অবৈধভাবে বাংলাদেশে থাকা নাইজেরিয়ান নাগরিকরা প্রতিনিয়ত প্রতারণা করে যাচ্ছে সহজ-সরল সাধারণ মানুষের সঙ্গে। তাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়ে চলতি মাসে রাজধানীতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) হাতে ৪০ জনের বেশি নাইজেরিয়ান গ্রেপ্তার হয়েছে। এসব নাইজেরিয়ানের বেশিরভাগেরই নেই বাংলাদেশে থাকার বৈধতা। তিন মাসের টুরিস্ট ভিসায় এসে পার করে দিচ্ছে বছরের পর বছর। ফেলে দিয়েছে তাদের পাসপোর্টও। তারা নিজেদের মার্চেন্ডাইজার অথবা ফুটবল খেলোয়াড় পরিচয় দিয়ে রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা ও মিরপুরসহ বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়েছে। ওইসব বাসার মালিকদের বেশিরভাগই কোনো খোঁজ রাখছেন না এসব বিদেশি নাগরিক কী কাজ করছে বা তাদের দেশে থাকার কোনো বৈধতা আছে কি না। আবার অনেক বাড়ির মালিক জেনেবুঝেই প্রশ্রয় দিচ্ছেন এসব অবৈধ বিদেশিকে। বিনিময়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের টাকা বাসা ভাড়া। সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশও বিগত সময়ে এসব নাইজেরিয়ানের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধভাবে থাকা এসব বিদেশির বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
সর্বশেষ গত ২১ জুলাই রাজধানীর মিরপুর থেকে প্রতারণার দায়ে এক বাংলাদেশি ও ১২ নাইজেরিয়ান নাগরিককে গ্রেপ্তারের পর নাইজেরিয়ান নাগরিকদের প্রতারণা চক্র সম্পর্কে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে সিআইডি। চক্রটির সদস্যরা তাদের অফিসে থাকা সাতটি ল্যাপটপ ব্যবহার করে দুই শিফটে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টায়ই প্রতারণার কাজ করত। শুধু দেশেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও রয়েছে তাদের সদস্য। প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ৭০টি ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবার অ্যাকাউন্ট সবসময় সক্রিয় থাকত। এই চক্রের অন্য ছয় সদস্য এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। তারা প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৫ জুলাই রাতে রাজধানীর পল্লবী এলাকায় সিআইডির ধাওয়া খায় চক্রের চার সদস্য। তারা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া সাড়ে ৯ লাখ টাকা ফেলে পালিয়ে যায়।
সিআইডির ভাষ্য, এই চক্রের ১৮ নাইজেরিয়ান পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের এক নম্বর লেনের ৫ নম্বর অ্যাভিনিউয়ের ৭/৮ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে অফিস করেছিল। ওই বাড়ির অন্য দুটি ফ্ল্যাটের একটিতে থাকত চক্রের নাইজেরিয়ান সদস্যরা এবং অন্যটিতে তাদের প্রতারণার কাজের অন্যতম সহায়তাকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক শিক্ষার্থী রাহাত আরা খানম তূর্ণা ওরফে ফারজানা মহিউদ্দিন (২৭)। এসব নাইজেরিয়ানের বাংলাদেশে থাকার কোনো বৈধ কাগজ না থাকার বিষয়টি ওই বাড়ির মালিকের জানা ছিল এবং তিনি জেনেবুঝেই কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। এ বিষয়ে বাড়ির মালিককে জিজ্ঞাসাবাদ করবে সিআইডি। রাজধানীর অন্যান্য অভিজাত এলাকায় থাকা নাইজেরিয়ানদেরও একই অবস্থা। অভিজাত এলাকায় থাকার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। তারা প্রতারণার কাজে অনেক বাংলাদেশিকে ব্যবহার করছে। রিকশাচালকসহ বিভিন্ন পেশার নিম্ন আয়ের মানুষদের ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট প্রতারণার কাজে ব্যবহার করছে চক্রটি। হাতিয়ে নেওয়া টাকাগুলো ওইসব মানুষের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে গ্রহণ করেছে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। যাদের অনেকেই এখন বিপদে পড়েছেন। তারা না জেনেবুঝে এ প্রতারকদের ফাঁদে পা দিয়েছেন।
সিআইডির অ্যাডিশনাল ডিআইজি শেখ মো. রেজাউল হায়দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত যতজন নাইজেরিয়ান নাগরিককে প্রতারণার দায়ে গ্রেপ্তার করেছি তাদের অধিকাংশই পাসপোর্ট ফেলে দিয়েছে। তারা এ দেশে অবৈধভাবে আছে। এছাড়া তাদের ল্যাপটপ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দুবাইসহ অন্যান্য দেশেও তাদের সদস্য রয়েছে। তারা সেখানেও প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে।’
এই সিআইডি কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘গত কয়েক দিনে ৩০ থেকে ৪০ জন ভিকটিম আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আরও অসংখ্য মানুষের সঙ্গে তারা প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আমরা ব্যাংক হিসাবগুলোতে অনুসন্ধান চালাচ্ছি।’
কতজন বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে আছে তা জানতে চাইলে রেজাউল হায়দার বলেন, ‘আমাদের দেশে এরকম প্রতারণার সঙ্গে জড়িত কতজন নাইজেরিয়ান, ক্যামেরুন, উগান্ডা ও কেনিয়াসহ অন্যান্য দেশের নাগরিক আছে তার সঠিক তথ্য জানা নেই।’
নাইজেরিয়ানদের প্রতারণার তদন্তসংশ্লিষ্ট এক সিআইডি কর্মকর্তা জানান, পল্লবী থেকে গ্রেপ্তার নাইজেরিয়ানদের চক্রটির কোনো সদস্য ভুয়া ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রথমে বিপরীত লিঙ্গের কোনো ব্যক্তির সঙ্গে ফেইসবুকে বন্ধুত্ব গড়ে তুলত। প্রতারক নিজেকে আমেরিকা বা ইউরোপের কোনো দেশের নাগরিক দাবি করে মেসেঞ্জারে নানা আলাপ করত। অনেকের সঙ্গে মেসেঞ্জারেই গড়ে তুলত প্রেমের সম্পর্ক। এরপর মূল্যবান উপহার পাঠানোর কথা বলে এয়ারলাইনস বুকিংয়ের তথ্যও পাঠাত টার্গেট করা ব্যক্তিকে। এ পর্যায়ে সাবেক ঢাবি ছাত্রী তূর্ণা নিজেকে কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে উপহারের শুল্ক বাবদ মোটা অঙ্কের অর্থ একটি ব্যাংক হিসাবে জমা দিতে বলত ভুক্তভোগীকে। উপহার গ্রহণ করা না হলে আইনি জটিলতায় পড়ার ভয় দেখাত সে। এভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি। তাদের টার্গেট থেকে বাদ যাননি সরকারি আমলারাও।
রাজধানীতে অবৈধভাবে থাকা বিদেশিদের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ওয়ালিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নাইজেরিয়ানসহ যেসব বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে রাজধানীতে থেকে বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এদের প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য এ দেশে একটি বড় চক্র আছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মূল দায়িত্ব আমাদের ইমিগ্রেশন বিভাগের। তারা এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।’