সিনহা হত্যা মামলা

আসামিদের বুঝে পায়নি র‌্যাব, সাত পুলিশকে সাসপেন্ড

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার আসামি টেকনাফ থানার সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ সাত পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার পুলিশ সদর দপ্তর ও কক্সবাজার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের আলাদা আলাদা আদেশে বরখাস্তের এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। অন্যদিকে কারাগার থেকে আসামিদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া শুরু করেছে তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রক্রিয়া শুরু করলেও গতকাল রাত পর্যন্ত আসামিদের বুঝে পায়নি র‌্যাব।

জানা যায়, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে বরখাস্তের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। অন্যদিকে কক্সবাজার পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে মামলার বাকি আসামিদের সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আসামিদের বুঝে পায়নি র‌্যাব : কারাগার থেকে আসামিদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া শুরু করেছে তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব। ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ তিন আসামিকে সাত দিন এবং চার আসামিকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রক্রিয়া শুরু করলেও এখনো আসামিদের বুঝে পায়নি বাহিনীটি। র‌্যাব-১৫-এর উপ-অধিনায়ক মেজর মেহেদী হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালতের আদেশে আসামিদের হেফাজতে নিতে প্রক্রিয়া অনুযায়ী আমরা কাজ শুরু করেছি।’

তবে সিনহা হত্যা মামলার আসামিদের রিমান্ডের বিষয়ে আদালত থেকে কোনো ধরনের কাগজপত্র এখনো কারা কর্র্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছেনি বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা কারাগারের সুপার মো. মোকাম্মেল হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উক্ত মামলার রিমান্ডের আসামি বের করার কোনো ধরনের অনুমতি এখনো হাতে পৌঁছেনি। আদালত থেকে আদেশের কপি হাতে এলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ওসি প্রদীপসহ অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যা মামলার সাত আসামি কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করলে কক্সবাজার র‌্যাবের পক্ষ থেকে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে ওসি প্রদীপসহ তিনজনকে সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। এছাড়া বাকি চার আসামিকে দুদিন করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেওয়া হয়।

সিনহা নিহতের সময় এসপি, ওসি ও ইন্সপেক্টরের ফোনালাপ ফাঁস : ‘তোমাকে গুলি করেছে, তোমার গায়ে লাগে নাই। তুমি যেইটা করছো, সেইটা তার লাগছে।’ সাবেক সেনা কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত) মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে গুলি করার পর গুলিবর্ষণকারী পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে এভাবেই আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন। গতকাল শুক্রবার এসপি, ওসি ও পরিদর্শক লিয়াকতের ফাঁস হওয়া একাধিক ফোনালাপে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

দেশ রূপান্তরের হাতে আসা ওই ফোনালাপের অডিও রেকর্ড অনুযায়ী বাহারছড়া শামলাপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলী কক্সবাজার পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনকে ফোন করে বলেন, ‘এখানে একটা প্রাইভেট কার আছে স্যার। ঢাকা মেট্রো লেখা। আর্মির পোশাকটোশাক পরা। সে ওই বোরকা খুলে ফেলছে। পরে যখন তাকে চার্জ করছি, সে মেজর পরিচয় দিয়ে গাড়িতে চলে যেতে চাইছিল। পরে অস্ত্র তাক করছিল, আমি গুলি করছি স্যার। একজন ডাউন করছি, আরেকজন ধরে ফেলছি স্যার। স্যার, আমি কী করব স্যার? আমাকে পিস্তল তাক করছে, পিস্তল পাইছি তো স্যার।’ লিয়াকতের এমন কথা শুনে তখন এবিএম মাসুদ তাকে ফোনে বলেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে, তোমাকে গুলি করছে, তোমার গায়ে লাগে নাই। তুমি যেইটা করছো, সেটা তার গায়ে লাগে, লাগছে।’ লিয়াকত এর প্রতিউত্তরে বলেন, ‘লাগছে স্যার, লাগছে স্যার।’ তখন মাসুদ বলেন, ‘হ্যাঁ।’

ওসি ও এসপির আরেক ফোনালাপের অডিও অনুযায়ী, প্রদীপ কুমার এসপি মাসুদ হোসেনকে বলছেন, ‘একটা গাড়িকে সিগন্যাল দিছে, সিগন্যাল দেওয়ার পর গাড়ি থেকে পিস্তল দিয়ে গুলি করছে, ওই সময় আমি তাকে বল্লাম, ঠিক আছে তুমিও তাড়াতাড়ি গুলি করো। সেও নাকি তাকে গুলি করছে স্যার। আমি যাচ্ছি স্যার ওখানে। তখন মাসুদ বলেন, ‘যান, যান।’

ফোনালাপের বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার পর ওসি প্রদীপ কুমার বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তাকে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিস্তারিত জানানোর কথা বলেছিলাম। এরই মধ্যে পরিদর্শক লিয়াকত আলী ফোনে করে জানান, তাকে গুলি করেছে, সেও গুলি করেছে। কিন্তু তারটা (মেজর) লাগেনি, লিয়াকতেরটা লেগেছে। এই কথা রিপিট করে জানতে চেয়েছি, বিষয়টি এমনই কি না। এতে তো আমার কোনো দোষ নেই। পুলিশ সুপার হিসেবে তারা আমাকে যা জানিয়েছে সেই মোতাবেক নির্দেশনা দিয়েছি। আমিও তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে জানিয়েছিলাম।’

এদিকে সিনহা নিহতের পর পুলিশের করা মামলার এজাহারে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল বলে যেসব সাক্ষীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে তারা কেউই সেদিন সেখানে ছিলেন না বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন মারিশবুনিয়ার বাসিন্দা নূরুল আমিন ও হামিদ হোসেন। তারা সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, তারা কেউ ঘটনাস্থলে ছিলেন না। পুলিশ তাদের বাড়ি থেকে টেকনাফ থানায় ডেকে নিয়ে একাধিক সাদা কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে রাখে। পরে জানতে পারেন সিনহা রাশেদ হত্যাকাণ্ডের সময় তাদের ঘটনাস্থলে উপস্থিত দেখানো হয়েছে।

গত ৩১ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান।