(শনিবার মারা গেছেন চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর। ২০০৭ সালের মে মাসে তার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন মাহবুব মোর্শেদ। ওই সময়ের ভূমিকাসহ সাক্ষাৎকারটি দেশ রূপান্তর পাঠকদের জন্য হুবহু উপস্থাপন করা হলো।)
পেইন্টিং, ম্যুরাল, ছাপচিত্রসহ চিত্রকলার নানা ফর্মে কাজ করেছেন মুর্তজা বশীর। বাংলাদেশের চিত্রকলায় অগ্রগণ্য অবস্থান তার। লিখেছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস। উর্দু চলচ্চিত্র ‘কারোয়া’র চিত্রনাট্য লিখেছেন। হুমায়ূন কবীরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সাদেক খানের চলচ্চিত্র ‘নদী ও নারী’তে কাজ করেছেন চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক ও প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে। গবেষক হিসেবে মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে রচনা করেছেন বাংলার হাবশি সুলতানদের ইতিহাস। শিল্পকলা বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। এতকিছুর পরও ফটোগ্রাফি, ডাকটিকিট সংগ্রহের মতো শখের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। অবিরাম পাঠ করে চলেছেন ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক বইপত্র। তারুণ্যের দীপ্তি তাকে রাখে সদা চঞ্চল। ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী শিল্পী চান ৯৩ বছরের জীবন। নির্মাণ করতে চান চারটি ডকুমেন্টারি মুভি। মে মাসেই এঁকে ফেলতে চান ডানা সিরিজের ১৫টি ছবি। দ্রুত ঘুরে আসতে চান বাংলাদেশের কয়েকটি প্রত্নস্থল। তার জন্ম ঢাকায়, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কনিষ্ঠ সন্তান তিনি। চিত্রকলা বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউট, আশুতোষ মিউজিয়াম, ফ্লোরেন্সের দ্যেল বেল্লে আরটি, প্যারিসের ইকোলে ন্যাশনাল সুপিরিয়র দ্য বোজার্ট ও আকাদেমি গোয়েৎস-এ। ভ্রমণ করেছেন নানা দেশ, গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন বাংলার লোকশিল্প। ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়ে ২০০৩ সাল থেকে স্থায়ীভাবে ঢাকায় থাকছেন।
সাধারণভাবে আমরা জানি মুখ্যত বেঙ্গল স্কুলের মাধ্যমেই বাংলায় আধুনিক চিত্রকলা চর্চার সূচনা ঘটেছে। বেঙ্গল স্কুলের পর পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশে বঙ্গীয় শিল্পধারা বলে কি কিছু তৈরি হয়েছে?
এ প্রসঙ্গে একটি কথা সর্বপ্রথম বলা উচিত যে, বাংলাদেশের বেশির ভাগ শিল্পী মনে করেন, শিল্পকলার ভাষা হলো আন্তর্জাতিক। অতএব আন্তর্জাতিকতা তার শিল্পে থাকতে হবে। এখানে একটি জিনিস আমার কাছে বেখাপ্পা লাগে, আন্তর্জাতিক ভাষা আমি স্বীকার করি কিন্তু সে ভাষায় তো মাটির গন্ধ থাকতে হবে। আমরা আমেরিকার অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিস্টদের কাজ দেখি, তারা রঙ ছিটিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে, রাগের সঙ্গে চওড়া ব্রাশ দিয়ে ইচ্ছা মতো আঁকাঝুকি করেছে। কেন? আমেরিকার সোসাইটি ছিল ভাঙনমুখী। বাবা ছেড়ে চলে গেছে, মা ছেড়ে চলে গেছে। এই যে টোটাল একটা এলিয়েনেটেড সমাজ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যান্ত্রিকতা সেখানে। মানুষ সেখানে অনেকটা যন্ত্রের কাছে পরাজিত হয়েছে। ভেতরের এ রাগের বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখছি শিল্পীদের রঙ ব্যবহারে, সেটার মধ্যে এক ধরনের অ্যাঙ্গার প্রকাশিত হচ্ছে। সাইড বাই সাইড আমরা দেখছি ওই সময় সাহিত্য ক্ষেত্রে বিট জেনারেশন। বিলেতে অ্যাংরি ইয়াং ম্যান। জন অসবর্ন বিলেতে লুক ব্যাক ইন অ্যাংগার লিখলেন। সঙ্গে আরও অনেকে জন ওয়াইন, ফিলিপ লারকিন, কিংসলি অ্যামিস। বাংলাদেশে তো এখনো একান্নবর্তী পরিবার। পাশ্চাত্যের ওই সেন্সে এখনো কিন্তু এখানে একজন মানুষ এলিয়েনেটেড হয়নি, এখনো যৌথ পরিবার। বাবা-মা-ভাই-বোন নিয়ে থাকে। টোটালি এলিয়েনেটেড মানুষের পার্সেন্টেজ খুব কম। এখানে শিল্পকলার আন্তর্জাতিক ভাষার চিন্তাধারার ফলে দেখা গেল, এসব চিত্রকলায় মাটির গন্ধ আর দেশজ রঙ থাকল না।
এর আরেকটি কারণ হলো, শিল্প সংগ্রাহক বলতে যা বোঝায় তা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। শিল্প সংগ্রাহকেরা যতক্ষণ না আর্টকে একটি পণ্য হিসেবে লগ্নি করবে ততক্ষণ এখানে আর্ট ওইভাবে বিকশিত হবে না। এখানে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া আমাদের দেশে আর্ট সংগ্রাহক গড়ে ওঠেনি। এখানে ছবির বেশির ভাগই বিক্রি হচ্ছে অনেকটা ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন হিসেবে। ঘরের দেয়ালের রঙ, পর্দার রঙ, কার্পেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। ফলে শিল্পীদের কাজেও উজ্জ্বল রঙের প্রয়োগ আমরা দেখি না। আমার জীবনে এমন ঘটেছে, আমি হয়তো লাল রঙ ব্যবহার করেছি কিন্তু সে ছবি বিক্রি হচ্ছে না। বায়ার আমাকে বলেছে, আপনার এ ছবির সঙ্গে আমরা তো বসবাস করতে পারব না। আমি যদি ওখানে কম্প্রোমাইজ করে ফেলি তাহলে তো আমি আমার ছবি করতে পারব না।
বাংলার নিজস্ব ঘরানা গড়ে ওঠেনি, কারণ আমরা কথায় বলি আমরা বাঙালি কিন্তু বাংলার শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? এটার জন্য অনেক নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে ছোটবেলাতেই যোগসূত্র স্থাপন করে দিতে হবে। আমি যখন প্যারিসে ছিলাম আমার বড় মেয়ে ফরাসি স্কুলে যেতো। দেখা যেতো স্কুল থেকে তাদের ভার্সাই প্যালেসসহ বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হতো। বাংলাদেশে কী আমরা ময়নামতি, মহাস্থান কিংবা পাহাড়পুর, কান্তজির মন্দির এগুলোতে আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে যাই? যাই না। ফলে ঐতিহ্যের সঙ্গে আমাদের যোগ নেই। এই যে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির তত্ত্বাবধানে উয়ারি-বটেশ্বরে খনন হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি সেখানকার কয়টা ছেলেকে উয়ারি-বটেশ্বরে নিয়ে গেছে? আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে ছোটবেলা থেকে আমরা যোগসূত্র তৈরি করতে পারিনি।
তারপরও আমাদের এখানে যে একেবারেই কাজ হচ্ছে না তা নয়। আমাদের কামরুল হাসান লোকশিল্প, কালীঘাটের চিত্রকলা ইত্যাদির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। রশীদ চৌধুরী ট্যাপেস্টির ফর্ম আমাদের নিজস্ব লোকশিল্প লক্ষ্মীর সরা থেকে নিচ্ছেন। আবার কাইয়ুম চৌধুরীকে আমরা দেখলাম, একদিকে কালীঘাট থেকে নিচ্ছেন অন্যদিকে তার মধ্যে জ্যামিতিক যে বিন্যাস আমার মতে, সেটা অনেকটা জামদানি শাড়ির মতো। এ রকম হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অন্যরা আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ বোধ করছেন বলে তো আমি দেখছি না।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ইউরোপিয়ান ঘরানার শিল্পী ছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম, আমার শিল্পকলায় মাটির গন্ধ নেই, দেশের গন্ধ নেই তখন আমার মনে হলো, একজন কৃষকের প্রধান কাজ হলো জমিটাকে চেনা। জমিটাকে চিনলেই সে সঠিক বীজটা রোপণ করতে পারবে। একজন শিল্পীকে কৃষক হতে হবে, তাকে বুঝতে হবে আমার মাটি কেমন।
