প্রশ্নবিদ্ধ আর্থিক প্রতিবেদনের কারণে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় থাকা বিডি পেইন্টস লিমিটেডের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) আবেদন বাতিল করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। গত মঙ্গলবার বিডি পেইন্টস এবং তাদের ইস্যু ম্যানেজার ইবিএল ইনভেস্টমেন্ট, সিএপিএম অ্যাডভাইজরি ও মাইডাস ইনভেস্টমেন্টকে আইপিও বাতিলের চিঠি দিয়েছে এসইসি।
এ বিষয়ে এসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিডি পেইন্টস মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিক্রি বাড়িয়ে দেখিয়েছে। এ জন্য বাকিতে বিক্রি বেশি দেখিয়েছে। এতে করে বাকির অর্থ ফেরতের সময়ও বেড়ে গেছে। কোম্পানিটির প্রকৃত সম্পদ অতিমূল্যায়িত করে দেখানো হয়েছে। আবার অবচয় কম দেখিয়ে মুনাফা বেশি দেখিয়েছে। এ ছাড়া হঠাৎ করেই পরিশোধিত মূলধন অনেক বেড়ে গেছে। রিটার্ন অন ইকুইটি ও রিটার্ন অন অ্যাসেট অনেক কম। এমন কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেওয়া হলে তারা শেয়ারহোল্ডারদের ঠিকমতো লভ্যাংশ দিতে পারবে না। আবার করোনার কারণে বিক্রি কমে যাওয়াটাও স্বাভাবিক। ফলে আইপিওতে আসার পর কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) অস্বাভাবিক হারে কমে যেতে পারে। যার প্রভাবে শেয়ার দর অভিহিত মূল্যের নিচে নেমে আসতে পারে। এসব বিবেচনায় কমিশন বিডি পেইন্টসের আইপিও বাতিল করেছে।
আইপিওর আবেদন জানানো বিডি পেইন্টস লিমিটেডের বরিশালের বিসিক শিল্প এলাকায় রং উৎপাদন, পণ্যের গোডাউন ও অফিস কার্যক্রম রয়েছে। স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে পণ্য উৎপাদন করায় বছরের অধিকাংশ সময়ই কারখানা বন্ধ রাখতে হয় কোম্পানিটিকে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আওতাধীন ছোট এই কোম্পানিকে কাগজে-কলমে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পদে পদে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে গত ১০ মার্চ দেশ রূপান্তরে ‘বানোয়াট নথিতে বিডি পেইন্টসের আইপিও’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়।
আইপিও প্রসপেক্টাসে বিডি পেইন্টস পণ্য বিক্রি নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে পণ্য বিক্রি থেকে আয় দেখানো হয় ৩৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। অথচ কোম্পানির বরিশাল কারখানায় সর্বোচ্চ উৎপাদনের যে তথ্য পাওয়া যায়, সে হিসাবে বিডি পেইন্টসের বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা হতে পারে। আবার কোম্পানির পণ্য বিক্রির পুরোটাই নগদ টাকায় লেনদেন হয়। এমনকি কোম্পানির পণ্য সরবরাহকারীদেরও নগদে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জ পণ্য বিক্রিসংক্রান্ত ডাটা চাইলেও মাসিক সারসংক্ষেপ ছাড়া বিডি পেইন্টস কোনো বিল, ইনভয়েস কিংবা ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখাতে পারেনি। নিট মুনাফা বাড়িয়ে দেখাতে কৃত্রিম বিক্রি দেখানোর অভিযোগ ওঠে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে। এ ছাড়া বাকিতে পণ্য বিক্রির অর্থ ফেরত আসতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৮০ দিন সময় লাগে।
প্রসপেক্টাসে কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১৮০ জন উল্লেখ করা হলেও কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন এ সংখ্যা ৪২। এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও অনেক কম দেখানো হয়েছে। বিডি পেইন্টসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও কোম্পানি সচিবের গ্রস বেতন হচ্ছে মাত্র ২৭ হাজার ৪০০ টাকা।
বিডি পেইন্টসের পরিশোধিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২৮ কোটি টাকা বাড়ানো হয় ২০১৮ সালের ২৪ মে। পরিশোধিত মূলধনের বড় অংশই আসে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি থেকে। কোম্পানিটি পুঁজিবাজার থেকে আরও ২০ কোটি টাকা সংগ্রহের প্রস্তাব দিয়েছিল। ২০১৮-১৯ সালের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বিডি পেইন্টসের ইপিএস ছিল ১ টাকা ৩ পয়সা।
পাঁচ বছর ধরে কোম্পানিটি মুনাফা দেখালেও ২০১৫, ১৬ ও ১৭ সালের হিসাব থেকে মুনাফায় শ্রমিকের প্রাপ্য লভ্যাংশ বাবদ কোনো অর্থ রাখেনি। এমনকি সর্বশেষ দুই বছরের মুনাফা থেকে শ্রমিকের প্রাপ্য লভ্যাংশ দেখালেও তা এখনো বিতরণ করেনি। এ ক্ষেত্রে শ্রম আইন লঙ্ঘন হয়েছে। এ ছাড়া কোম্পানিটি বিলম্বিত কর গণনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন করেছে।
প্রসপেক্টাস পর্যালোচনা শেষে বিভিন্ন অসংগতি তুলে ধরে গত ৩০ জুলাই বিডি পেইন্টেসের আইপিও আবেদন অনুমোদন যোগ্য নয় বলে যৌথভাবে এসইসিতে মতামত জানায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ।