বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দৃশ্যত বিব্রত সরকার প্রকল্প ব্যয় কমাতে তৎপর হয়েছে। রূপপুরের বালিশকা-, কৃষি মন্ত্রণালয়ের বঁটিকা-, কভিড-১৯ মোকাবিলায় গগলস, পিপিইর অস্বাভাবিক দাম ধরার খবরের প্রেক্ষাপটে নড়েচড়ে বসেছে পরিকল্পনা বিভাগ। বাজারদর যাচাই-বাছাই না করে উন্নয়ন প্রকল্পে কেউ যদি পণ্য ও উপকরণের দাম বেশি ধরে, তাহলে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। মন্ত্রী বলেছেন, বিদ্যমান যেসব আইনকানুন আছে, তার ওপর ভিত্তি করে শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। এছাড়া নজরদারিতে আইএমইডিকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে সব সচিবকে ডেকে এ হুঁশিয়ারি দেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। তিনি বলেন, বাজারদর যাচাই করে তবে পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে হবে। সভায় আরও জানানো হয়, শুধু কারিগরি ছাড়া এখন থেকে সরকারি কর্মকর্তারা শিক্ষা সফরের নামে বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবেন না। গাড়ি কেনাও বন্ধ। ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে যেসব প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে আসবে, সেসব প্রকল্প দেখার ক্ষেত্রে আরও শক্ত হওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও সংস্থা বিভিন্ন উপকরণ ও পণ্যের দাম ধরার ক্ষেত্রে অবশ্যই যাতে বাজারমূল্য যাচাইয়ে নির্ধারণ করে, সেই নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান।
উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে গতকাল সব সচিবকে নিয়ে বৈঠকে বসেন পরিকল্পনামন্ত্রী। সেখানেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে অন্যদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, অর্থ সচিব, পানিসম্পদ সচিব, পরিকল্পনা বিভাগের সচিবসহ প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সচিবদের উদ্দেশে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, উন্নয়ন কর্মকা-ে জনগণ আমাদের নজরে রাখছে। মানুষ অনেক সচেতন। আমাদের গতিবিধি, আচরণ দেখছে। জনগণের সম্পদ আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি তা তারা গভীর নজরে রেখেছে। তাই টাকার ব্যবহার, সময়োপযোগিতা ও পরিমাণ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। তিনি বলেন, এখন থেকে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পগুলো আরও শক্তভাবে নজরদারি করবে। তাছাড়া মন্ত্রণালয়গুলো যখন পণ্যের দাম নির্ধারণ করবে, তখন বাজারমূল্য যাচাই করে নির্ধারণ করবে।
বৈঠক শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় পণ্যের উচ্চদাম আর মেনে নেওয়া যায় না। জনগণের টাকা স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যয় করতে হবে। যাতে কোনোভাবেই নয়-ছয় না হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পর্যায়েই ব্যাপক মনিটরিং জোরদার করতে হবে। বিধিবিধান মেনেই তৈরি করতে হবে উন্নয়ন প্রকল্প।
গতকালের সভায় মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস বলেন, সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় টাকা যতটা খরচ হয়, উন্নয়ন সহযোগীদের টাকা ততটা খরচ হয় না। যার ফলে পাইপলাইনে অনেক বিদেশি ঋণ পড়ে আছে। কভিড ১৯-এর কারণে আমাদের রাজস্ব আদায় কমে যাচ্ছে। তাই এখন থেকে বিদেশি ঋণ খরচে বেশি মনোযোগী হতে হবে।
অর্থ সচিব বলেন, করোনার কারণে সরকারি কর্মকর্তাদের শিক্ষা সফরের নামে বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ। গাড়ি কেনাও বন্ধ। তবে কারিগরি সংক্রান্ত বিষয়ে বিদেশ সফরে যাওয়া যাবে। আইএমইডি সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ বলেন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ক্রয়নীতি বা পিপিআর অনুসরণ করে না। যার ফলে অনেক সময় অপচয় হয়। উন্নয়ন সহযোগীরা যাতে বাংলাদেশের ক্রয়নীতি অনুসরণ করে ঋণ দেয়, সেটি নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া থেকে শুরু থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত কোথায় কোথায় অসংগতি রয়েছে, তা নিয়ে গতকালের বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেখানে একাধিক সচিব জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়, বেশিরভাগই কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প নেওয়া হয়। সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্প নেওয়ার কারণে পদে পদে জটিলতা তৈরি হয়। দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। অনেক সময় নকশা প্রণয়ন না করে প্রকল্পটি অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়। উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ৫০ কোটি টাকার মধ্যে রাখা হয়, যাতে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ওঠাতে না হয়। একনেক সভার সভাপতি প্রধানমন্ত্রী। ৫০ কোটি টাকার মধ্যে প্রকল্প হলে সেই প্রকল্প পরিকল্পনামন্ত্রী নিজ ক্ষমতাবলে অনুমোদন করতে পারেন। উপস্থিত একাধিক সচিব জানান, দেশে বস্তুনিষ্ঠতার চেয়ে তদবিরে প্রকল্প নেওয়া হয়। বাজারদর যাচাই না করেই প্রকল্পে পণ্য ও সেবার দাম নির্ধারণ করা হয়। ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে একটি প্রকল্পে একজন প্রকল্প পরিচালক থাকার কথা থাকলেও একজন পিডি বেশ কয়েকটি প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পালন করেন। আর পিডি নিয়োগ হয় কারও পছন্দে; কারও তদবিরে। একটি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর ওই প্রকল্পে কেনা যানবাহন পরিবহন পুলে জমা পড়ে না বলেও গতকালের সভায় জানানো হয়। আবার সাধারণ প্রকৃতির একটি প্রকল্পে পরামর্শকের প্রয়োজন না হলেও সেখানে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়। সার্বিকভাবে এসব কারণে উন্নয়ন প্রকল্প সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন হয় না। নানা অনিয়ম হয়। সরকারি টাকার অপচয় হয়।
গতকালের সভায় আরও জানানো হয়, ৫০ কোটি টাকার ওপরে কোনো প্রকল্প নেওয়া হলে সেটিতে সমীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কোনো প্রকল্পে এ নীতি অনুসরণ করা হয় না। এ সময় প্রকল্প নজরদারিতে আইএমইডিকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন পরিকল্পনামন্ত্রী।