করোনা মহামারী ও বন্যার নাজুক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আসন্ন ঈদুল আজহাকে ঘিরে ঢাকাসহ সারা দেশে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে পুলিশ। কিন্তু পুলিশের সতর্কতা সত্ত্বেও দেশে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার আশঙ্কা নাকচ করে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। পুলিশের সতর্কতা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সরকার জঙ্গিদের সমূলে উৎপাটন করতে না পারলেও তাদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে। ফলে বড় ধরনের কোনো হামলা চালানোর সামর্থ্য নেই জঙ্গিদের। এর আগে সদর দপ্তর থেকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, আইএস মতাদর্শের দেশীয় অনুসারী ‘নব্য জেএমবির’ সদস্যরা যেকোনো সময় ‘আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলা’ পরিচালনা করতে পারে। এজন্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো টার্গেট করতে পারে জঙ্গিরা। এছাড়া বিমানবন্দর, দূতাবাস, বিশেষ ব্যক্তি, মাজারকেন্দ্রিক মসজিদ, চার্চ ও মন্দিরসহ যেকোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ও তাদের হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
জঙ্গি হামলার শঙ্কায় সারা দেশে পুলিশের সতর্কতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, হামলার সময় কী ধরনের অস্ত্র থাকতে পারে সে বিষয়েও পুলিশের গোপন চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্যের নিরিখে, পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটসহ জঙ্গিসংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। এছাড়া উগ্রপন্থি বা তাদের সংগঠনের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি, পুলিশের সবাইকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বজায় রাখা, পুলিশের গাড়ি-স্থাপনা খালি বা পরিত্যক্তভাবে ফেলে না রাখা, পুলিশের ভবনগুলোতে প্রবেশের সময় নিরাপত্তা ও পরিচয় নিশ্চিত করা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করা, চেকপোস্টে তল্লাশি বাড়ানো, সন্দেহ হলে ব্যাগ-দেহ তল্লাশি করা, সন্দেহজনক এলাকায় ব্লক রেইড করতে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
জঙ্গিবাদ দমনে বর্তমান সরকারের কঠোর ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, সরকার জঙ্গিবাদ একেবারেই নির্মূল করতে পেরেছে। জঙ্গিবাদের মতাদর্শিক সন্ত্রাস শুধু বাংলাদেশ বা বিশ্বের কোনো একটি বিশেষ অঞ্চলের সংকট নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়েই জঙ্গিবাদের নানামুখী বিস্তার দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি দেশে সামাজিক ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীন ও ধর্মীয় বিদ্বেষমুক্ত সমাজ গঠনের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া জরুরি। কেননা দেশ বা সমাজের এমন অসংগতিগুলোকে পুঁজি করেই তরুণদের বিপথগামী করার চেষ্টা চালায় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো। এক্ষেত্রে সাম্প্রতিককালে বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদের নানারকম বাঁক বদলের ফলে জঙ্গিদের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক তৎপরতার নতুন মাত্রাগুলো লক্ষণীয়। বিশেষত সিরিয়া ও ইরাকে ‘আইএস’ বা ইসলামিক স্টেটের পৃষ্ঠপোষকতায় পশ্চিমের নানা দেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের সশস্ত্র জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হওয়াটা এর আগে কখনোই এমন ব্যাপক মাত্রায় দেখা যায়নি। উল্লেখ্য, হলি আর্টিজানে দেশের সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলার তৎপরতাতেও সম্প্রতি একইরকম প্রবণতা দেখা গেছে। জঙ্গিবাদ নিয়ে যেমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তেমনি এ প্রবণতা বন্ধ করার জন্য নানা সামাজিক তৎপরতাও চলছে। তবে, আশার কথা হলো সমাজে এ বোধও ছড়িয়েছে যে সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান নেই। বরং নিয়মতান্ত্রিক পথেই রয়েছে সমাধান। দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ আলেমরাও নাগরিকদের জানাচ্ছেন যে, ইসলাম শান্তির পথই উৎসাহিত করে।
হলি আর্টিজানের পর নানামুখী অভিযানে দেশে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক অনেকটাই ভেঙে পড়ায় মাঠে সক্রিয়তার সক্ষমতা না থাকলেও অনলাইনে নিজেদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বেশ কিছু জঙ্গি সংগঠন। ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালে গ্রেপ্তার হওয়া আড়াইশ জঙ্গির ওপর পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে এদের ৮২ শতাংশই ইন্টারনেটে এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই পথে এসেছে। পাশাপাশি প্রবাসীদের একটি অংশের কাছ থেকে দেশীয় জঙ্গিগোষ্ঠী আর্থিক সহায়তা পায় বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এ অবস্থায় জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সজাগ থাকার পাশাপাশি জঙ্গিবাদের উত্থানের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণগুলোর বিষয়েও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। জঙ্গিবাদী হামলা বা এই ধরনের কোনো সন্ত্রাসবাদী তৎপরতাকে কেবল সামরিক কৌশলে পরাস্ত করলেই হবে না, সামাজিকভাবে এর মূলোৎপাটনের পদক্ষেপ জোরদার করতে হবে। সেটা করতে হলে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে এগিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।