ঐতিহ্যে হাত দিতে গিয়ে দেখলাম, আমার আগে দুজন অলরেডি সেখানে হাত দিয়ে কাজ করেছেন একজন যামিনী রায় আরেকজন কামরুল হাসান। আমার কাছে মনে হলো, এরা বিরাট দুটি পাহাড় এবং এ পাহাড়কে অতিক্রম করার মতো শক্তিশালী শিল্পী সত্তা আমার নেই। আমি জানি, পিকাসো যখন কিউবিক পদ্ধতিতে শিল্পকলা সৃষ্টি করলেন যে কেউ কিউবিজম করতে গিয়ে পিকাসোর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। কারণ পিকাসো কিউবিজমকে এমন একটা স্যাচুরেটেড পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যে, পিকাসোর গন্ধটা মুছে ফেলা কঠিন কাজ ছিল। তেমনি দেখলাম, আমার কাজে যদি কামরুল হাসান বা যামিনী রায়ের গন্ধ থাকে তবে সেটা একজন আত্মম্ভরি শিল্পীর জন্য প্রশংসার কথা নয়। আমি তাহলে কী করতে পারি? আমি ঠিক করলাম, আমার পাশ্চাত্যের শিক্ষা-দীক্ষা ও আমার ঐতিহ্যকে যদি মেলবন্ধনে আনতে পারি তাহলে আমি ওদের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারব এবং আমি সেভাবে বেশ কিছু ফিগারেটিভ কাজ ২৫ বছর পর ১৯৯৩-তে শুরু করি। তবে এখনো মনে হয়, বাংলাদেশে আমরা ছবি আঁকছি ঠিকই কিন্তু নামটা যদি মুছে ফেলা যায় তবে শিল্পীর আইডেনটিটি দেখা খুব মুশকিল। সে কী ফরাসি, নাকি ইংরেজ নাকি আমেরিকান যে এ দেশে এসেছে এখানকার নিসর্গ কিংবা এখানকার মানুষ আঁকছে বোঝা মুশকিল।
এখানে মূল ব্যাপার হলো, আমার ঐতিহ্যের প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আমার ঐতিহ্যকে জানতে হবে, তার মধ্যে অবগাহন করে যদি শিল্প সৃষ্টি করা হয় তাহলেই একটি নিজস্ব শিল্পধারা গড়ে উঠবে।
আমাদের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়গুলো গভীর অভিনিবেশে পাঠ করেন। এ বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণামূলক কাজও করেছেন। একজন শিল্পী হিসেবে ইতিহাসের মতো বিষয়ের প্রতি আপনার আগ্রহের সূচনা কীভাবে ঘটল?
আমি মনে-প্রাণে ইউরোপিয়ান চিন্তাধারায় আক্রান্ত ছিলাম। আমার বয়স যখন ২২ বছর, আমি এক রাতে বাড়ি ফিরিনি। আমার বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি বাড়িতে ফিরলে না কেন? আমি বড় হয়েছি। এটা আমাদের সমাজে বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত পরিবারে হয় না। আমার বাবা আমাকে ইতালিতে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। আমি ঢাকায় ফিরে আসার পর যখন কোনো চাকরি পেলাম না তখন সিদ্ধান্ত নিলাম করাচি চলে যাব। আমি যখন কাপড়-চোপড় গোছাচ্ছি, আমার বাবা এসে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি আমাকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন বোধ করলে না? আমি বললাম, নো, আমি গ্রোন আপ।
