বিসিক-ট্যানারি মালিক দ্বন্দ্বে চামড়া শিল্পে ধস!

চামড়া রপ্তানিতে বাংলাদেশে ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে টানা তিন বছর সাফল্য অর্জন করেছিল। সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে পোশাক ও তথ্যপ্রযুক্তির পরেই চামড়াকে গণ্য করা হতো। এছাড়া গত অর্থবছর পর্যন্ত চামড়া খাত রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। গত জুলাই পাটপণ্য ওই স্থান দখলে নিয়েছে। বর্তমানে এ খাত ঘিরে চলছে চরম অস্থিরতা। একটি ছাগলের চামড়া ২ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

চামড়া শিল্পের বিপর্যয় শুরু ২০১৭-১৮ অর্থবছরে। তখন রপ্তানি ১২ শতাংশ কমে যায়। এরপর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ রপ্তানি খাত। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয়েছে মাত্র ৭৯৭ মিলিয়ন ডলার। অথচ বিগত বছরগুলোতে বিশ্ববাজারে চামড়া খাতের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ৪ শতাংশের ওপরে।

চামড়া শিল্প মালিকরা বলছেন, এ বিপর্যয় বিসিকের অদক্ষতার জন্য। তারা অপ্রস্তুত সাভারে ২০১৭ সালে চামড়া শিল্পকে স্থানান্তরিত করেছে। তখন অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। অনেক ক্রেতা চলে গেছে, যারা আর ফেরত আসেনি। তবে বিসিক বলছে, চামড়া শিল্প মালিকদেরও দোষ আছে। তারা কারখানার অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন না করায় নতুন বাজারে যেতে পারছে না।

মার্কেটওয়াচের গত ২২ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী চামড়াজাত পণ্যের বাজার প্রায় ৯৫ দশমিক ৫৩০ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ১২২ দশমিক ৭৯০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে। এ সময়ে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত পাঁচ অর্থবছরে চামড়া খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ, যা বছরপ্রতি গড়ে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ইপিবির প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়া খাত ১ দশমিক ১৩১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করে। পরের অর্থবছরে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ১ দশমিক ১৬১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আয় করে ১ হাজার ২৩৪ বিলিয়ন ডলার।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে নতুন চামড়া শিল্প নগরীতে চলে যাওয়ার পর ১২ শতাংশ কম প্রবৃদ্ধি করে রপ্তানি আয় হয় ১ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা কমে ১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার হয়, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৬ দশমিক ০৬ শতাংশ কম। আর সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২২ শতাংশ কমে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৭৯৭ বিলিয়ন ডলার।

করোনাভাইরাসের কারণেই নয়, গত অর্থবছরের শুরু থেকেই এ খাতের অবস্থা খারাপ ছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-মার্চে ৭৭২ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানির বিপরীতে গত অর্থবছরের একই সময়ে ১১ ভাগ কমে রপ্তানি হয়েছিল ৬৮৯ মিলিয়ন ডলার।

এত পরিকল্পনা ও বিশ্ববাজারে চামড়ার বাজার প্রসারিত হওয়ার পরও বাংলাদেশের এমন বিপর্যয়ের কারণ কী জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংকট শুরু হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরিত হওয়ার পর থেকে। এছাড়া আমাদের প্রধান ক্রেতা চীনে এ বছর অর্ধেক রপ্তানি হয়েছে। আর নতুন বাজারের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি। কিন্তু সেটি এখনো নির্মাণাধীন। সব মিলে একটি সংকট সৃষ্টি হয়েছে।’

ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বিটিএর সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহর দাবি, বিসিকের অদক্ষতা ও একগুঁয়েমি এই সংকটের জন্য দায়ী। অনেক ক্রেতা বাংলাদেশ ছেড়েছে। সিইটিপি না থাকায় তারা নতুন বাজারেও যেতে পারছেন না।

তবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসান উল্টো দুষছেন ট্যানারি মালিকদের। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইটিপি এখন প্রায় প্রস্তুত। কিন্তু ট্যানারি মালিকদের অদক্ষতার কারণে ক্রেতারা আসছে না। আর দায় দিচ্ছে বিসিকের ওপর।’

সংকটের শুরু যেভাবে : বুড়িগঙ্গার পরিবেশ দূষণ রোধে ২০০৩ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়া শিল্প নগরী স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিসিককে। কিন্তু বিসিক সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কয়েক দফা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর পর ২০১৫ সালে বিসিকের পক্ষ থেকে বলা হয়, সাভার প্রস্তুত। আর ট্যানারি মালিকরা দাবি করেন সাভারে যাওয়ার মতো অবস্থা এখনো হয়নি, তাই সাভারে যাওয়া যাবে না। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।

দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে বিসিকের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল আদালতের নির্দেশে হাজারীবাগে থাকা ট্যানারিগুলোর গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পরিবেশ অধিদপ্তর। বাধ্য হয়ে সাভারে চলে যান ট্যানারি মালিকরা। সংকটের শুরু এখান থেকেই।

