চামড়া শিল্পে অশনিসংকেত

কোরবানির ঈদের আগে পত্রিকায় অন্যতম খবর হয় যে বাজারে বিশাল আকৃতির গরু, কোন গরু কত দামে বিক্রি হলো আর ঈদের পর খবর হয়, চামড়ার দাম নেই, বিক্রি করতে না পেরে ফেলে দিচ্ছে রাস্তায়, নদীতে। গরুর পালন বাড়ায় গরুর আকৃতি এবং দাম দুটোই বাড়ছে প্রতি বছর কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে গবাদি পশুর চামড়ার দাম নিয়ে হাহাকার চলছে। অনেকেই প্রথমে মনে করেছিলেন ব্যাপারটা সাময়িক। কিন্তু তা নয়, এখন দেখা যাচ্ছে সমস্যা শুধু স্থায়ী নয় ক্রমাগত গভীর রূপ ধারণ করছে। ৭০ হাজার টাকা দিয়ে কেনা গরুর চামড়া ২০০ টাকা অথবা ৯ হাজার টাকায় কেনা ছাগলের চামড়া ১৫/২০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে বলে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। মানুষ কোনোভাবেই হিসাব মেলাতে পারছে না একথা ভেবে যে, ১৯৯০ সালে ১০ হাজার টাকা দিয়ে গরু কিনে ৭০০ টাকায় চামড়া বিক্রি করতে পারত আর আজ সেই আকারের গরু ৭০/৮০ হাজার টাকার কমে কেনা যায় না কিন্তু সে গরুর চামড়া বিক্রির জন্য অনুরোধ করেও ২৫০ টাকায় বিক্রি করতে পারছে না। আবার অন্যদিকে তখন একজোড়া মাঝারি মানের চামড়ার জুতার দাম ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা আর এখন সে মানের জুতা কিনতে হলে ৪০০০ টাকার কমে পাওয়া যায় না। কী অদ্ভুত বিষয়, চামড়ার দাম কমে হয়েছে দশ ভাগের এক ভাগ কিন্তু চামড়ার জুতার দাম বেড়েছে দশ গুণেরও বেশি। ব্যাগ, জ্যাকেটসহ কোনো চামড়া পণ্যের দাম তো কমেনি। চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা ও ব্যবহারও তো কমেনি। তাহলে কেন এমন হচ্ছে বা কেন এটা হচ্ছে?

সরকার প্রতি বছর কোরবানি ঈদের সময় চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। গত ২৬ জুলাই কোরবানির পশুর চামড়ার দাম ঠিক করে দিয়েছিল সরকার। চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় বর্গফুট হিসেবে। এ বছর লবণযুক্ত গরুর কাঁচা চামড়া ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, ঢাকার বাইরে ২৮ থেকে ৩২ টাকা, ছাগলের চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৩ থেকে ১৫ টাকা, বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১০ থেকে ১২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত ঈদে দাম নির্ধারিত ছিল গরুর চামড়া ঢাকায় ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। ছাগলের চামড়া ১৮ থেকে ২০ টাকা বর্গফুট। আর ২০১৩ সালে গরুর চামড়ার দাম নির্ধারিত ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা আর ছাগলের চামড়া ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে কাঁচা চামড়ার দাম ক্রমাগত কমছে। গত বছর নির্ধারিত দামে চামড়া তো বিক্রি হয়নি বরং চামড়া রাস্তায় ফেলে দেওয়া, মাটিতে পুঁতে ফেলার খবর পত্রিকায় এসেছিল। করোনা মহামারী, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে ধারণা করা হয়েছিল এবার পশু কোরবানি কম হবে। বাস্তবেও হয়েছে তাই। কিন্তু চামড়া নিয়ে সংকট গত বছরের চেয়ে বেশি বলে মনে হচ্ছে। সরবরাহ কম হলে দাম বাড়ে অর্থনীতির এই সূত্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবারও চামড়া কারসাজি ঘটানো হলো। সরকার ব্যবসায়ীদের দিকে তাকিয়ে চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েও সম্ভবত তাদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। সেজন্য নির্ধারিত দাম অনুযায়ী তারা চামড়া কিনল না আর সাধারণ বিক্রেতারা পেল না দাম। প্রচণ্ড গরম আর বৃষ্টির কারণে দ্রুত সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করতে পারলে চামড়ার গুণগত মান রক্ষা করা কঠিন। ফলে সময়মতো বিক্রি করা আর আড়তে নিতে না পারার কারণে চামড়ার মান নিয়েও তৈরি হয়েছে সংশয়।

