পল্লবী থানার ভেতর বিস্ফোরণ

ঢাকাসহ সারা দেশে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার শঙ্কায় পুলিশি সতর্কতার মধ্যেই রাজধানীর একটি থানার মধ্যে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বুধবার সকালে পল্লবী থানা ভবনে ওই বিস্ফোরণে চার পুলিশ কর্মকর্তাসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। আগের দিন রাতে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও ডিজিটাল ওয়েট মেশিনের মতো একটি ডিভাইসসহ তিন ব্যক্তিকে আটক করেছিল পল্লবী থানা পুলিশ। ওয়েট মেশিনসদৃশ ওই বস্তুটি পুলিশ পরীক্ষা করতে গেলে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ডিজিটাল ওই ডিভাইসটির মধ্যে বোমা রাখা ছিল। সারা দেশে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় গৃহীত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার মধ্যে থানায় এ বিস্ফোরণে হতচকিত হয়ে পড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) পল্লবী থানার ওই বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছেন অনলাইনে জঙ্গি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন সাইট ইনটেলিজেন্স গ্রুপের পরিচালক রিটা কাটজ। তবে এ ঘটনার সঙ্গে নিষিদ্ধঘোষিত কোনো জঙ্গি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। একই কথা বলছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারাও। তারা এ বিস্ফোরণের ঘটনাকে পেশাদার সন্ত্রাসীদের হামলা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন। থানা পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, সিআইডি, পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ), ডিএমপির সিটিটিসি ও ডিবি এ বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্তে নেমেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, অস্ত্র, গুলি ও ওয়েট মেশিনসদৃশ বস্তুটিসহ গ্রেপ্তার তিনজনই শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত বাহিনীর সদস্য। স্থানীয় এক রাজনীতিককে হত্যার উদ্দেশ্যে তারা এসব বোমা ও অস্ত্র বহন করছিল।

করোনা ও বন্যার নাজুক পরিস্থিতিতে ঢাকাসহ সারা দেশে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় সম্প্রতি পুলিশের সব ইউনিটকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছিল পুলিশ সদর দপ্তর। গত ১৯ জুলাই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিভিন্ন ইউনিটে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছিল, আইএস মতাদর্শের দেশীয় অনুসারী ‘নব্য জেএমবির’ সদস্যরা যেকোনো সময় ‘আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলা’ পরিচালনা করতে পারে।

গতকালের বিস্ফোরণে আহতরা হলেন পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইমরানুল ইসলাম, এসআই সজীব খান, এসআই রুমি বেভারেজ হায়দার ও এএসআই অঙ্কুশ কুমার এবং রিয়াজুল ইসলাম ওরফে রিয়াজ নামে এক ব্যক্তি।

বিস্ফোরণস্থল পল্লবী থানা পরিদর্শন শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় সাংবাদিকদের জানান, মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মিরপুরের কালশী কবরস্থান এলাকা থেকে তিন সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়, যাদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলিসহ ওয়েট মেশিনসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়। এ বস্তুটি পরীক্ষার জন্য সিটিটিসির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপকে ডাকা হয়। এরই মধ্যে সকাল সাতটার দিকে থানা পুলিশ ওয়েট মেশিনসদৃশ বস্তুটি পরীক্ষার জন্য গেলে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে চারজন পুলিশ কর্মকর্তা ও থানার একজন সিভিলিয়ান কর্মচারী আহত হন। এরপর ওয়েট মেশিনসদৃশ বস্তু ছাড়াও উদ্ধার করা মালামালের মধ্যে আরও কিছু বিস্ফোরক পাওয়া যায়, যেগুলো পরে নিষ্ক্রিয় করা হয়।

কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘এ সন্ত্রাসীরা মিরপুর বেইজড অপরাধী। এদের সঙ্গে কোনো জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। এছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সারা দেশে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা করে যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছিল তার সঙ্গেও এটির সম্পর্ক নেই। এ পেশাদার অপরাধীরা কারও জমি দখল বা কাউকে মেরে পালানোসহ যেকোনো অপরাধ কর্মকাণ্ড করে পালানোর সময় এগুলো ব্যবহার করতে পারে অথবা পুলিশকে বিভ্রান্ত করার মতলবও থাকতে পারে। বিষয়টির বিশদ তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।’

পল্লবী থানার এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে জানান, আগের রাতে তিন সন্ত্রাসী আটক করে তাদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার ছাড়াও ডিজিটাল ওয়েট মেশিনের মতো একটি ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি নিয়ে আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রথমদিকে তারা সঠিক উত্তর দেয়নি। পরবর্তী সময়ে তাদের একজন ওই ওয়েট মেশিনে বোমা থাকার কথা জানায়। এ তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ সিটিটিসির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের বোম্ব ডিজপোজাল ইউনিটকে খবর দেয়। এরপর ওয়েট মেশিনসদৃশ বস্তুটি থানার পরিদর্শকের (তদন্ত) টেবিলে রেখে কৌতূহলের বশে কেউ নাড়াচাড়া করলে তা বিস্ফোরিত হয়।

পল্লবী থানার ওসি নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওয়েট মেশিনসদৃশ ডিজিটাল ডিভাইসটির মধ্যে একাধিক বোমা রাখা ছিল। এর একটি বিস্ফোরিত হয়, আরেকটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। প্রথম বিস্ফোরণের ঘটনায় থানার দ্বিতীয় তলার একটি ঘরের জানালার কাচ ও আসবাবপত্র তছনছ হয়ে পড়ে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, পুলিশের একাধিক টিম এ ঘটনার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করার জন্য কাজ করছে। শিগগিরই এ বিস্ফোরণের রহস্য উদঘাটন হবে বলেও সাংবাদিকদের জানান তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন জানান, আহতদের সবার শরীরে স্প্লিন্টারের আঘাত পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে রুমির বাঁ হাতে স্প্লিন্টারের আঘাত পাওয়া গেছে। রিয়াজুল ইসলামের হাতসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গা ঝলসে গেছে। ইমরানুলের পায়ে স্পিøন্টারের আঘাত ও সজীবের কান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া অঙ্কুশ কুমারের চোখে আঘাত লেগেছে। তাকে জাতীয় চক্ষু ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।

এ চিকিৎসক বলেন, ‘আহত পুলিশ কর্মকর্তাদের সবাই শঙ্কামুক্ত হলেও সিভিলিয়ান রিয়াজের অবস্থা গুরুতর। তার বাম হাতের কব্জি বিস্ফোরণে ক্ষতবিক্ষত হওয়ায় অস্ত্রোপচারের সময় কেটে ফেলা হয়েছে। এছাড়া তার ডান হাতের একটি আঙুল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটিও কেটে ফেলা হয়েছে। তার পেটেও বড় ধরনের আঘাত আছে।’

দায় স্বীকার আইএসের, দাবি মিথ্যা বলছে পুলিশ : মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) পল্লবী থানার ওই বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছেন অনলাইনে জঙ্গি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন সাইট ইনটেলিজেন্স গ্রুপের পরিচালক রিটা কাটজ। তবে আইএসের এই দাবি মিথ্যা বলে জানিয়েছে পুলিশ। গতকাল রাতে আইএসের ওয়েবসাইটের একটি ছবি টুইটে প্রকাশ করে রিটা এই দাবি করেন।

টুইটে তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার একটি পুলিশ সদর দপ্তরে বিস্ফোরণের ঘটনায় দায় স্বীকার করেছে আইএস।’ ২০১৯ সালের আগস্টের পর এটা ঢাকায় আইএসের প্রথম হামলা বলে উল্লেখ্য করেন তিনি। ঈদুল আজহার আগে নতুন লড়াইয়ের (অ্যাট্রিশন ওয়ারফেয়ার) প্রচারণার অংশ হিসেবে ঢাকায় এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে আইএস। যদিও আইএসের দাবির পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরেননি তিনি।