কিন্তু ১৯৮০ সালে যখন বাংলাদেশ সরকার ও শিল্পকলা একাডেমি আমাকে জাপানে ফুকোকা সিটিতে একটি সেমিনারে পাঠাল আমার ইন্টারপ্রেটার মেয়েটি ছিল সুন্দরী, তরুণী, বেশভূষায় আধুনিক। আমি যখন তার দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম সে কিন্তু হাত বাড়াল না। সে তাদের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে মাথাটা ঝুঁকিয়ে আমাকে অভিবাদন জানাল। এটা আমাকে ভীষণভাবে আহত করল। আমার তখন ঈশপের গল্প মনে হলো। একটা কাক ময়ূরের পুচ্ছ পরে ছিল। সে কাকও হতে পারেনি, ময়ূরও হতে পারেনি। আমার মনে হলো, বাংলাদেশ তো বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ নয়, এটি এ উপমহাদেশেরই অংশ এবং এ উপমহাদেশের সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা। লোকজ উপাদান ও জলবায়ুর প্রভাব থাকতে হবে কিন্তু ধারাবাহিকতা তো অস্বীকার করা যায় না। তখন আমার জানার ইচ্ছা হলো, আমি কে, আমি কী, কোত্থেকে এসেছি। এটি যখন আমার মাথায় ঢুকল তখন দেখা গেল আমি আসলেই আর কোনো ছবি আঁকতে পারছি না। আমি ’৮০ থেকে ’৮৪ পর্যন্ত কোনো ছবি আঁকিনি। সে সময় আমি নিজেকে খোঁজার জন্য এ দেশের ধর্মীয় গ্রন্থ, ইতিহাস, সামাজিক ইতিহাস, অর্থনৈতিক ইতিহাস, রাজনৈতিক ইতিহাস, যে স্মৃতি ও শাস্ত্রগুলো আছে, পুরাণ এগুলো পড়া শুরু করলাম।
তখন চিটাগং ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছি, অ্যাসিস্ট্যান্ট বা অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরের বেতনে তো আর সংসার চলে না। ফলে ছবি আঁকতে হয়। যেহেতু ছবি আঁকা ছাড়া অন্য কোনো বিদ্যা জানি না, যা থেকে কিছু পয়সা আসতে পারে। যেহেতু কমার্শিয়াল কাজ আমি করতাম না। বইয়ের প্রচ্ছদ, ইলাস্ট্রেশন আমার দ্বারা হতো না। জানতাম না বলে লোকের কোনো চাহিদাও ছিল না। এ জন্য অতিরিক্ত অর্থের জন্য আঁকাআঁকি চালাতে হতো। ইচ্ছার বিরুদ্ধে ’৮৪ সালে একটি প্রদর্শনী করলাম। পরে আবার ছবি আঁকা বন্ধ হয়ে গেল। আবার ’৮৮ সালে কয়েকটি ছবি আঁকলাম।
তারপর ১৯৯০ থেকে ’৯৭ এ সাতটি বছরে আমি গবেষণা করতে শুরু করলাম। আমার কাছে খুব অবাক লেগেছিল বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে চারজন অ্যাবেসিনিয়ান। এরা এসেছিল দাস হিসেবে। এরা পরে ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। আমি ওই সময় একটি বই করি, মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে ‘বাংলার হাবশি সুলতান ও তৎকালীন সমাজ’ নামে।
আমার মতে, ইউনিভার্সিটিগুলোর ইতিহাস কীভাবে মুদ্রাতত্ত্ব ও শিলালিপি সম্পর্কে পাঠদান করা উচিত। তাহলে এ দেশের ইতিহাস, মুদ্রা, সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে জানা যাবে। ইউনিভার্সিটি লেভেলে এগুলো পাঠ্য থাকলে সামাজিক কাঠামো বোঝা যেতো। আমরা মুখে বলি বাঙালি বাঙালি, অন্তর থেকে বলি না। শুধু পহেলা বৈশাখ আর ঢাকঢোল পেটালেই বাঙালি সংস্কৃতি হয় না। এগুলো লোক দেখানো। সংস্কৃতিকে তো লালন-পালন করতে হবে।
জাপানের ওই ঘটনা থেকেই আমার মধ্যে দেশের সংস্কৃতি নিয়ে, ইতিহাস নিয়ে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হলো। এই যে আমি বসে আছি, আমার পেছনে আছে বাংলাদেশের বিরাট একটা ম্যাপ। আমি ম্যাপে দাগ দিয়ে রেখেছি কোথায় আমাদের লোকশিল্প, টেরাকোটা, প্রত্নসম্পদ আছে। শুধু মন্দিরে না, মসজিদেও। এগুলো তো দেখতে হবে। এগুলো আমাদের মাটি থেকে উঠে আসা। এ দেশের গ্রামীণ শিল্পীরা এগুলো করেছে।
ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব চর্চা আপনার শিল্পে কি ব্যাপক মাত্রায় প্রভাব ফেলেছে?
