে এন্ট্রি দিই। সেই এন্ট্রির সময় অপারেটরদের যে কারও মাধ্যমে ডাটা এন্ট্রি প্রিন্ট আকারে আমাদের কাছে আসে। সেই তথ্য অনুযায়ী একটি রিপোর্ট কম্পিউটারে টাইপ করার পর মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং একজন কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেন।’

আবুল খায়ের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান বলেন, ‘সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে প্রথমে কিছু সংখ্যক যাত্রীর ফলাফলের রিপোর্ট এবং রাত সাড়ে ৯টায় বাকি যাত্রীদের রিপোর্ট এমআইএস ইমিগ্রেশন এবং ডিএনসিসির ইমেইলে পাঠানো হয়। যখন এই ডাটাগুলো অপারেটররা এমআইএস-এর সফটওয়্যারে এন্ট্রি দেওয়ার কাজ করে, প্রথম যাত্রার ইমেইলে প্রাক্তন মন্ত্রী শাজাহান খানের কন্যা ঐশী খানের রিপোর্ট ছিল। সেটি ভুলক্রমে ফলাফল লেখা ছিল নেগেটিভ। ওই নেগেটিভ রিপোর্ট আমাদের কম্পিউটার থেকে তৈরি করে ইমেইলে পাঠানো হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে নেগেটিভ রিপোর্ট যায়। দ্বিতীয় দফায় যাত্রীদের রিপোর্ট যখন আমরা সফটওয়্যারে এন্ট্রি দিতে যাব, তখন সামগ্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা যায় ওই রিপোর্ট আসলে নেগেটিভ না, পজিটিভ। তখন সমন্বয়কারী সব রিপোর্টের প্রিন্ট কপি বের করে আমার স্বাক্ষর দিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবার প্রস্তুত করে ইমেইলে পাঠিয়ে দেন। তখন এই ডাটা আমরা সফটওয়্যারে এন্ট্রি করে দিই। সেখানে ঐশী খানের ফলাফল পজিটিভ হিসেবেই এন্ট্রি করা হয়।’

তিনি জানান, এমআইএস থেকে অটো জেনারেট হয়ে রিপোর্ট ডিএনসিসি বুথে যায়। কিন্তু সেদিন যেহেতু সমস্যা ছিল, তাই রিপোর্টগুলো সরাসরি এমআইএস-এ পাঠানো যায়নি। সরাসরি ইমেইলে পাঠানো হয়। কিন্তু ডাটা এন্ট্রির সময়ে সফটওয়্যারে পজিটিভ করাই ছিল। তিনি (ঐশী খান) নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়েই বিমানবন্দরে যান। এখান থেকে যে ইমেইল দেওয়া হয় তার ভিত্তিতেই ইমিগ্রেশন উনাকে পজিটিভ বলে। পরিচালক বলেন, ঐশী খান যেই রিপোর্ট নিয়ে গিয়েছিলেন সেটি আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে ভুল করে করা হয়েছিল। এর কারণে জনসম্মুখে তিনি হেয় হয়েছেন। সেটা আমরা স্বীকার করি। আমরা এটি আরও খতিয়ে দেখছি। যিনি ভুলটি করেছেন তিনি সাময়িক সময়ের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত। তার বিরুদ্ধে আমরা শিগগিরই ব্যবস্থা নেব।