কক্সবাজারের টেকনাফ থানার সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। উপজেলাটির অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা এই পুলিশ কর্মকর্তা যেন নিজেই গড়ে তুলেছিলেন অপরাধ জগতের এক বিশাল সাম্রাজ্য। চাহিদামতো টাকা না পেয়ে নিরপরাধ মানুষকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা এবং মাদকের মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসানোসহ বিস্তর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। আর এসব করতে গিয়ে পুরো কক্সবাজার জেলায় নিজের আলাদা বলয় গড়ে তুলেছিলেন বিতর্কিত এই পুলিশ কর্মকর্তা। জনপ্রতিনিধি, পুলিশ সদস্য, মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী ও স্থানীয় কিছু সাংবাদিক ছিল তার এই বলয়ের অন্তর্ভুক্ত। কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া ও সেন্টমার্টিনে ওসি প্রদীপের এমন অন্তত অর্ধশত সহযোগী রয়েছে। যারা অল্পদিনেই কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। প্রদীপের সহযোগী হয়ে তারা নানা কায়দায় টাকা কামিয়েছেন। আবার টাকা পেয়ে প্রদীপসহ তার সহযোগীদের অপকর্মের সংবাদ প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতেন স্থানীয় অনেক সাংবাদিক। এ ছাড়া টেকনাফ থানায় প্রদীপের রয়েছে একটি ‘কিলিং স্কোয়াড’। যে দলের সদস্যরা মূলত ‘ক্রসফায়ারের’ সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করত। ওসি প্রদীপের নির্দেশে তারা নিরপরাধ মানুষকে ধরে এনে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিত বলে টেকনাফ-উখিয়ার একাধিক ভুক্তভোগী পরিবার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে। ওসি প্রদীপকে থানা থেকে সরিয়ে নেওয়া হলেও তার ওই ‘কিলিং স্কোয়াড’ সদস্যরা এখনো বহাল থাকায় ক্ষুব্ধ এসব ভুক্তভোগী পরিবার।
এদিকে প্রদীপ কুমার দাশকে প্রত্যাহার করার পর পুরো টেকনাফ উপজেলায় যেন স্বস্তির সুবাতাস বইছে। নতুন করে বিপদে পড়ার শঙ্কায় ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যরা এত দিন চুপ থাকলেও এখন তারা প্রকাশ্যে কথা বলছেন প্রদীপের অপকর্মের বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে প্রতিদিনই তার অপকর্মের নতুন নতুন তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক কারবারিদের তৎপরতা আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের নির্দেশে পুলিশ-র্যাবসহ সবক’টি গোয়েন্দা সংস্থা মাদক কারবারি ও তাদের গডফাদারদের তালিকা তৈরি করছে। তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশায় যুক্ত ‘হাইপ্রোফাইল’ লোকদের নামও আসছে। আবার পুলিশের অনুসন্ধানেও বেরিয়ে এসেছে মাদক কারবারিদের সব ধরনের সহযোগিতা করছে পুলিশেরই কতিপয় সদস্য। ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফে ১০২ মাদক কারবারির আত্মসমর্পণের পর কিছুদিন মাদক কারবার অনেকটা বন্ধ ছিল। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানও শিথিল করা হয়। আর এই সুযোগে কক্সবাজার ও টেকনাফের মতো সারা দেশেই তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিরা এলাকায় ফিরে এসেছে; বিশেষ করে কক্সবাজার ও টেকনাফে মাদক কারবারিরা প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে। এর পাশাপাশি ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনাও বেড়ে গেছে অনেক। আর এসবের প্রভাবক হিসেবে টেকনাফ থানার সদ্য সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও তার সহযোগীরা কাজ করেছেন। বিতর্কিত এই পুলিশ কর্মকর্তা টেকনাফ থানায় ২২ মাস ওসির দায়িত্ব পালনকালে ১৪৪টি ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা ঘটেছে। তাতে মারা গেছেন ২০৪ জন। কিন্তু এসব ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বড় কোনো মাদক কারবারির ‘ক্রসফায়ার’ হয়নি। কিছু চুনোপুঁটি কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন। তাছাড়া অভিযোগ আছে, ‘ক্রসফায়ারের’ আগে প্রদীপের সহযোগীরা মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিত। এমনকি ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অনেকের বাড়িঘর-জমিজমা পর্যন্ত লিখে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