দেশের চামড়াপ্রাপ্তির সবচেয়ে বড় সময় হলো কোরবানির ঈদ। মোট চামড়ার ৬০ শতাংশ সংগৃহীত হয় এই ঈদের ৩ দিনে। ব্যক্তিগতভাবে চামড়া কেউ সংরক্ষণ করে না, বিক্রেতারা চান দ্রুত বিক্রি করতে। চামড়া বিক্রির টাকা দরিদ্র মানুষ ও মসজিদ মাদ্রাসায় দান করেন বলে দাম কম হলে কোরবানিদাতার কোনো সমস্যা নেই, ক্ষতি যা হয় তা হয় দরিদ্র মানুষের। কোরবানির পশুর যতœ করা হয় বলে ঈদের সময় চামড়ার গুণগত মান ভালো হওয়ার কথা। কিন্তু কী এক অদৃশ্য চক্করের দৃশ্যমান খেলা চলছে যে চামড়া বিক্রি করাই কঠিন হয়ে পড়ছে প্রতি বছর। গত বছরের চেয়ে ২০ থেকে ২৯ শতাংশ দাম কমিয়েও বিক্রি করা যাচ্ছে না।

গত বছর ১ কোটি ১৫ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল এবার তার চেয়ে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কম হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণত পূর্ণবয়স্ক বড় গরুতে সর্বোচ্চ ৩৫ বর্গফুট এবং ছোট গরুতে সর্বনিম্ন ১০ বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। ছাগলে ৫ থেকে ৮ বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। দেশে উৎপাদিত ২২ কোটি বর্গফুট চামড়ার প্রায় ১৫ কোটি বর্গফুট সংগৃহীত হয় কোরবানি ঈদের সময়। ফলে এটাই হলো চামড়া সংগ্রহের সর্বোত্তম মৌসুম। মৌসুমে কৃষক ধানের দাম কম পাবেন, সবজি, ফল পচে গেলেও দাম পাবেন না উৎপাদক, এই নীতিতে যখন চলছে দেশ তখন চামড়ার মৌসুমে এ ঘটনা ঘটবে তাতে দুঃখ পেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

কিন্তু মানুষের মনে বিস্ময়ের সঙ্গে ক্ষোভ জাগে এটা দেখে এবং শুনে যে ভারতে চামড়া পাচার ঠেকাতে সীমান্তরক্ষীরা তৎপর। ভারতে কেন চামড়া পাচার হবে? ভারত তো পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গরুর মাংস রপ্তানিকারক দেশ, বৃহত্তম দুধ উৎপাদনকারী দেশ। গত বছরও ২৬ হাজার কোটি রুপির বেশি মাংস রপ্তানি করে ব্রাজিলকে পেছনে ফেলেছে ভারত। যদিও হিন্দুত্ববাদী উন্মাদনা আছে গো-হত্যা নিয়ে, এটাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেও ব্যবসা চালাতে অসুবিধা হচ্ছে না মাংস ব্যবসায়ীদের। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ, কিন্তু মাংস রপ্তানি হলেও চামড়া তো ভারতেই থাকে। তা সত্ত্বেও ভারতে চামড়ার দাম বাংলাদেশের চেয়ে বেশি বলেই না পাচার হওয়ার প্রশ্ন ওঠে। ভারতে চামড়ার দাম বেশি এবং চামড়াজাত দ্রব্যের দাম বাংলাদেশের চাইতে কম, এই ধাঁধার উত্তর কী?

প্রতি বছর ঈদের আগে ব্যবসায়ীদের চামড়া কেনার জন্য সরকার ঋণ দেয়। এবারও ঋণ দেওয়ার কথা ৬৮০ কোটি টাকা। কিন্তু কাঁচা চামড়া কেনার আড়তদারদের দেওয়া হয়েছে নাকি মাত্র তিন কোটি টাকা। অন্যদিকে ট্যানারি মালিকরা ১৫০ কোটি টাকা বাকি রেখেছে। ফলে আড়তদাররা সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কিনতে পারেননি। পোস্তগোলার আড়তদার টিপু সুলতান বলেন, ‘আমাদের হাতে টাকা ছিল না, তাই তেমন কিনতে পারিনি। চাহিদা কম থাকায় চামড়ার দাম এতটা কমে গেছে।’ তিনি আরও বলেন বিক্রি না হওয়ায় এবার কমপক্ষে ২০ ভাগ চামড়া নষ্ট হয়েছে। সরকার বলবে ঋণ দেওয়া সত্ত্বেও ট্যানারি মালিকরা রপ্তানি না করতে পারায় বাকি পরিশোধ করছে না। এই সব কিছুর কারণ সমন্বয়হীনতা আর এর ফলাফল হলো এত মূল্যবান ও সম্ভাবনাময় কাঁচামালের অপচয় আর পাচারের আশঙ্কা। অন্যদিকে কিছুদিন পূর্বে ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলেও তার ইতিবাচক ফলাফল এখনো বাজারে পড়েনি।

