আমদানি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব লো-সালফার জ্বালানি

দেশে প্রথমবারের মতো সমুদ্রগামী জাহাজ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার উপযোগী স্বল্পমাত্রার দূষণের লো-সালফার অয়েল আমদানি করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) বাধ্যবাধকতা প্রতিপালনে এই তেল আমদানির সব প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। বিপিসির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনসাপেক্ষে আসছে আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে দেড় লাখ টন লো-সালফার অয়েল আবুধাবি থেকে আমদানি করা হবে, যা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত চাহিদা মেটাবে। এর মধ্যে অর্ধেক তেল দরপত্রের মাধ্যমে এবং বাকি অর্ধেক জি-টু-জির ভিত্তিতে আমদানি হবে। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে এমিরাটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি লি. (এনকো) প্রথমবারের মতো এই জ্বালানি তেল বিপিসিকে সরবরাহ করবে।

বিপিসি কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক চাহিদা নিরূপণ করে আগামী ছয় মাসের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার টন লো-সালফার অয়েল আমদানি করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশে আসা বিদেশি জাহাজগুলোতে সরবরাহ করা যাবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দরপত্র অনুযায়ী প্রতি টন লো-সালফার অয়েলের দাম পড়বে ৩৭ মার্কিন ডলার। এর সঙ্গে পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় সমন্বয় করে বিপিসি এই তেলের মূল্য নির্ধারণ ও বিক্রি  করবে। তবে তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। শিপিং এজেন্টস ও দেশীয় সমুদ্রগামী জাহাজ মালিকরা বলছেন, লো-সালফার অয়েল সরবরাহ করে বিপিসি কতটা লাভবান হবে বা সরকার কতটা রাজস্ব পাবে তা প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণের ওপর নির্ভরশীল। অবশ্য বেসরকারি জাহাজ মালিকরা বিপিসির এই উদ্যোগকে খুবই ইতিবাচক উল্লেখ করেছেন।

বর্তমানে  চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে  সমুদ্রগামী দেশি-বিদেশি জাহাজে শুধু উচ্চমাত্রার কার্বন নিঃসৃত ফার্নেস অয়েল সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে বেশিরভাগ সমুদ্রগামী জাহাজ সিঙ্গাপুর বা কলম্বো বন্দর থেকে লো-সালফার অয়েল সংগ্রহ করে আসছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন তথা কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। তাছাড়া দেশের প্রধান দুই সমুদ্রবন্দরে লো-সালফার অয়েল সহজলভ্য না হওয়ায় চোরাইপথে এই তেলের অবৈধ বাংকারিং কারবারও জমজমাট হয়ে উঠেছে।

লো-সালফার অয়েল আমদানির প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিপিসির উপ-মহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দূষণ কমাতে আইএমও গত ১ জানুয়ারি থেকে সমুদ্রগামী জাহাজে ফার্নেস অয়েলের স্থলে লো-সালফার অয়েল ব্যবহারের নির্দেশনা জারি করে। নানা কারণে কিছুটা বিলম্ব হলেও ওই নির্দেশনা প্রতিপালনে আমরা ওই জ্বালানি তেল  আমদানির দরপত্রসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছি। বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। আশা করি, আগস্টের শুরুতেই এই তেলের সরবরাহ মিলবে।’

সর্বনিম্ন প্রতি টন ৩৭ ডলার দরদাতা হিসেবে দেড় লাখ টন লো-সালফার অয়েল আবুধাবির প্রতিষ্ঠান এনকো লি. সরবরাহ করবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘নিম্ন মাত্রার কার্বণ নিঃসৃত লো-সালফার অয়েল জাহাজ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সমভাবে ব্যবহার উপযোগী এবং তাতে বায়ুদূষণের মাত্রা অনেক কম। ফার্নেস অয়েলে বায়ুদূষণের মাত্রা প্রতি বর্গমিটারে ৩.৫%, যেখানে লো-সালফার অয়েলে তা অনেক কম। তবে ফার্নেস অয়েলের চাইতে লো-সালফার অয়েলের মূল্য ৩০ শতাংশ বেশি। তা সত্ত্বেও আইএলওর নির্দেশনা অবশ্যই পালনীয়।’

