করোনা মহামারীতে সম্মুখসারির যোদ্ধা দেশের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী। এই দুর্যোগকালে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন তারা। আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানেও তারা শীর্ষে অবস্থান করছেন। এই সংকটকালে সরকারের কোনো পদক্ষেপে মনোবল বৃদ্ধির পরিবর্তে যদি তাদের মধ্যে কোনো ধরনের অসন্তোষ বা ক্ষোভ সঞ্চারিত হয়, তাহলে তা করোনা চিকিৎসায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক পরিপত্রকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষের খবর মিলেছে।
গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘আবাসন বদলের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঈদের ছুটির আগে ২৯ জুলাই এক পরিপত্র জারি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। পরে ২ আগস্ট থেকে পরিপত্র বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিপত্রে করোনা চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকা, খাওয়া ও যাতায়াত ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, তারা একটানা ১৫ দিন দায়িত্ব পালন শেষে পরবর্তী ১৫ দিন ছুটিতে কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন। তবে এ সময় তারা আবাসন সুবিধা পাবেন না। তাদের নিজস্ব বাসাবাড়িতে অবস্থান করতে হবে। দায়িত্ব পালনকালে তাদের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্ধারিত সরকারি ভবনে থাকতে হবে। আবাসিক সুবিধা না নিলে সরকার নির্ধারিত হারে ভাতা পাবেন। হাসপাতাল থেকে সরকার নির্ধারিত আবাসস্থলে যাতায়াতের জন্যও সরকার নির্ধারিত যানবাহন ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছে যে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চালাতে হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে চালাতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার সংক্রমণ এখনো কমেনি। ফলে সম্মুখ যোদ্ধাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে করোনা মোকাবিলা কঠিন হবে। এমনকি এতে চিকিৎসক, নার্সসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হবে। তারা কাজ করতে চাইবেন না। এ সিদ্ধান্তকে তারা বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা কর্র্তৃক স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকলের বরখেলাপ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারণ করেছে, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সাত দিন কাজ করবেন এবং ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন, তারপর তারা পরিবারের কাছে যাবেন। তাই নতুন সিদ্ধান্ত সংস্থাটির নির্দেশনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিবেচনা করতে হবে যে আমাদের দেশের হাসপাতালগুলো পুরোপুরি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত নয়। একটানা ১২-১৪ ঘণ্টা পিপিই পরে থাকা এখানে খুবই কষ্টসাধ্য বিষয়। পানিশূন্যতার ফলে নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর একটানা ১৫ দিন দায়িত্ব পালন করে পরবর্তী ১৫ দিন সরাসরি বাসায় কোয়ারেন্টাইনে থাকলে তাদের পরিবারের অন্যদেরও সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাবে। তা ছাড়া অনেক স্বাস্থ্যকর্মীর বাসায় আলাদাভাবে থাকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকাই স্বাভাবিক।
গত ১৫ এপ্রিল থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত ৭১ জন চিকিৎসক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বা করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার পর্যন্ত ২ হাজার ৫২৬ জন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া ১ হাজার ৮৫৪ নার্স ও ৩ হাজার ১০ জন স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে চিকিৎসকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু ও আক্রান্তের হার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। টিআইবির গবেষণা অনুযায়ী, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন মূলত মানহীন সুরক্ষা সামগ্রীর জন্য। এমতাবস্থায়, সুরক্ষাসামগ্রীর মান সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত না করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর স্বার্থ পরিপন্থী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সমীচীন হবে না।
এমনিতেই কভিড-১৯ মহামারী আসার পর তা মোকাবিলার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম-দুর্নীতির বিভিন্ন চিত্র আমাদের সামনে প্রতিভাত হয়েছে। করোনা রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, বিশেষ করে এন-৯৫ মাস্ক ও পিপিই কেনা ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ঠিক এ রকম পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতকে যখন পুনর্গঠন করা প্রয়োজন, তখন বিতর্কিত কোনো সিদ্ধান্তের পথ পরিহার করাই হবে শ্রেয়। এ কথা সত্যি যে স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনাকালে আবাসন নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু সে জন্য পুরো আবাসনব্যবস্থা বাতিল না করে অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করা দরকার। আর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চালানোর জন্য যে টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে, তা শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। সর্বোপরি, স্বাস্থ্য খাতের যাবতীয় বিশৃঙ্খলা দূর করে মানসম্মত ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে।