মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে দোষী ব্যক্তিদের ফাঁসি চেয়েছে রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া)। গতকাল বুধবার বিকেলে রাওয়ার হেলমেট হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এ দাবি তুলে ধরেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠন রাওয়ার চেয়ারম্যান মেজর (অব.) খন্দকার নূরুল আফসার। এ সময় রাওয়ার পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ১১টি দাবি তুলে ধরা হয়।
লিখিত বক্তব্যে রাওয়া চেয়ারম্যান বলেন, “দীর্ঘদিন যাবৎ বিচারবহির্ভূত ‘ক্রসফায়ারে মৃত্যু’ বা ‘হারিয়ে যাওয়ার’ মাধ্যমে ব্যক্তিকে গায়েব করে সমাজের বিভিন্ন অপরাধ দমনের প্রবণতার নেতিবাচক দিকগুলো সাম্প্রতিক সময়ে প্রায়শই প্রকাশ পাচ্ছে। সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সরকারের বিভিন্ন প্রয়াস বিনষ্ট করতে আমাদের সমাজে অবৈধভাবে আস্কারা পেয়ে সুবিধাবাদী গোষ্ঠী এই ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘হারিয়ে যাওয়ার’ হুমকি ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা যেমন : অবৈধ অর্থ উপার্জন ও এলাকায় অযাচিত প্রভাবের নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করছেন। এতে প্রায়শই রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকার বিব্রত হচ্ছে। তবে এই সুবিধবাদীর সংখ্যা অনেক কম। আইনের শাসনের দুর্বলতার কারণেই হয়রানি এড়াতে অধিকাংশ জনগোষ্ঠী এসব ‘আইনবহির্ভূত কাজের’ বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে উৎসাহী হন না। ইতিহাস বলে এই প্রক্রিয়ায় সমাজে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ গড়ে ওঠে এবং সমাজে গুমোট পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।’’
তিনি আরও বলেন, “এই ধরনের অবৈধ প্রক্রিয়ায় বেড়ে ওঠা কক্সবাজার জেলার টেকনাফ এলাকার সংঘবদ্ধ ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ কর্র্তৃক পুলিশের পোশাক পরে ও সরকারের অস্ত্র ব্যবহার করে ঠাণ্ডা মাথায় মেজর সিনহার (অব.) নির্মম হত্যাকাণ্ড যেকোনো সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না। আস্কারা পেয়ে সামান্য কয়েকজন ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের কারণে একটি বিশাল বাহিনীর দায়িত্বশীল অংশ কেন অন্যের অনৈতিক বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারের দায় তাদের কাঁধে নেবে।’
রাওয়ার ১১ দফা দাবি হলো ‘তিন মাসের মধ্যে দ্রুত বিচার আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার সম্পন্ন করা এবং দোষী ব্যক্তিদের ফাঁসি কার্যকর করা; অনতিবিলম্বে সব আসামিকে মামলার স্বার্থে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো; কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহার করা এবং ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার তথ্য গোপন করে গণমাধ্যমে মিথ্যা বিবৃতি দেওয়া ও একমাত্র চাক্ষুস সাক্ষী সিফাতের বিরুদ্ধে মামলা করার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া; ওসি প্রদীপকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো; সিফাত ও ট্রাকচালকসহ সব সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো একটি ভিন্ন মন্ত্রণালয় (ভ্যাটারান মন্ত্রণালয়) গঠন করে সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের নিরাপদ ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন জীবনযাপনে সার্বিক সহায়তা নিশ্চিত করা; প্রধানমন্ত্রী সরকারের প্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী তিনি সরকারের সার্বিক বিষয়ে অবহিত আছেন এবং যথাযথ দিকনির্দেশনা দিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার করে সব সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যকে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনবেন এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে দৃঢ় পদক্ষেপ নেবেন; সব সাক্ষীর দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং আত্মীয়দের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করা যাবে না; সংবিধান মোতাবেক পুলিশ বাহিনীকে সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে জবাবদিহিমূলক আইন প্রণয়ন করে সে অনুযায়ী বাহিনীকে পুনর্গঠন করা এবং রাষ্ট্রের সব অস্ত্রধারী বাহিনীকে সংবিধান মোতাবেক সুশৃঙ্খল বাহিনীতে রূপান্তর করা বাধ্যতামূলক করা; কোনোভাবেই এই ঘটনার সঙ্গে যেন রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি বাস্তবায়িত না হয় সেদিকে সবার দৃষ্টি কামনা।’