নিহত শতাধিকের মধ্যে আছেন ৪ বাংলাদেশিও, আহত ৪০০০

লেবাননের বৈরুতে গত মঙ্গলবারের বিস্ফোরণে দেশটিতে থাকা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছেন অন্তত চার বাংলাদেশি। ওই ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত মোট নিহতের ঘটনা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ১০০ জনে। আহত হয়েছে কম করে হলেও ৪ হাজার মানুষ। শহরের বন্দর এলাকা পুরো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

গতকাল বাংলাদেশ আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বৈরুতে মঙ্গলবারের বিশাল বিস্ফোরণে বন্দরের কাছে থাকা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নৌবাহিনীর জাহাজ বানৌজা বিজয় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিল। বিস্ফোরণে জাহাজটির অন্তত ২১ সদস্য আহত হয়েছেন। আহতদের বৈরুতের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করে আসছে। ভূমধ্যসাগরে মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম টাস্কফোর্সের সদস্য হিসেবে বর্তমানে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ বিজয় ইউনিফিলে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত।

আহতদের একজনের অবস্থা গুরুতর। বিস্ফোরণে নৌবাহিনীর একটি জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গুরুতর আহত নৌসেনাকে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত মেডিকেল সেন্টারে (এইউবিএমসি) ভর্তি করা হয়েছে। নৌবাহিনী জানিয়েছে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে মেরিটাইম টাস্কফোর্সের অধীনে বাংলাদেশ নৌবাহিনী জাহাজ ‘বিজয়’-এ ছিলেন তারা। আহত অন্যদের ইউনিফিলের তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হেলিকপ্টার বা অ্যাম্বুলেন্সে করে হামুদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে তারা শঙ্কামুক্ত। শান্তিরক্ষা মিশন ইউনিফিলের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আহত নৌ-সদস্যদের চিকিৎসা চলছে। নৌবাহিনী জানিয়েছে, এ দুর্ঘটনায় নৌবাহিনীর জাহাজ বিজয়ের বিস্তারিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে নৌবাহিনীর জাহাজ, ইউনিফিল সদর দপ্তর ও বৈরুতে বাংলাদেশি দূতাবাসের সঙ্গে নৌবাহিনী সদর দপ্তরের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা জানান, বিস্ফোরণে অন্তত দুজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ দূতাবাসের হেড অব চ্যান্সেরি ও ফার্স্ট সেক্রেটারি আবদুল্লাহ আল মামুন বলছেন, ‘এখন পর্যন্ত দুজন বাংলাদেশি মারা যাওয়ার খবর সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেরেছি আমরা।’ বৈরুতের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মি. মামুন জানান, মারা যাওয়া দ্জুন বাদে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৯ জন বাংলাদেশি বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন।

মঙ্গলবারের জোড়া বিস্ফোরণের এই ধ্বংসলীলার মধ্যে ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে লেবাননের সরকার। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, বিস্ফোরণে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১০০ জনে দাঁড়িয়েছে। বিস্ফোরণে শহরটির অর্ধেকই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় গভর্নর মারওয়ান আবৌদ। এ দুর্ঘটনায় বৈরুতের অন্তত তিন লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন বলেও জানান তিনি। বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন চার হাজারেরও বেশি। এখনো অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে রয়েছেন বলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গভর্নর আবৌদ।

বিস্ফোরণে শতাধিক প্রাণহানির পরেই লেবাননের রাজধানী বৈরুতের বন্দরে বিপুল পরিমাণ বিপজ্জনক রাসায়নিক মজুদের বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে। বন্দরটিতে ২ হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট রাখা ছিল বলে জানা গেছে। এটি মূলত বোমা ও সার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এ রাসায়নিক থেকে বিস্ফোরণেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে বৈরুতের অর্ধেকটা। দুর্ঘটনার পর থেকেই চলছে নানা হিসাব-নিকাশ, কে দায়ী, কার দোষে ঘটল এমন মর্মান্তিক ঘটনা? অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া সরকারি নথির ছবি থেকে জানা গেছে, অন্তত ছয় বছর ধরে লেবানিজ কর্মকর্তারা বন্দরে এমন বিপদের আশঙ্কার কথা জানতেন।

বৈরুতের ঘটনায় বিশ্ব নেতারাও শোক প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিস্ফোরণের ঘটনাকে নাশকতামূলক হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ আজ লেবাননে যাবেন বলে জানিয়েছেন।