ডাকাত নয়, স্ত্রী-সন্তানের হাতে খুন হন মাহবুব

এক সময় দুবাইয়ে শ্রমিকের কাজ করা মাহবুব ভূইয়া (৫০) দেশে ফিরে সংসারের চাহিদা মেটাতে ঋণ করেন, আর সেই ঋণ থেকে মুক্ত হতে স্ত্রী-সন্তান খুন করেন তাকে। ঢাকার নবাবগঞ্জের সিংহরা গ্রামে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাত ২টার দিকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। তবে স্ত্রী নুরুন নাহার ওরফে লাখি (৩৬) তার মেয়ে ও মাকে সঙ্গে নিয়ে গভীর রাতে মাহবুবকে খুন করে ডাকাতির নাটক সাজান। নবাবগঞ্জ থানায় ডাকাতির মামলা করেন মাহবুবের ছোট ভাই তপন ভূইয়া। তবে হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে সন্দেহ হয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর। ডাকাতির মামলায় নানা অসঙ্গতির কারণে আদালতের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ঢাকা জেলা। প্রায় চার মাসের তদন্ত শেষে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পিবিআই। হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী মাহবুবের ছেলে মো. আবদুল্লাহর ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি রেকর্ড করেছে আদালত। এরপর পিবিআইর হাতে গ্রেপ্তার হন লাখি ও তার মেয়ে অনিকা। তবে লাখির মা লাভলী বেগম এখনো পলাতক রয়েছেন। 

পিবিআইর ভাষ্য, লাখির বেপরোয়া চলাফেরা ও বাপের বাড়ির টাকার চাহিদা মেটাতে গিয়ে স্থানীয় লোকজন ও বিভিন্ন এনজিও থেকে ২০/২২ লাখ টাকা ঋণ করেন মাহবুব। সেই ঋণের কিস্তির টাকা নিতে বাড়িতে এসে বসে থাকতেন এনজিও কর্মী ও পাওনাদাররা। এ অবস্থায় বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র পালিয়ে যাওয়ার জন্য মাহবুবকে চাপ দিতে থাকেন লাখি, দুই মেয়ে ও শ্বাশুড়ি লাভলী বেগম। কিন্তু তাতে মাহবুব রাজি না হওয়ায় পারিবারিক কলহ শুরু হয়। এর জের ধরে লাখি তার মেজ মেয়ে মাফরুজা আক্তার অনিকা (১৮) ও মা লাভলী বেগমকে সঙ্গে নিয়ে গত ৩১ ডিসেম্বর গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় মাথায় আঘাত করে মাহবুবকে হত্যা করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর উপ-পরিদর্শক মো. হযরত আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাহবুব হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি খুবই বেদনাদায়ক। স্ত্রী, মেয়ে ও শ্বাশুড়ি মিলে মাহবুবকে হত্যা করেন। সেই লাশের পাশে ভোররাত পর্যন্ত লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিলেন স্ত্রী লাখি। সকালে উঠে সবাইকে বলেন রাতে ডাকাত এসে মাহবুবকে হত্যা করেছে। কিন্তু তদন্তে নেমে মাহবুবের ছেলে আবদুল্লাহর স্বীকারোক্তিতে হত্যার রহস্য বের হয়ে আসে। আবদুল্লাহ ঘটনার রাতের বর্ণনা দিয়ে বলেছে, তার বাবাকে যখন মাথায় আঘাত করা হয়, তখন বাবা চিৎকার করে বলেছিলেন ‘তোরা আমার এই কাম করলি।’ এর পরই কম্বল দিয়ে মুখ চেপে ধরেন লাখি।