টেকনাফ-উখিয়ার একাধিক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে জানান, টেকনাফ থানায় একটি ‘কিলিং স্কোয়াড’ আছে। ওই স্কোয়াড ওসি প্রদীপ নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতেন। কনস্টেবল থেকে শুরু করে এসআই পর্যন্ত আছেন এই স্কোয়াডে। মূলত তাদের মাধ্যমে ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা ঘটে। প্রদীপ থানা থেকে চলে গেলেও তার এই স্কোয়াডের সদস্যরা বহাল আছেন। তাদের মধ্যে এএসআই ফকরুল জামান, এসআই জামসেদ, এসআই সুজিত, কনস্টেবল নাজমুল (ওসির বডিগার্ড), এসআই মশিউর রহমান, এএসআই আমির হোসেন, এএসআই মিসকাত উদ্দিন, কনস্টেবল রুবেল দাশ (‘ক্রসফায়ারে’ সবচেয়ে বেশি গুলি ছুড়েছেন), কনস্টেবল মো. মহিউদ্দিন খান, কনস্টেবল আবদুল আজিজ, এসআই দীপক বিশ্বাস, এএসআই সঞ্জিব দত্ত, কনস্টেবল বাহার উদ্দিন, এএসআই মিঠুন চক্রবর্তী (ওসি প্রদীপের ভাগ্নে), কনস্টেবল সাগর দেব, এএসআই কাজী সাইফ মাহমুদ এবং টেকনাফ পৌর কমিউনিটি পুলিশিংয়ের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল হোসাইন অন্যতম। তারা ক্রসফায়ারের নামে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। প্রদীপ না থাকলেও তার সহযোগীরা থানায় বহাল থাকায় এলাকার লোকজন এখনো আতঙ্কে আছেন।
টেকনাফের ডেইলপাড়ার বাসিন্দা রজমান আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রদীপের মতো তাদেরও টেকনাফ থানা থেকে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। তারা এলাকার লোকজনের ওপর বেশি অত্যাচার করেছে। নিরপরাধ লোকদের মাদক কারবারি বানিয়েছে। তারা অভিযানে গেলে সঙ্গে থাকত একটি করে নোয়া গাড়ি। এসব গাড়ি নিয়ে তারা টেকনাফের আনাচকানাচ চষে বেড়াত এবং লোকজনকে আটক করে রাতে থানায় নিয়ে যেত। কেউ দাবি করা টাকা না দিলে তার ভাগ্যে জুটত বুলেট। তাদের নেওয়া হতো সোজা মেরিন ড্রাইভে।’
রমজান আরও বলেন, ‘মাদক ও অস্ত্র মামলা থেকে রেহাই পেতে অনেকেই মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছে। এমনও ঘটনা আছে থানায় মামলা হয়েছে, কিন্তু আসামি কিছুই জানে না।’
টেকনাফ সদরের বাসিন্দা ব্যবসায়ী জুলহাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ কীভাবে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তা আমি নিজের চোখে দেখেছি।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত এক বছরে প্রদীপ ও তার সহযোগীরা অনেকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা জালালের কাছ থেকে ৬ লাখ ৪০ হাজার, টেকনাফ সদরের নতুনপাল্লান পাড়ার আবদুস শুক্কুরের কাছ থেকে ৪ লাখ, উত্তর লম্বরীর মুফতি জাফরের কাছ থেকে ৫ লাখ, মিঠাপানি এলাকার দুবাইপ্রবাসী মীর আহামদ খলিফার ছেলে মীর সরওয়ারের কাছ থেকে ৯ লাখ, ওমর হাকিম মেম্বারের কাছ থেকে ১০ লাখ, ছোট হাবিরপাড়ার আবু তাহেরের ছেলে দুবাইপ্রবাসী মহিউদ্দীনের কাছ থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার, মীর কাসেম মেম্বারের ভাগিনা ছাত্রলীগ নেতা জুয়েলের কাছ থেকে ৩ লাখ, টেকনাফের ইসলামাবাদের আবদুস সবুর সওদাগরের ছেলে নেজামের কাছ থেকে দুই দফায় ৯ লাখ, অলিয়াবাদের ওবাইদুল্লাহর কাছ থেকে ৪ লাখ, মিঠাপানি এলাকার মো. তৈয়বের কাছ থেকে ৭ লাখ, রাজারছড়ার মৌলভী আবদুল হামিদের কাছ থেকে দুই দফায় ১৬ লাখ, টেকনাফ সদরের এক অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসীর কাছ থেকে ৫ লাখ, মাঠপাড়ার মোহাম্মদ হোসেনের কাছ থেকে ৪০ লাখ, উত্তর লম্বরীর জজ মিয়ার কাছ থেকে ৪ লাখ, উত্তর লম্বরীর শামসুর ছেলে জামালের কাছ থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার, উত্তর লম্বরীর সৈয়দ মিয়ার কাছ থেকে ৫ লাখ, দক্ষিণ লেগুবিলের এনামের কাছ থেকে ৫ লাখ, টেকনাফ সদরের চেয়ারম্যান শাহজাহানের কাছ থেকে ১৯ লাখ এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ হাসিমের কাছ থেকে ৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কমিউনিটি পুলিশিং নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ : ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে প্রদীপের সহযোগী কমিউনিটি পুলিশিংয়ের দুই নেতা ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা হলেন টেকনাফ উপজেলা কমিউনিটি পুলিশিংয়ের নেতা নুরুল হোসাইন ও আবদুল কাইয়ুম। এই দুজনকে অভিযুক্ত করে গত বুধবার প্রতিকার চেয়ে উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী মো. ইউনুছ। সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পূর্বপাড়ার বাসিন্দা তিনি। লিখিত অভিযোগে তিনি বলেন, গত ২৭ জুলাই সকালে সেন্ট মার্টিন পূর্বপাড়ার জামাল উদ্দিন ওরফে মইস জামালের ছেলে জুবাইরকে সেন্ট মার্টিন পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই মো. কাশেম ডেকে নিয়ে যান। একই এলাকার আবদুল হাকিমের ছেলে মো. আজিমকেও ডেকে আনা হয়। পরে দুজনকে স্পিডবোটে চড়িয়ে টেকনাফ থানায় নেওয়া হয়। আটক জুবাইরকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য জুবাইরের ভাই মো. ইউনুছের কাছ থেকে পুলিশের নাম ভাঙিয়ে কমিউনিটি পুলিশিং নেতা নুরুল হোসাইন ও আবদুল কাইয়ুম ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। ২৮ জুলাই ভুক্তভোগী পরিবার বাড়ির জমি বিক্রি ও বন্ধক রেখে ৪ লাখ টাকা নুরুল হোসাইনকে দেয়। বাকি টাকা পরদিন না দিলে জুবাইরকে ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়া হবে বলে হুমকি দেন তিনি। জুবাইরকে রক্ষা করতে ২৯ জুলাই সন্ধ্যায় আরও ৬ লাখ টাকা দেয় তার পরিবার। তখন ওসি প্রদীপকে টাকা দিয়ে জুবাইরকে ছাড়িয়ে আনার আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনো মুক্তি পাননি এই যুবক।
মো. ইউনুছ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ভাই একজন মাছ ব্যবসায়ী। সে কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নেই। তাকে অহেতুক আটক করে পুলিশ।’
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রদীপের সিন্ডিকেট অনেক লম্বা। তার সঙ্গে সবার ভালো পরিচয় ছিল। গণমাধ্যমের কতিপয় সাংবাদিক টেকনাফ থানা পুলিশের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নিতেন বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তার মধ্যে কয়েকজন বড় পত্রিকার সাংবাদিক আছেন। টেকনাফ থানায় প্রদীপের যেসব সিন্ডিকেট সদস্য আছে, তাদের প্রত্যাহার করা হবে। যারা নানা অপকর্মে করেছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।’
সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশে সিন্ডিকেট বলতে কিছু নেই। যারা অপরাধ করবে তাদের শাস্তি পেতেই হবে। টেকনাফ বা কক্সবাজারে কোনো সিন্ডিকেট থাকলে ভেঙে দেওয়া হবে। কক্সবাজারে দায়িত্ব নেওয়ার পর সবাইকে একটা কথা বলেছি, জনগণের সেবা করতে হবে। জনগণের পুলিশ হতে হবে। কোনো নিরপরাধ লোকজনকে হয়রানি করা যাবে না। আমি চেষ্টা করেছি সততার মধ্যে থেকে কাজ করতে।’
জেলার পুলিশপ্রধান আরও বলেন, ‘ক্রসফায়ারের নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে কিছু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। টেকনাফের সাবেক ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ আছে। এগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’