গতকাল সকাল ৭টার দিকে বিস্ফোরণের ঘটনার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর এমন তথ্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তা। কথিত সাইট ইন্টেলিজেন্স ও এর পরিচালকের টুইটবার্তা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) উপকমিশনার (ডিসি) সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টুইটবার্তা দেখেছি। যতদূর বুঝতে পারছি, এটি  বোগাস।’

আগের রাতে আটক হয় যারা : পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার রাতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলো শহীদুল ইসলাম, মোশাররফ হোসেন ও রফিকুল ইসলাম। বিস্ফোরণের পরপরই তাদের ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদকারী এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তাররা সবাই পেশাদার সন্ত্রাসী। তিনজনই শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত বাহিনীর সহযোগী। পুলিশের কাছে তথ্য ছিল, স্থানীয় এক রাজনীতিককে হত্যার উদ্দেশ্যে তারা এসব বোমা ও অস্ত্র বহন করছিল। গোপনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তাদের সঙ্গে ছিল এমন আরও একাধিক সন্ত্রাসী পালিয়ে গেছে। তাদেরও গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওয়েট মেশিনসদৃশ বস্তুটির বিস্ফোরিত আলামতের প্রাথমিক বিশ্লেষণে মনে হয়েছে, এটি ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসের (আইইডি) মতো। এ ধরনের বিস্ফোরক সাধারণত জঙ্গি সদস্যরা ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু গ্রেপ্তার তিন পেশাদার অপরাধী এ ধরনের বোমা কীভাবে তৈরি করল কিংবা কাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করল সে বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

সিটিটিসির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের উপকমিশনার আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইইডির আদলে তৈরি করা বোমাগুলো খুবই সাধারণ মানের। সন্ত্রাসীরা এসব কেন, কী উদ্দেশ্যে তৈরি করেছিল তা জানার চেষ্টা চলছে।’

প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বিস্ফোরণের পরপরই থানার ভেতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য ছোটাছুটি করতে থাকেন। বিস্ফোরণের পর থানার স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। যে কক্ষে বিস্ফোরণ ঘটেছে সেই কক্ষের দুটি জানালার মধ্যে একটি ভেঙে নিচে রাস্তায় পড়ে যায়। অন্যটি ওপরে ঝুলে ছিল। বোমার বিস্ফোরিত বিভিন্ন অংশ আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে।

বিস্ফোরণে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা নেই : পল্লবী থানায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার সঙ্গে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল এ বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না এ ঘটনার সঙ্গে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা আছে। যাদের আটক করা হয়েছে তারা ডাকাত দলের সদস্য। তাদের কাছে থাকা কিছু একটার বিস্ফোরণ হয়েছে। তারপরও তদন্ত শেষে এর বিস্তারিত বলা যাবে।’

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সতর্কবার্তা জারি করা হয়। পুলিশকে টার্গেট করে বা পুলিশ স্থাপনায় হামলা হতে পারে বলে শঙ্কা জানিয়ে সতর্ক থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড, নাশকতা ও ধ্বংসাত্মকমূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করছে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আদলে গঠিত নব্য জেএমবির সদস্যরা। সতর্কবার্তায় গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে পুলিশ (পুলিশের কোনো টিম, স্থাপনা বা যানবাহন) বিমানবন্দর, দূতাবাস ভবন বা দূতাবাসসংশ্লিষ্ট বিশেষ ব্যক্তি অথবা শিয়া-আহমদীয়া উপাসনালয়, মাজারকেন্দ্রিক মসজিদ, চার্চ, প্যাগোডা, মন্দিরগুলোকে টার্গেট করা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। হামলার সম্ভাব্য দিন-তারিখ উল্লেখ না থাকলেও হামলার সময় সকাল ৬-৭টা অথবা সন্ধ্যা ৭ থেকে রাত ১০টায় হতে পারে বলে জানানো হয়।