পিবিআইর এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘মাহবুব খুবই সরল প্রকৃতির লোক ছিলেন। কিন্তু তার স্ত্রী উল্টাপাল্টাভাবে চলাফেরা করতেন। দুই হাতে টাকা নষ্ট করতেন। ঋণ করে টাকা এনে বাবার বাড়িতে মা-ভাইদের দিতেন। এতে দেনায় পড়েন মাহবুব। তার মৃত্যুর পর ঋণের টাকা মাফ করে দিয়েছে গ্রামীণসহ বিভিন্ন এনজিও। এই টাকা মওকুফের জন্যই মাহবুবকে তারা হত্যা করেন। মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান। এর সঙ্গে আর কারও সম্পৃক্ততা আছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী আবদুল্লাহ পুলিশকে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে বলে, ‘ঘটনার রাতে আমি, আব্বু, আম্মু ও দুই বছর বয়সের বোন ফাতেমা এক খাটে ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ আব্বুর চিল্লানিতে ঘুম ভেঙে যায়। উঠে দেখি আম্মু লাঠি, শাবল দিয়ে আব্বুর মাথায় বাড়ি দিচ্ছে। এরপর আমার নানু লাভলী বেগম পুতা (মসলা বাটার পুতা) এনে আমার মেজ বোন অনিকাকে দেয়। অনিকা ওই পুতা দিয়ে আব্বুর মাথায় বাড়ি দেয়। আব্বু চিৎকার বরলে আম্মু কম্বল দিয়ে মুখ চেপে ধরে। সকালে এ বিষয়টি আমার চাচিকে বলেছিলাম।’ 

মাহবুবের ছোট ভাই তপন ভূইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাহবুব ভাই প্রায় ২৫ বছর আগে পাশের গ্রামে বিয়ে করেন। তখন ভাই ঢাকাতে একটি ফ্রিজের কোম্পানিতে চাকরি করতেন। পরে ২০১৬ সালে দুবাই যান। সেখানে টাকা ধরা খেয়ে ২০১৮ সালে দেশে ফিরে ফ্রিজ মেরামতের দোকান দেন। ভাই প্রায় ৪০ লাখ টাকার মতো দেনায় পড়েন। এ নিয়ে ভাবি খুব খারাপ ব্যবহার করতেন। ঘটনার দিন খুব ভোরে আমি কাঁচাবাজারে চলে যাই। এজন্য ভাবির কথামতো ডাকাতির মামলা করেছিলাম।

পিবিআইর অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাহবুবের তিন মেয়ে মনিকা, অনিকা, ফাতেমা ও এক ছেলে আবদুল্লাহ। সর্বশেষ স্থানীয় পাতিলঝাপ বাজারে পুরনো ফ্রিজ মেরামতের দোকান করেছিলেন। মাহবুব ঋণে জর্জরিত হওয়ার পর তার স্ত্রী, মেয়ে ও শ্বাশুড়ি ঘর-বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। কিন্তু মাহবুব বাপ-দাদার ভিটা বিক্রি করতে রাজি হননি। এখান থেকেই বিবাদের শুরু। ঋণের টাকা তার স্ত্রী মা-ভাইকে দিতেন। আর ঋণের কিস্তি টানতে হতো মাহবুবকে। হত্যার ঘটনাটি ডাকাতের হামলা বললেও রাত ২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত মাহবুবকে হাসপাতালেও নেওয়া হয়নি।

মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত পিবিআই ঢাকা জেলার উপ-পরিদর্শক সালেহ ইমরান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাহবুব হত্যার ঘটনায় পরিবারের দেওয়া বর্ণনাতেই অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়। ডাকাতির যে মামলা তারা করেন, এর কোনো সত্যতা মেলেনি। ঘরের দুটি দরজা অক্ষত অবস্থায় ছিল। পরে নিবিড় অনুসন্ধান করে আমরা নিশ্চিত হই এই হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিতভাবে স্ত্রী, মেয়ে ও শ্বাশুড়ি করেছেন। মাহবুবের ছেলের দেওয়া বর্ণনায় প্রকৃত বিষয় উদঘাটন হয়। আমরা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পুতা ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করেছি।’