রেলপথে পণ্য পরিবহন চালুর জন্য বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত ট্রানজিট প্রটোকল সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর রেলস্টেশনকে পোর্ট অব কল ঘোষণায় সম্মতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ভারতের ওপর দিয়ে রেলপথে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের মোংলা বন্দর ব্যবহার করে নিজেদের আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন করবে নেপাল। ১৬ আগস্ট অনুষ্ঠেয় দুই দেশের বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠকের আগে প্রটোকল সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করল বাংলাদেশ।
গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার ভার্চুয়াল সভায় এ সংক্রন্ত প্রস্তাব অনুমোদন হয়। এটি অনুমোদন পাওয়ায় ভারতের দুটি রেলপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশ-নেপালের মধ্যে পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলো। এর মধ্যে স্বল্প দৈর্ঘ্যরে ২২৫ কিলোমিটার দূরত্বের পথটিই ব্যবহার হবে।
১৬ আগস্ট অনুষ্ঠেয় দুই দেশের বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠকে রেল কার্গো চালুর বিষয়ে নেপালের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। বাংলাদেশের সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার এবং ঢাকা-কাঠমান্ডু বাস চলাচলসহ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যবিষয়ক বিভিন্ন বিষয় আলোচ্যসূচিতে স্থান পাবে ওই সভায়।
২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গেলে রহনপুর-সিঙ্গাবাদ ব্রডগেজ রেলওয়ে লিঙ্ক নেপালের একটি অতিরিক্ত ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে সম্মতি দেয় ভারত। পরের বছর সেপ্টেম্বরে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশ ও নেপালকে ট্রানজিট দেওয়ার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয় দেশটি। পরে ২০১৬ সালে ভারতের সিঙ্গাবাদ দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে রেল ট্রানজিট চালুর বিষয়ে নেপাল ও ভারতের মধ্যে লেটার অব এক্সচেঞ্জ স্বাক্ষর হয়। গত বছর এপ্রিলে রহনপুর-সিঙ্গাবাদ ব্যবহার করে রেল ট্রানজিট চালুর বিষয়ে বাংলাদেশকে লিখিত প্রস্তাব দেয় নেপাল। বর্তমানে ভারত ও নেপালের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপড়েন চলছে। এ অবস্থায় প্রস্তাবিত এসব রেল রুট কীভাবে কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রহনপুর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মালদহের সিঙ্গাবাদ-বিহারের জসবানী-নেপালের বিরাটগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথেই পণ্য পরিবহন করবে দুই দেশ। এর মধ্যে রহনপুর থেকে সিঙ্গাবাদ পর্যন্ত ৮ কিলোমিটারসহ বিরাটগঞ্জ পর্যন্ত মোট দূরত্ব ২২৫ কিলোমিটার। ভারত ও নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত ট্রানজিট চুক্তি অনুযায়ী, রহনপুর থেকে পশ্চিমবঙ্গের বিরল-রাধিকাপুর-বিহারের রক্সল হয়ে নেপালের বীরগঞ্জের মধ্যে ট্রেন চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ পথের দূরত্ব ৫১৪ কিলোমিটার হওয়ায় তা ব্যবহারের আগ্রহ নেই।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ সামান্য। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৮ মিলিয়ন ডলার। আমদানির পরিমাণ ছিল ১৪ মিলিয়ন ডলার। পাটজাত পণ্য, ব্যাটারি, তৈরি পোশাক, টয়লেট্রিজ পণ্য, ওষুধসহ বেশকিছু পণ্য নেপালে রপ্তানি করে বাংলাদেশ। দুই দেশের মধ্যে রেল কার্গো শুরু হলে বাণিজ্য বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মহিবুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করছি। এটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলে নেপালও লাভবান হবে। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। এছাড়া বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে।’
নেপালের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কানেকটিভিটি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিভিন্ন বিষয়ে কাজ চলছে। নেপাল বাংলাদেশের সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার করা ছাড়াও ঢাকা-কাঠমান্ডু বাস চালু করার প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিভিন্ন ইস্যুতে কাজ চলছে। ১৬ আগস্ট সচিব পর্যায়ের বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার সম্পর্কে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘নেপাল আমাদের সৈয়দপুর এয়ারপোর্ট ব্যবহার করতে চায়। এ নিয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে দুই দেশ একমত হলে সেটিও মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য আসবে।’
নেপাল গত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার করার বিষয়ে নোট ভারবাল পাঠিয়েছে। এটি ব্যবহার করে নিজেদের বিরাটনগর বা ভদ্রাপুরের মধ্যে বিমান যোগাযোগ স্থাপন করতে চায় দেশটি। এছাড়া পর্যটন সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করার বেশকিছু ইস্যু রয়েছে এতে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ১৯৭৬ সাল থেকে নেপালের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ট্রানজিট অ্যাগ্রিমেন্ট আছে। সেই ট্রানজিট অ্যাগ্রিমেন্টের মধ্যে নেপাল রিকোয়েস্ট করেছে আমাদের রহনপুর আর ভারতের সিঙ্গাবাদ হয়ে যে রেলপথ আছে সেখানে আরেকটি ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার জন্য। ১৯৭৬ সাল থেকেই এ প্রটোকলটা আছে। রহনপুর ও সিঙ্গাবাদ রেলপথের মাধ্যমে তারা মালামাল আনতে ও নিতে পারে। এ সংশোধনীর প্রস্তাব অনুমোদন পেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর থেকে ভারতের সিঙ্গাবাদ হয়ে নেপালের বীরগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথে পণ্য পরিবহন সুবিধা চালু হবে।’
কাস্টমস সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানে সৌদির সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে : বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে কাস্টমস সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করতে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট বিটুইন দ্য গভর্মেন্ট অব দ্য কিংডম অব সৌদি অ্যারাবিয়া অ্যান্ড দ্য গভর্মেন্ট অব পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ অন কো-অপারেশন অ্যান্ড মিউচুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ইন কাস্টমস ম্যাটার’ নামে একটি চুক্তির খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এছাড়া কর ফাঁকি রোধ ও দ্বৈত কর পরিহার বিষয়ে মালদ্বীপ ও চেক রিপাবলিকের সঙ্গে চুক্তির খসড়াও অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
চলচ্চিত্র শিল্পীদের সহায়তায় ট্রাস্ট : পেশাগত কাজ করতে অক্ষম ও অসচ্ছল চলচ্চিত্র শিল্পীদের সহায়তায় ট্রাস্ট গঠন করছে সরকার। এজন্য ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ২০২০’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের জানান, ২০১৭ সালের ২৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র শিল্পীদের কল্যাণে একটি ট্রাস্ট গঠনের জন্য নির্দেশনা দিয়েছিলেন। আইন করার উদ্দেশ্য পেশাগত কাজ করতে অক্ষম, অসমর্থ ও অসচ্ছল শিল্পীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া।