বিশ্ববাজারে করোনার কারণে চামড়া পণ্যের চাহিদা সাময়িকভাবে কিছুটা কমলেও করোনা পরবর্তী সময়ে আবার বাড়বে। কৃত্রিম চামড়া পণ্যের পরিবর্তে প্রাকৃতিক চামড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। এখন চামড়া পণ্যের বিশ্ববাজারের আয়তন প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার। বিশ্ববাজারের ১ শতাংশ ধরতে হলেও রপ্তানি দ্বিগুণের বেশি বাড়াতে হবে। কথায় কথায় সিঙ্গাপুর আর কানাডা না হয়ে যদি ভিয়েতনামের মতো চেষ্টা করা হয় তাহলেও তো বাংলাদেশের রপ্তানি ২ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করতে পারে। আর দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার কথা যদি ধরি তাহলে ১০ কোটি মানুষ বছরে ১ জোড়া জুতা স্যান্ডেল ব্যবহার করলে বছরে গড়ে ৩০ কোটি বর্গফুট চামড়া প্রয়োজন (১ জোড়া জুতায় ৫ বর্গফুট আর স্যান্ডেলে ২ বর্গফুট চামড়া লাগে এই হিসেবে প্রতি জোড়ায় ৩ বর্গফুট চামড়া)। অথচ ২৫ কোটি বর্গফুট চামড়া বিক্রি নিয়ে হাহাকার করতে হয় প্রতি বছর। আসলে মানুষের প্রয়োজন এবং মুনাফার প্রয়োজন এক হয় না। দেশের চামড়া পচে অথচ বাজারে প্রচুর বিদেশি জুতা। চামড়ার জুতা কেনার সামর্থ্য নেই তাই কোটি কোটি মানুষের পায়ে রাবারের স্যান্ডেল। আর আমরা ভাবছি, এত চামড়া লইয়া আমরা কী করিব! মাথাপিছু আয় আর রাবার প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পরা শ্রমজীবী মানুষ দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না বৈষম্য এখন মাথা থেকে জুতা পর্যন্ত বিস্তৃত।

বাংলাদেশে চামড়ার দাম কম, চামড়া শ্রমিকের মজুরি কম, দেশের মানুষের চামড়াজাত পণ্যের প্রয়োজন আছে, চামড়া পণ্যের বিদেশে রপ্তানির সুযোগ আছে তারপরও চামড়া নিয়ে এই তেলেসমাতি চলছে কেন? দেশের মানুষ গড়ে বছরে কয়দিন মাংস খায়? ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দামের গরু-খাসির মাংস বিশাল অংশের মানুষের কাছে দামের কারণে দুষ্প্রাপ্য। মানুষ খেতে না পারলেও কিন্তু মাংস রপ্তানির আয়োজন চলছে। মানুষ জুতা কিনে পায়ে দিতে পারে না অথচ কাঁচা চামড়া নদীতে ফেলে দেওয়া বা মাটিতে পুঁতে ফেলা হচ্ছে, চেষ্টা চলছে ভারতে পাচার বা রপ্তানি করার। এসব কোন ধরনের উন্নয়নের প্রকাশ? দেশের কৃষক সরকার নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে পারে না, মধ্যবিত্ত ঈদের পর চামড়া বিক্রি করতে পারে না, একদল ব্যবসায়ীর মিলিত চক্রের কাছে সবাই ক্রমাগত অসহায় হয়ে পড়ছে। দেশে উৎপাদিত কাঁচামাল পাট এবং চামড়া কি দেশের স্থায়ী শিল্প ভিত্তি হতে পারবে না? বিশ্ববাজারে পাটের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও পাট আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেল। ক্ষীণ সম্ভাবনা নিয়ে চামড়া ছিল, ভবিষ্যতে সেটা থাকবে তো?