করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদসহ বহুমাত্রিক জালিয়াতিতে আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমকে অভিযুক্ত করে অস্ত্র মামলায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মো. শায়রুল এই চার্জশিট দাখিল করেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন এ তথ্য জানিয়েছেন।
এর আগে গতকাল সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাহেদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের কথা জানান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন।
তিনি বলেন, ‘রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদের একটি অস্ত্র মামলার আমরা তদন্ত শেষ করেছি। দুজন সাক্ষীর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। অস্ত্র মামলার চার্জশিট জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ১৫ দিনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, আমরা এর মধ্যেই করেছি। অস্ত্র পজিশনে পাওয়া গেলে সেটা দণ্ডনীয় অপরাধ, সেটা তিনি যদি ব্যবহার নাও করে থাকেন তাও অপরাধ। অস্ত্র মামলায় সাজা নিশ্চিত করতে যে ধরনের তথ্য-প্রমাণাদি দরকার আমরা সবকিছুর সত্যতা নিশ্চিত করেছি এবং তা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এখন আদালত বিচার করে এর রায় দেবে।’
আবদুল বাতেন আরও বলেন, ‘সাহেদ যখন আমাদের রিমান্ডে ছিলেন, তখন তার ভাষ্যমতে তার ব্যবহার করা গাড়িটি আমরা জব্দ করি এবং গাড়ি থেকে অবৈধ অস্ত্র জব্দ করি। সেই অস্ত্র মামলায় আমরা আজকেই চার্জশিট দাখিল করতে যাচ্ছি।’
গত ১৫ জুলাই সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে সাহেদকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে তাকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনা হয়। এর আগে গত ৬ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় অভিযান চালায় র্যাব। অভিযানে ভুয়া করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট, করোনা চিকিৎসার নামে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়ম ধরা পড়ে। পরদিন ৭ জুলাই রাতে উত্তরা পশ্চিম থানায় ১৭ জনকে আসামি করে মামলা হয়। সেই মামলায় ১০ দিনের রিমান্ডে থাকা সাহেদকে নিয়ে ১৮ জুলাই রাতে উত্তরায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়।
সাহেদের মতো সব প্রতারককে ধরা হবে : সাহেদের মতো সব প্রতারককে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তিনি বলেন, ‘বাদ যাবে না কেউ। তাদের ধরা পড়তেই হবে। প্রতারকরা সবসময় কোনো না কোনো ফাঁকফোকর বের করে নেয়। সেজন্য আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীও সব সময় সজাগ থাকে। আমরা কিন্তু কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। যেদিনই প্রতারকরা প্রকাশিত হচ্ছে, তখনই আমরা তাকে ধরছি। প্রতারকরা কেউ বাদ যাবে না, এই জায়গায় আমরা শক্ত অবস্থানে আছি। সামনে আরও ধরা পড়বে।’ গতকাল বুধবার ধানম-ির বাসভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সন্ত্রাস, মাদক ও জঙ্গি দমন করে যাচ্ছে। কভিড-১৯ এর সময়ও তারা নির্ভয়ে সেবা দিচ্ছে। এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অনন্য কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সাহেদ সবসময় ফাঁকফোকর খুঁজেছে, কীভাবে সে বেরিয়ে যাবে, কীভাবে প্রতারণা করবে। সে বিভিন্ন জায়গায় প্রতারণা করেছে। কিন্তু এবার সব কিছু উদঘাটন করে আইনের কাছে বা বিচারকের কাছে আমরা হস্তান্তর করব। সে যাতে আর কোনো ধরনের প্রতারণা করতে না পারে, সে যেন আর কোনো সুযোগ না পায় সেটা আমরা দেখব।’
সাতক্ষীরার দেবহাটায় গ্রেপ্তারের স্পটে সাহেদকে নিয়ে র্যাব : সাতক্ষীরার দেবহাটার পারুলিয়া ইউনিয়নের শাখরা কোমরপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সাহেদকে। গতকাল বিকেল ৪টার দিকে তাকে সেখানকার লাবণ্যবতী নদীর কোমরপুরের বেইলি ব্রিজের ওপর নিয়ে যায় র্যাব। এরপর উৎসুক সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের ব্রিজ থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে সরিয়ে ৫-৭ মিনিট কথাবার্তা বলে আবারও সাহেদকে গাড়িতে ওঠায় র্যাব। এ সময় সাহেদের মুখম-ল ছিল হেলমেটে ঢাকা, গায়ে ছিল গেঞ্জি ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। সাহেদকে ব্রিজের ওপর থেকেই আবার গাড়িতে উঠিয়ে ফের খুলনার উদ্দেশে রওনা দেয় র্যাব সদস্যরা। তদন্তের স্বার্থে র্যাব সদস্যরা সেখানে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের কোনো ধরনের প্রশ্ন করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে বলেন।