মাধ্যমিকের সহকারী শিক্ষক

মর্যাদা বেড়েছে কমেছে বেতন!

সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের ২০১২ সালে সরকার দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড মর্যাদা দেয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের পদমর্যাদা অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা কার্যকর করা হয়নি। উল্টো এজন্য ২০০৯ সালের নিয়োগবিধি অনুযায়ী, প্রাপ্য টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড এবং টিফিন ভাতা ও যৌথ বীমা বাবদ প্রতি মাসের প্রাপ্য ১৯০ টাকা আটকে দেওয়া হয়েছে। এতে সারা দেশে ৫ হাজারের বেশি শিক্ষক ১৫ বছর যাবৎ ন্যায্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন, আর্থিক হিসাবে যা প্রতি মাসে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে উচ্চ আদালত শিক্ষকদের পক্ষে রায় দেয়। তবে রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করায় আটকে আছে। আপিল বিভাগের রায় পেলে এ জটিলতা নিরসন হবে।’

ভুক্তভোগী শিক্ষকরা জানান, তারা ১০ম গ্রেডে নিয়োগ পেয়েছেন। ২০১২ সালে সরকার দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড মর্যাদা দিলেও বাস্তবায়ন না করায় দীর্ঘ ১৫ বছর একই গ্রেডে আছেন। অথচ নতুন বেতনস্কেলের আগে সরকারি মাধ্যমিকের নন-গেজেটেড শিক্ষকরা চাকরির বয়স আট বছর পূর্ণ হলে প্রথম, ১২ বছরে দ্বিতীয় ও ১৫ বছরে তৃতীয় টাইমস্কেল পেতেন। এতে তারা ধাপে ধাপে নবম, অষ্টম ও সপ্তম গ্রেডে উন্নীত হয়ে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পেতেন। ২০০৯ সালের নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী, সহকারী শিক্ষকদের চাকরিকাল চার বছর পূর্ণ হলে নবম গ্রেড, আট বছরে ‘প্রথম টাইমস্কেল’ হিসেবে অষ্টম এবং ১২ বছর পূর্তিতে ‘দ্বিতীয় টাইমস্কেল’ হিসেবে সপ্তম গ্রেডের বিধান থাকলেও তা দেওয়া হয়নি।

জাতীয় বেতনস্কেল ২০০৯ অনুযায়ী, দশম গ্রেডে নিয়োগ পেয়ে চাকরিকাল চার বছর ও আট বছর পূর্ণ হয়েছে এমন ২০০৫, ২০০৬, ২০০৯, ২০১০ এবং ২০১১ ব্যাচের প্রায় সাড়ে তিন হাজার সহকারী শিক্ষক দুটি টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পাননি। চাকরিকাল ১২ বছর পূর্ণ হয়েছে এমন ১৯৯৯ ব্যাচের ১৮০ শিক্ষক এবং ২০০১ ও ২০০২ ব্যাচের দেড় হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষক একটি টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যশোরের একটি সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড মর্যাদা দেওয়া হলেও সুযোগ-সুবিধা এবং বেতন বাড়েনি। উল্টো ন্যায্য পাওনা সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল এবং টিফিন ভাতা ও যৌথ বীমার টাকা বন্ধ থাকায় আমরা প্রতিমাসে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা কম পাচ্ছি। এটি অন্যায়।’

বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহাব উদ্দীন মাহমুদ সালমী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গেজেটেড মর্যাদা দেওয়ায় আমরা খুশি হয়েছি, সম্মানবোধ করি। কিন্তু বেতন না বাড়লে, সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল না পেলে পরিবার নিয়ে চলব কীভাবে? শুধু সম্মানে কী পেট ভরে? মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থার হাল আমরাই ধরে রেখেছি। মেধাবীরা এই স্তরে শিক্ষকতা করছে। কিন্তু এমন অবহেলা মেনে নেওয়া যায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ন্যায্য পাওনার জন্য ২০১৮ সালে উচ্চ আদালতে রিট করি। রায়ও আমাদের পক্ষে হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের কারণে সব আটকে গেছে। এই সমস্যা সমাধানে আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ২৯ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ থেকে এক আদেশে বলা হয়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক/শিক্ষিকা পদে দ্বিতীয় শ্রেণির পদের নির্ধারিত বেতনস্কেল ১০নং গ্রেডে পূর্ব থেকে নির্ধারিত থাকায় ওই পদটি দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড পদমর্যাদা উন্নীতকরণের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে পুনরায় বেতনস্কেল নির্ধারণ/যাচাইয়ের অবকাশ নেই।

এই আদেশের আলোকে অর্থ মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের ১৯ জুন এক অফিস আদেশে ‘জাতীয় বেতনস্কেল, ২০০৯’-এর ৭(২) ও ৭(৯) ধারা অনুযায়ী সহকারী শিক্ষক/শিক্ষিকাদের টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেড প্রদানের পক্ষে মতামত দেয়। এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন শাখা পৃথক অন্য এক আদেশে ২০১৫ সালের বেতনস্কেল কার্যকর হওয়ার আগে টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বিষয়ে জাতীয় বেতনস্কেল ২০০৯ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবকে নির্দেশনা দেয়।