গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ বলতে মূলত গ্যাস্ট্রাইটিস, গ্যাস্ট্রিক আলসার বা আলসারজনিত বদহজমের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধকেই বোঝায়। ওমিপ্রাজল, ইসোমিপ্রাজল, প্যানটোপ্রাজল, ল্যানসোপ্রাজল, রেবিপ্রাজল, ফেমিটিডিন, অ্যান্টাসিড প্রভৃতি সর্বাধিক প্রচলিত ও বিক্রীত ওষুধগুলোই সাধারণ মানুষের কাছে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ নামে বেশি পরিচিত। গ্যাস্ট্রাইটিস কিংবা গ্যাস্ট্রিক আলসারে সাধারণত নাভির ওপরে পেটে ব্যথা হয় যা খালি পেটে অথবা ভোররাতের দিকে তীব্র হয়, সঙ্গে গলা-বুক-পেট জ্বলে ও টক ঢেঁকুর ওঠে। ঝাল-তেল-মসলাজাতীয় খাবারে এই সমস্যা আরও বেশি হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে অধিকাংশ সাধারণ মানুষই যেকোনো পেট ব্যথা মানেই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বলে মনে করেন। আসলে আমাদের দেশে প্রায় ৭০-৮০% মানুষই অপ্রয়োজনে প্রোটন-পাম্প ইনহিবিটর বা অ্যান্টি আলসারেন্ট জাতীয় ওষুধ সেবন করে থাকেন এবং এদের অধিকাংশই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যখন-তখন এবং টানা দীর্ঘদিন এইসব ওষুধ গ্রহণ করেন। বেশির ভাগ মানুষেরই ধারণা, এইসব ওষুধের কোনো ক্ষতিকর দিক নেই। কিন্তু কোনো ওষুধই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত নয়।প্রোটিন জাতীয় খাদ্য পরিপাক এবং খাবারের জীবাণু ধ্বংসে পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক এসিড খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া খাবারের লৌহ শোষণেও এর ভূমিকা অপরিসীম। লৌহ আমাদের রক্তকণিকা ও মাংসপেশি গঠনে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও স্নায়ুবিকাশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস্ট্রিকের ওষুধগুলোর মূল কাজ পাকস্থলীর এই এসিড নিঃসরণ কমিয়ে দেওয়া। এতে পাকস্থলীর অমøতা কমে যায়, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কিছুটা লাঘব হয় কিন্তু বিভিন্ন স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কাজে ব্যাঘাতও ঘটে। এ ছাড়া শরীরে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম শোষণও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে শরীরে বিভিন্ন জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি রক্তশূন্যতা, হাড়ের ক্ষয়রোগ, বৃক্কের কার্যকারিতা হ্রাস এবং গ্যাস্ট্রিক পলিপের মতো রোগের আশঙ্কা অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। পাকস্থলীতে হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি নামের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থাকলে আলসার বা এসিডিটি সহজে সারে না। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট চিকিৎসা আছে, যা রোগ নির্ণয় করে নির্দিষ্ট মেয়াদে গ্রহণ করতে হয়। শুধু প্রোটন-পাম্প ইনহিবিটর জাতীয় ওষুধ খেয়ে গেলে তা আরোগ্য হয় না। আবার দীর্ঘদিন এসিডিটির ব্যথা, হজমের সমস্যা, গ্যাস বা পেট ফাঁপার পেছনে পিত্তথলির সমস্যা কিংবা পাকস্থলীর ক্যানসারের মতো অন্যান্য কারণও থাকতে পারে। এ কারণে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় বছরের পর বছর গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেয়ে যাওয়া কোনো সমাধান নয়। কারণ খুঁজে বের করে তার যথাযথ চিকিৎসা করাতে হবে। অ্যান্টি আলসারেন্ট মূলত পেপটিক আলসারের চিকিৎসায় নির্দিষ্ট মেয়াদে ব্যবহার করার কথা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম বা নন-আলসার বদহজমের চিকিৎসায় অনেকেই না বুঝে এসব ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার করেন। আবার কখনো কখনো কেউ কেউ হুট করে এসব ওষুধ সেবন বন্ধও করে দেন। এতে তারা অতিরিক্ত রিবাউন্ড এসিডিটির সমস্যায় পড়তে পারেন। অন্য অনেক ওষুধের মতো এগুলোও সেবনের যেমন নিয়ম আছে, তেমনি তা ছাড়ারও নিয়ম আছে। তাই গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবন শুরু ও বন্ধ করার ব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিজের রোগ সম্পর্কে জেনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করুন ও প্রয়োজন ছাড়া ওষুধ খাওয়া পরিহার করে সুস্থ থাকুন।