এ ব্যাপারে, সমুদ্রগামী জাহাজে তেল সরবরাহকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ বাংকার সাপ্লাইয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে ইতিমধ্যে বিপিসির একটি দিকনির্দেশনামূলক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেও জানান ডিজিএম জাহিদ হোসেন।

সমভাবে ব্যবহার উপযোগী এবং তাতে বায়ুদূষণের মাত্রা অনেক কম উল্লেখ করে জাহিদ হোসেন বলেন, ফার্নেস অয়েলে বায়ুদূষণের মাত্রা প্রতি বর্গমিটারে ৩.৫%, লো-সালফার অয়েলে তা অনেক কম। তবে ফার্নেস অয়েলের চাইতে লো-সালফার অয়েলের মূল্য ৩০%, বেশি। তা সত্ত্বেও আইএলওর নির্দেশনা অবশ্যই পালনীয়।

এ ব্যাপারে সমুদ্রগামী জাহাজে তেল সরবরাহকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ বাংকার সাপ্লায়ার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে ইতিমধ্যে বিপিসির একটি দিকনির্দেশনামূলক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেও জানান ডিজিএম জাহিদ হোসেন।

জানতে চাইলে বাংকার সাপ্লয়াার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মিজানুর রহমান মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ছয় বছর আগেই বিপিসিকে সমুদ্রগামী জাহাজে ডিউটি ফ্রি লো-সালফার অয়েল বাংকার্স সাপ্লায়ারদের মাধ্যমে সরবরাহ দেওয়ার কথা বলে আসছিলাম। কিন্তু তারা এটা করেনি। ফলে অবৈধ চোরাই তেলের ব্যবসা চলতে থাকে। এজন্য আমরা বৈঠকে অবৈধ তেল যাতে না আসে তার জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠনের কথা বলেছি। যাতে করে বাংকারিং ব্যবসা একটি বৈধ কাঠামোর মধ্যে আসে।’

মিজানুর রহমান সিঙ্গাপুর বন্দরের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন, ‘কেবল লো-সালফার অয়েল জাহাজে সরবরাহ করে সিঙ্গাপুর পোর্ট তাদের মোট আয়ের ১৭% রাজস্ব অর্জন করে। লো-সালফার অয়েল সরবরাহ শুরু হলে অবৈধ চোরাই তেলের ব্যবসা বন্ধ হবে এবং সরকার এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে, যা বিগত বছরগুলোতে সরকার বিপিসির কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কারণে হারিয়েছে।’

এদিকে দেরিতে হলেও বিপিসির লো-সালফার অয়েল আমদানির উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন এবং দেশীয় সমুদ্রগামী জাহাজ মালিকরা।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএএ) প্রেসিডেন্ট এহসানুল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমুদ্রগামী জাহাজগুলো সহজলভ্যতার কারণে বর্তমানে সিঙ্গাপুর ও কলম্বো বন্দর থেকেই লো-সালফার অয়েল কিনতে বেশি আগ্রহী। এক্ষেত্রে বিপিসি তুলনামূলক কাছাকাছি দরে এই তেল বিক্রি করতে পারলে তার থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় বা বিপুল অঙ্কের রাজস্ব পেতে পারে।’

প্রায় একই রকম অভিমত ব্যক্ত করে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ও সমুদ্রগামী জাহাজের মালিকানা প্রতিষ্ঠান কেমসআরএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটি বিপিসির একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। আমরা গত ১ জানুয়ারি থেকেই আমাদের সমুদ্রগামী সব জাহাজে লো-সালফার অয়েল ব্যবহার করছি। তবে বিপিসির আমদানিকৃত এই তেলের বিক্রয়মূল্য প্রতিযোগিতামূলক হলেই আমরা লাভবান হতে পারব। পুরো বিষয়টি কমপারেটিভ রেটের ওপর নির্ভরশীল।’