ট্যানারি মালিকদের অভিযোগ, হাজারীবাগে যতগুলো ট্যানারি ছিল সাভারে এর মধ্যে অন্তত ১০০ ট্যানারি জমি বরাদ্দ পায়নি। যারা জমি পেয়েছে তাদের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানিসহ অবকাঠামো উন্নয়নে বছরব্যাপী সময় দিতে হয়েছে। এ সময়ে বেশিরভাগ কারখানার উৎপাদন বন্ধ ছিল। এ সময় অনেক ক্রেতা চলে গেছেন, যারা আর ফিরে আসেনি। বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার চামড়া অবিক্রীত রয়েছে। আর এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কাঁচা চামড়ার দাম কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আট বছরেও হয়নি সিইটিপি : চামড়া শিল্প নগরীর কর্মকাণ্ড শুরু করতে আবশ্যক বিষয় বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি। পরিবেশের বিষয়টি সামনে এলেই প্রাধান্য পায় ইটিপি ইস্যু। সাভারে কেন্দ্রীয়ভাবে ইটিপি নির্মাণ করা হচ্ছে, যা সিইটিপি নামে পরিচিতি। ২০১২ সালে ১১ মার্চ চীনা কোম্পানি জেএলইপিসিএল-ডিসিএল জেভিকে ৬ কোটি ৪৪ লাখ ডলারে এটি নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কথা ছিল ১৮ মাসের মধ্যে এটির নির্মাণ সম্পন্ন হবে। এরপর কেটে গেছে আট বছর। এর মধ্যে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে নয়বার। কিন্তু এখনো এটি পুরোপুরি প্রস্তুত করা সম্পন্ন হয়নি।

সাভারের সিইটিপির দৈনিক ২৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য শোধন করতে পারবে। কিন্তু ঈদের পরপর ট্যানারিগুলো দৈনিক প্রায় ৪০ হাজার ঘনমিটার পর্যন্ত বর্জ্য তৈরি করতে সক্ষম। এছাড়া বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনও এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। খোলা আকাশের নিচে বর্জ্য রাখতে হচ্ছে। আর যার ভার বহন করতে হবে ধলেশ্বরীকে ও তার গর্ভে বেঁচে থাকা প্রাণিকুলের।

বিসিক চেয়ারম্যানের মো. মোশতাক হাসানের কাছে সিইটিপি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে এটি পুরোপুরি নির্মাণে দেরি হচ্ছে। এ বছরের মধ্যেই সম্পন্ন হবে।’ পাল্টা প্রশ্ন করে তিনি বলেন, ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ বা এলডব্লিউজির সনদ পেতে মোট ১৩৫৫ নম্বর প্রয়োজন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সিইটিপিতে ২০০ নম্বর। বাকি ১১৫৫ নম্বর তারা অর্জন করতে পারছে না কেন?’

রপ্তানির প্রভাব কাঁচা চামড়ার বাজারে : গত তিন অর্থবছর ধরে চামড়া খাতের রপ্তানির যে ঋণাত্মক ধারা চলছে তার প্রভাব পড়ছে কাঁচা চামড়ার বাজারে। ২০১৬ ও ’১৭ সালে প্রতি বর্গফুট কাঁচা চামড়ার দাম ৫০-৫৫ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। পরের বছর ঋণাত্মক রপ্তানির কারণে দাম কমিয়ে ৪৫-৫০ টাকা হয়। ২০১৯ সালেও একই দাম থাকলেও কাঁচা চামড়ার বাজারে বিপর্যয় নামে। এ বছর কাঁচা চামড়ার দাম ২৯ শতাংশ কমিয়ে প্রতি বর্গফুট ৩৫-৪০ টাকা করা হলেও দাম পাননি বিক্রেতারা। অনেকেই এবার চামড়া বিক্রি না করে মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন। এতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে দেশের অর্থনীতির।

একে অন্যের ওপর দোষ চাপাচ্ছে : চামড়া খাতের বর্তমান অবস্থার জন্য কে দায়ী তা নিয়ে বিসিক, ট্যানারি মালিক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একে অন্যকে দায় দিচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুধু রপ্তানি সহযোগিতায় কাজ করলেও বিসিক ও ট্যানারি মালিকরা এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মো. সাখাওয়াত উল্যাহ বলেন, আজকের পরিস্থিতির জন্য সব দায় বিসিকের। তারা আদালতকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আমাদের হাজারীবাগ থেকে এখানে এনেছে। কিন্তু এখনো সবকিছু অপ্রস্তুত। তাই আমরা ক্রেতা পাচ্ছি না। আসলে এত বড় একটি শিল্প চালানোর মতো সক্ষমতাই বিসিকের নেই।

অন্যদিকে বিসিক চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসান বলেন, ‘ট্যানারি মালিকদের অদক্ষতার কারণেই আজকে শিল্পের এ অবস্থা।’

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলছেন, বিষয়টি যেহেতু শিল্প মন্ত্রণালয়ের তাই আমাদের রপ্তানি সহায়তা ছাড়া তেমন কিছু করার নেই। তবে সব কারখানা উৎপাদনে না যেতে পারা, মালিকদের আর্থিক সমস্যা ও সিইটিপি প্রস্তুত না হওয়া শিল্পের ধ্বংসের অন্যতম কারণ। সনদ পেতে হলে অন্য অনেক বিষয় থাকলেও ক্রেতা কিন্তু সবার আগে ইটিপি দেখবেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যারা নিজস্ব অর্থায়নে ইটিপি করতে চায় করতে পারে। ট্যানারি মালিকরা যদি হাজারীবাগের জমি বিক্রি করতে পারতেন তাহলে হয়তো তাদের কিছু টাকাপয়সা আসত।