করোনার থাবায় বিক্রিতে ধস

উৎপাদন বন্ধ, বড় লোকসানে বাটা

দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে টানা ৬৬ দিনের লকডাউনে উৎপাদিত পণ্য বিক্রিতে বড় ধাক্কা খেয়েছে চামড়া খাতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাটা সু কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড। চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) পণ্য বিক্রি ৮৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় ব্যাপক লোকসানে পড়েছে দেশে এক সময়ের শীর্ষ জুতা উৎপাদনকারী এই প্রতিষ্ঠানটি। কোনো প্রান্তিকে এমন লোকসানের ঘটনা কোম্পানিটির ইতিহাসে এবারই প্রথম। ঈদের জন্য মজুদ করা পণ্য বিক্রি করতে না পারায় বাটা সু চার মাস ধরে বন্ধ রেখেছে কারখানা।

বাটা সুর অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির নিট লোকসান হয়েছে ৭৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ২১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা নিট মুনাফা ছিল। এমনিতেই গত কয়েক বছর ধরে দেশীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জুতার বাজার হারাচ্ছে বাটা সু কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড। এখন মহামারী করোনায় জুতা বিক্রির সবচেয়ে বড় মৌসুম ঈদুল ফিতরে ব্যবসা করতে না পারায় বাটা সু তাদের উৎপাদন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রেখেছে। লোকসান কমিয়ে আনতে ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে বহুজাতিক এই প্রতিষ্ঠানটি। দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্যাপক লোকসানের সঙ্গে কোম্পানির নগদ প্রবাহ ঋণাত্মকে নেমেছে।

লোকসান প্রসঙ্গে অনিরীক্ষিত প্রতিবেদনে বাটা সু বলছে, সারা বছর যে বিক্রি হয় তার ২৫ শতাংশ আসে রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে। ভালো মানের ও বেশি দামের পণ্যগুলো এ সময় বিক্রি হয়। ফলে লাভও থাকে অনেক বেশি। কিন্তু এবার এপ্রিল-জুন সময়ে যে পরিমাণ বিক্রি হয় তা গত বছরের এই সময়ে বিক্রির মাত্র ১৫ শতাংশ। বিক্রি নগণ্য হলেও এ সময় স্থায়ী খাতগুলোর জন্য যথারীতি ব্যয় হয়েছে; বাড়তি জুতা তৈরির জন্য বাড়তি মজুরি দিতে হয়েছে। কিন্তু বিক্রি কম হওয়ায় খরচের টাকা উঠে আসেনি; ফলে কোম্পানি লোকসানে চলে গিয়েছে।

বাটা সু কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের কোম্পানি সচিব হাশিম রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুই ঈদে পণ্য বিক্রি করে কোম্পানি মুনাফায় থাকে। আর বছরের অন্য সময়ে পণ্য বিক্রির আয় দিয়ে ব্রেক ইভেনে থাকে। কিন্তু এবার মহামারীর কারণে রোজার ঈদে ব্যবসা হয়নি। অথচ ওই উৎসবকে কেন্দ্র করে বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করা হয়েছিল। এখন পণ্যের স্তূপ জমে যাওয়ায় কারখানার উৎপাদন মার্চ থেকেই বন্ধ রয়েছে। সবচেয়ে বড় মৌসুমে পণ্য বিক্রি করতে না পারায় এবারই প্রথম লোকসানে পড়ল বাটা।

হাশিম রেজা আরও বলেন, এখন শোরুম খোলা থাকলেও বিক্রি অনেক কম। এখন বিভিন্ন ধরনের ব্যয় কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। কোম্পানির বড় খরচের একটি হচ্ছে শো-রুম ভাড়া। শো-রুমের জায়গার মালিকদের সাথে আলোচনা করে এগুলোর ভাড়া কমিয়ে আনার পদক্ষেপ নিয়েছি। নতুন করে শো-রুম খোলা হচ্ছে না। মূলধনী ব্যয়ও বন্ধ। কর্মী ছাঁটাই না করেই আমরা ব্যয় সংকোচনের পদক্ষেপ নিয়েছি। আর ঈদের পর মজুদ পণ্য বিবেচনা করে কবে নাগাদ কারখানা খোলা হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাটা সুর দ্বিতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ সময় কোম্পানির পণ্য বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ৪১ কোটি ২৪ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৮২ কোটি টাকা। চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে পণ্য বিক্রির বিপরীতে উৎপাদন ব্যয় হয়েছে ৬২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ফলে মোট আয়ে বাটা সুর লোকসান হয়েছে ২১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে মোট আয়ে ১১১ কোটি টাকা মুনাফা ছিল। প্রশাসনিক, বিক্রি ও বিতরণ খরচের পর চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে পরিচালন লোকসান দাঁড়ায় ৬৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ৩৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা পরিচালন মুনাফা ছিল। সুদ বাবদ ব্যয় ও কর পরিশোধের পর চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে বাটা সু’র নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৭৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির ২১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা নিট মুনাফা ছিল।      

দ্বিতীয় প্রান্তিকে বড় লোকসানের কারণে চলতি প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) বাটা সু’র নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৭০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। চলতি প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) কোম্পানির নিট মুনাফা ছিল ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

বিশ্বের ৭০টি দেশে ব্যবসা করছে বাটা সু কোম্পানি। বাংলাদেশে কোম্পানিটি প্রায় ৫৭ বছর ধরে ব্যবসা করছে। শুরু থেকেই স্থানীয় বাজারে আধিপত্য বজায় রাখে কোম্পানিটি। তবে গত কয়েক বছরে এ চিত্র পাল্টাতে শুরু করেছে। বাটা সুকে হটিয়ে স্থানীয় বাজারের শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড। গত কয়েক বছরে অভ্যন্তরীণ বাজার ধরতে ওরিয়ন, প্রাণ-আরএফএল, ইউএস-বাংলা ও রানারের মতো করপোরেট প্রতিষ্ঠান জুতার ব্যবসায় নেমেছে। এছাড়া লেদারেক্স, জিলস ও বে সুজের মতো কিছু কোম্পানিও দেশের বিভিন্ন স্থানে নিজস্ব শো-রুম দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে। এর বাইরে সস্তা চীনা পণ্যেরও বিশাল বাজার রয়েছে। এসব কারণে বাজার হারিয়ে বাটা সু নেমে এসেছে দ্বিতীয় স্থানে। ২০১৮ সালের সমাপ্ত হিসাব বছরেও কোম্পানির নিট মুনাফা কমে সাড়ে ১১ শতাংশ। আর ২০১৯ সালে নিট মুনাফা ৫০ শতাংশ কমে যায়।