চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। আগের অর্থবছরের সঙ্গে মিল রেখেই এ খাতে প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ ধরা হয়েছে। যদিও গত অর্থবছরের শুরু থেকেই বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমতির দিকে ছিল, যা করোনার কারণে আরও নিম্নমুখী ধারা তৈরি হয়। গত অর্থবছরে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই আবারও একই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অবশ্য এজন্য ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে মুদ্রানীতিতে। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে মুদ্রানীতির ঘোষণাপত্র আপলোড করা হয়েছে।
যদিও কভিড-১৯-এর দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তার কারণে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পুনরুদ্ধারের গতি-প্রকৃতি বাধাগ্রস্ত হলে মুদ্রানীতি কর্মসূচির উদ্দীষ্টগুলো অর্জনে কিছু ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন গভর্নর ফজলে কবির।
মুদ্রানীতি ঘোষণায় লিখিত বক্তব্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, কভিড পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক যেসব প্রণোদনা, ঋণ ও বিনিয়োগ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলো যথাযথভাবে উৎপাদন ও কর্মসৃষ্টি সহায়ক উপায়ে বাস্তবায়িত না হলে মন্দঋণ বৃদ্ধিসহ অনাকাক্সিক্ষত মূল্যস্ফীতি সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বৈশ্বিক চলমান অর্থনৈতিক মন্দার দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশের রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সের অন্তঃপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাবের সম্ভাবনার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে চলমান বন্যার কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, করোনাভাইরাস মহামারীতে বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন বিনিয়োগ জোরদারকরণে বেসরকারি খাতে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২০-২১-এর মুদ্রানীতি ভঙ্গিকে স্পষ্টতই সম্প্রসারণমূলক ও সংকুলানমুখী উল্লেখ করে গভর্নর জানান, মুদ্রানীতির মূল কাজ হলো মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে অর্থনৈতিক কর্মকা-কে স্বাভাবিক অর্থাৎ কভিড-১৯ পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
প্রবৃদ্ধির এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রাকে দুটির যোগফল থেকে প্রাপ্ত নমিনাল বা বাজারমূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এর সঙ্গে অর্থের আয় গতির পরিবর্তন সমন্বয় করে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের (যা মুদ্রানীতির মধ্যবর্তী লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত) প্রয়োজনীয় প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয় ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
২০২০-২১ অর্থবছরে বৈদেশিক লেনদেন খাতের সম্ভাব্য গতিধারা বিবেচনা করে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের অন্যতম উপাদান ব্যাংক ব্যবস্থার নিট বৈদেশিক সম্পদের প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, যা গত অর্থবছরের (১০ দশমিক ২ শতাংশ) তুলনায় অনেক কম।
এ অর্থবছরে নিট বৈদেশিক সম্পদের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সম্প্রসারণমূলক ও সংকুলানমুখী মুদ্রানীতি ভঙ্গির কারণে নিট অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। সে হিসাবে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মধ্যে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা একই থাকলেও অর্জন হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম।
গভর্নর বলেন, ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য গৃহীত সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অর্থের সরবরাহ নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে সিআরআর ও রেপো সুবিধা হারে পরিবর্তন আনয়ন, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে সরকারি সিকিউরিটিজ ক্রয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ এবং বিভিন্ন নতুন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালুর পাশাপাশি ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালুকরণের মতো পদক্ষেপসমূহ কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে প্রত্যাশা করা যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যাংকের তহবিল ব্যয় কমাতে ও তারল্য সরবরাহ বাড়াতে গতকালের ঘোষিত মুদ্রানীতিতে রেপো এবং রিভার্স রেপোর সুদ কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব পদক্ষেপ কার্যকর হলে ব্যাংকের ঋণ প্রদান সক্ষমতা যথেষ্ট বাড়বে বলে মনে করেন গভর্নর ফজলে কবির।