দীর্ঘ অপেক্ষার পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার চূড়ান্ত বিচার নিষ্পত্তি হলেও সব আসামির সাজা কার্যকর না হওয়ার আক্ষেপ রয়েই গেছে। ৪৫ বছর আগে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যায় ছয়জনের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হলেও এখনো বিদেশে পালিয়ে রয়েছে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পাঁচ খুনি। তাদের কবে দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর হবে তা সরকারের কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। আসামিদের অবস্থান চিহ্নিত করে তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের ‘রেড নোটিস’ জারি করা হয়েছে। তারপরও তাদের ধরা সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, সর্বোচ্চ সাজায় দ-িত আসামি আবদুল আজিজ পাশা পলাতক অবস্থায় ২০০১ সালে জিম্বাবুয়েতে মারা যান। এএম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে এবং এসএইচএমবি নূর চৌধুরী কানাডায় রয়েছেন। এ ছাড়া খন্দকার আবদুর রশিদ ও শরিফুল হক ডালিম কোন দেশে অবস্থান করছেন সে বিষয়ে এই দীর্ঘ সময়েও নিশ্চিত হতে পারেনি সরকার। মোসলেহ উদ্দিন ভারতের কলকাতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে সম্প্রতি দেশটির কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হলেও এ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট কালরাতে জাতির পিতাকে সরাসরি গুলি করে খুন করা মোসলেহ উদ্দিন তার নাম পাল্টে ডা. দত্ত নামে কলকাতার উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ঠাকুরনগরে অবস্থান করছিলেন এবং সেখানে গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে খবর প্রকাশ হলেও এ নিয়ে পরে নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি জাতীয় চার নেতাকে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যার অভিযোগে জেলহত্যা মামলায় ফাঁসির দ- হয় মোসলেহ উদ্দিনের।
তবে দীর্ঘদিন ভারতে পালিয়ে থেকে বাংলাদেশে আসা বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি আবদুল মাজেদকে গ্রেপ্তারের পর চলতি বছরের ১১ এপ্রিল ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হয়।
বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেশিরভাগ খুনির অবস্থান মোটামুটি শনাক্ত হয়েছে। তাদের ধরতে ইন্টারপোল কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনতে সরকার চেষ্টা করছে। ভারতেও এক খুনি পালিয়ে আছেন বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। প্রতিটি খুনিকেই দেশে ফিরিয়ে ফাঁসির রায় কার্যকর করা হবে।’
অন্যদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, পলাতক পাঁচ খুনির রায় কার্যকর না করা পর্যন্ত তাদের খুঁজে বের করে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলবে। তবে তিন খুনির অবস্থানের বিষয়ে সরকারের কাছে তথ্য নেই।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গত বৃহস্পতিবার ভিডিও কনফারেন্সে বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত পলাতক খুনিকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় সম্পূর্ণভাবে কার্যকর না করতে পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের খুঁজে বের করা ও আনার প্রচেষ্টা চলবে।’ নূর চৌধুরী কানাডায় রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কানাডীয় সরকারের একটি আইন আছে, যে দেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে, সেখানে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে এরকম কোনো আসামিকে তারা ফেরত পাঠায় না। তাকে সেখানে কীভাবে থাকার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে জানতে আবেদন জানানো হলেও প্রাইভেসি অ্যাক্টে এ তথ্য দেওয়া যায় না বলে কানাডা জানায়। এরপর সেখানে আদালতে আবেদন করার পর এই কাগজগুলো দেওয়া যাবে বলে আদালত জানায়। এর প্রেক্ষিতে আমরা এখন অগ্রসর হচ্ছি।’ যুক্তরাষ্ট্রে থাকা রাশেদ চৌধুরীর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখন যে পরিস্থিতি হয়েছে, সেটা পর্যবেক্ষণ করছি এবং এর অগ্রগতির ব্যাপারে আমরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। বাকি তিনজনের ব্যাপারে তাদের অবস্থান সম্বন্ধে জানি না, কিন্তু আমাদের অনুসন্ধান চলছে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল শাখার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিসে থাকা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আসামি মোসলেহ উদ্দিন জার্মানি বা ভারত, নূর চৌধুরী কানাডা, রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্র এবং আবদুর রশিদ ও ডালিম লিবিয়ায় আছেন বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে।
ফিরে দেখা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া : বঙ্গবন্ধু হত্যার ২১ বছরের বেশি সময় পর ১৯৯৬ সালের ১৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ বা দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিল হলে বিচারের পথ খোলে। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর দেশের বিচারিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ফৌজদারি এ মামলার রায়ে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের বিচারক কাজী গোলাম রসুল ১৫ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও কারাগারে থাকা চার আসামির আপিলের ওপর শুনানি শেষে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বিভক্ত রায় (একজন বিচারপতি ১৫ জনের এবং অন্যজন ১০ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়)। এরপর হাইকোর্টের তৃতীয় একটি বেঞ্চ ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল এক রায়ে ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। আইন অনুযায়ী পলাতকরা আপিলের সুযোগ পাননি।
২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠনের পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা এ মামলাটির বিচারকাজ থমকে যায়। ছয় বছর পর ২০০৭ সালে আপিল বিভাগে মামলাটি ফের সচল হয়। ওই বছরের ১৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার হলে ১৮ জুন তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয় এবং এই আসামিও আপিল করেন। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চের রায়ে কারাগারে থাকা পাঁচ আসামির আপিল খারিজ হয়ে যাওয়ায় তাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। এরপর আপিল বিভাগে রায় পর্যালোচনার (রিভিউ পিটিশন) আবেদন খারিজ হয়ে গেলে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি রাতে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, মহিউদ্দিন আহমেদ ও একেএম মহিউদ্দিনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের সাড়ে ১০ বছরের বেশি সময় পর গত ১১ এপ্রিল রাতে বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে (কেরানীগঞ্জ)। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) জানায়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘদিন ভারতে পালিয়ে থেকে গত ২৬ মার্চ ময়মনসিংহের সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর আবদুল মাজেদকে গত ৬ এপ্রিল মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি রাশেদ চৌধুরীকে সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্প্রতি পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির বিচার বিভাগ। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বার গত ১৭ জুন দেশটির ইমিগ্রেশন আপিল বোর্ডের কাছে রাশেদ চৌধুরীর রাজনৈতিক আশ্রয় মামলার নথি পর্যালোচনার জন্য তলব করেন। এ পদক্ষেপের ফলে আশায় বুক বাঁধছে বাংলাদেশ। রাশেদ চৌধুরী সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় হারালে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা জোরালো হবে। রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত দিতে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।