অর্থনীতিবিদরা বেশ আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, করোনাভাইরাস মহামারীতে যত মানুষের প্রাণহানি ও স্বাস্থ্যগত ক্ষয়ক্ষতি ঘটবে, দুনিয়াজুড়ে তার চেয়েও বহুগুণ বেশি সম্পদহানি ও জীবিকার সংকটে পড়বে সাধারণ মানুষ। পশ্চিমা বিশ্বের অন্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে বেশ খানিকটা কম হলেও আর্থসামাজিক ক্ষয়ক্ষতির বিবেচনায় আমাদের দেশের পরিস্থিতি যে খুবই নাজুক তা খোলা চোখেই দেখা যাচ্ছে। করোনাকালের কয়েক মাসে সাধারণ ছুটি, লকডাউন পরিস্থিতি ইত্যাদিতে যে অর্থনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের ওপর সেটার অভিঘাত যে কতটা প্রবল তা এর মধ্যেই স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি সংস্থা এরই মধ্যে দেশে প্রবল হারে দারিদ্র্য বৃদ্ধি, ব্যাপক বেকারত্ব, ছাঁটাই ও কর্মহীনতার চিত্র নানা পরিসংখ্যানে তুলে ধরেছিল। এখন সরকারি পরিসংখ্যানেও প্রবল দারিদ্র্য বৃদ্ধির কথা স্বীকার করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে করোনার কারণে দেশের অন্তত দেড় কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও কর্মহীনতার প্রকৃত পরিস্থিতি অনুধাবনের জন্য দেশব্যাপী বাস্তবিক জরিপ পরিচালনা করা উচিত।
সরকারের থিংক ট্যাংক হিসেবে পরিচিত পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগ-জিইডি এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি বলা হয়, দেশের অন্তত দেড় কোটি মানুষ করোনাকালে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। সংস্থাটি বলছে, আসন্ন অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় করোনার প্রভাবকে অন্তর্ভুক্ত করতে একটি প্রাথমিক হিসাব করা হয়েছে। হিসাব অনুসারে, চলতি বছর ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২৯ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আর বেকার হয়েছে কয়েক কোটি মানুষ। এ হিসাবে করোনার কারণে তিন মাসে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে ৯ শতাংশের বেশি। শিগগিরই এ হিসাবটি অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছে জিইডি। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাস্তবে দারিদ্র্যের হার আরও বেশি। এটা খোলা চোখে দেখলেই বোঝা যায়। এজন্য জিইডির উচিত একটি বাস্তবসম্মত পরিসংখ্যানিক হিসাব অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় যুক্ত করা। এতে পরিকল্পনা সুফল পেতে সুবিধা হবে।
বিবিএসের হিসাব অনুসারে, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৬৫ লাখ। গত বছর দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ হিসাবে মোট গরিব ছিল ৩ কোটি ৪১ লাখ ৩ হাজার ২৫০ জন আর করোনার তিন মাসে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ, ফলে গরিব মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৮৯ লাখ ৫ হাজার ১০০। এ হিসাবে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ১ কোটি ৪৮ লাখ ১ হাজার ৮৫০। এর আগে করোনার প্রভাবে দেশে দারিদ্র্যের হার নিয়ে বেশ কয়েকটি সংস্থা তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর মধ্যে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) বলেছে, এ সংখ্যা ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) হিসাবে প্রায় ৩৯ শতাংশ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) হিসাবে তা ৩০ শতাংশের ওপরে। ব্র্যাক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের হিসাবেও দারিদ্র্যের হার জিইডির চেয়ে ঢের বেশি।
অর্থনীতিবিদ ও শ্রম খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনাকালে দেশে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার হয়েছেন এবং জীবিকার সংকটে পড়েছেন তাদের বড় অংশই মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিক-কর্মচারী-দিনমজুর কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। দেশে নতুন করে বেকার ও গরিব হওয়া এ মানুষদের একটা বড় অংশই ইতিমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় নগর-বন্দর থেকে গ্রামে ফিরে গেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনার কারণে দেশে ফেরত আসা লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিক। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা-আইওএম সম্প্রতি এক জরিপে জানিয়েছে, দেশে ফেরা ৭০ শতাংশ প্রবাসীকর্মীই এখন জীবিকার সংকটে আছেন। শহরে কাজ হারিয়ে কিংবা বিদেশ থেকে ফিরে আসা এ বিপুলসংখ্যক মানুষের চাপ এখন গ্রামীণ অর্থনীতিতেও পড়ছে। এ অবস্থায় প্রবল দারিদ্র্য রোধে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা আরও বাড়ানো এবং গ্রাম ও শহরকেন্দ্রিক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে সরকারকে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ও রপ্তানিমুখী শিল্প খাতকে চাঙ্গা করার প্রয়াস জোরদার করা জরুরি। এজন্য করোনার আর্থিক অভিঘাত মোকাবিলায় সরকারঘোষিত ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজের ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকার ঋণ সহায়তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে নজরদারি বৃদ্ধি এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা মাথায় রাখা জরুরি যে, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষকে কর্মহীন রেখে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।