অবশ্যই ফেলেছে। অবশ্যই ফেলেছে। ভবিষ্যতে আমার মনে হয়, কম্পোজিশনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে। যেটা আমার এখনো আসেনি, এখনো আমি একটা ফিগারের বেশি আঁকি না। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে টেরাকোটা দেখার অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। টেরাকোটার একেকটা ফলকে যেভাবে কয়েকটা ফিগারকে অর্গানাইজ ও কম্পোজ করা হয়েছে সেগুলো আমি দেখেছি যা আমার আঁকায় কাজে লাগবে। আধুনিক চিত্রকলায় টেক্সচার একটা এলিমেন্ট, এখানে যেহেতু কোনো রঙ ছিল না অতএব আঁচড় কেটে শাড়ির নানা রকম টেক্সচার করা হতো। এগুলো হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমার কাজে লাগবে।
আপনি বলছিলেন যদি ৯৩ বছর বাঁচেন তবে আপনার শিল্প একটা পরিণত পর্বে পৌঁছতে পারবে।
আমি মনে করি, এখন পর্যন্ত, এ ৭৬ বছর বয়স পর্যন্ত আমি শিখছি। কিন্তু সময়কে উত্তরণ করার মতো যে শিল্প সেটা কিন্তু আমি সৃষ্টি করতে পারিনি। এই যে জ্ঞান আহরণ করছি এটা প্রয়োগ করার মতো যদি আরও বয়স আমি পাই তাহলে আমি সফল হতে পারি। আমি আমার মাটি আমার দেশের রঙ এসব ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন।
এই যে বাংলাদেশ, এর প্রকৃতি যদি দেখি, সব জেলার সব সবুজ কিন্তু এক নয়। সবুজের রঙ জায়গায় জায়গায় পাল্টে যায়। উত্তরবঙ্গের সবুজ কিন্তু একরকম, দক্ষিণবঙ্গের সবুজ অন্যরকম, আবার ডিস্টিক্টওয়াইজ রমণীদের শাড়ির রঙ পাল্টে যায়। সব অঞ্চলে বেগুনি রঙ পাওয়া যাবে না। অনেক অঞ্চলে ডুরে কাটা শাড়ি আছে। সব অঞ্চলে ডুরে কাটা শাড়ি নেই। তবে কমন যে রঙ আমি সব অঞ্চলে দেখেছি সেটা হলো নীল ও সবুজ। সিম্পল একটা দা’র ডিজাইন কিন্তু অঞ্চল ভেদে চেঞ্জ হয়ে যায়। নৌকা এত রকম কেন? নৌকার শেপ, গলুই অঞ্চলভেদে কিন্তু চেঞ্জ হয়ে যায়।
সব ক্ষেত্রেই আমরা দেখছি নিজস্বতার একটা ব্যাপার কাজ করে। শিল্পকলার ক্ষেত্রে উপলব্ধিটা এখন অনেক গভীরভাবে কাজ করছে। যেটা সিক্সটিজে অনুভূত হয়নি।
আমি কিন্তু এ বিষয়ে একমত নই। এখনো কিন্তু শিল্পীরা আমাদের দেশের শিল্প ও সংস্কৃতিকে ওইভাবে অনুসন্ধান করছে না, যতটা আন্তর্জাতিক শিল্পকলার প্রতি তারা আকৃষ্ট হচ্ছে।
এটা কেন হচ্ছে? আপনি বহুদিন শিক্ষকতা করেছেন। আপনার কি মনে হয় আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে গলদটা রয়ে গেছে? নাকি আমাদের অগ্রজ শিল্পীদের অনুসরণ করতে গিয়েই এটা হচ্ছে?
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখানে কী পড়ানো হচ্ছে? আমরা পড়াচ্ছি ওয়েস্টার্ন আর্ট- একেবারে প্রিমিটিভ থেকে লেটেস্ট পর্যন্ত। কিন্তু ওরিয়েন্টাল আমরা পড়াচ্ছি ঠিকই সেখানে ইন্ডিয়ারটাতে জোর দিচ্ছি, ছুঁয়ে যাচ্ছি জাপান-চীনকে। আমার মতে, আমাদের পাঠ্যক্রমকে পরিবর্তন করতে হবে। আমার রকোকো জানার দরকার নেই। রেনেসাঁ জানলেই আমার জন্য যথেষ্ট। বারোক, রকোকো টাচ করবো, অত এলাবোরেট পড়ানোর দরকার নেই। তারপর আসব রিয়্যালিস্ট পিরিয়ডে, তারপর ইমপ্রেশনিস্ট পর্বে। ইন বিটুইনগুলো আমরা টাচ করব। আমি এশিয়ান, ইন্দোনেশিয়ায় কী আর্ট হচ্ছে তা আমি জানি না। মিয়ানমার, থাইল্যান্ডে কী হচ্ছে তা আমরা জানি না। ইন্ডিয়ার আধুনিক আর্ট আমরা জানি না যতটা জানি অজন্তা, ইলোরা, রাজপুর, কাংড়া। তাও ভাসা ভাসা। ওরিয়েন্টাল আর্টের মধ্যে পার্সিয়ান আর্টকে ইমপোর্টেন্স দেওয়া উচিত, তারপর ইন্ডিয়ান আর্ট। কালীঘাট ও পাল চিত্রকলা আরও ডিটেইল পড়ানো দরকার। নেপাল, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, জাপান, চীন এগুলোকে ইলাবোরেটলি পড়ানো দরকার। ইউরোপিয়ানটা শিখব শিল্পকলার ধারাবাহিকতা জানার জন্য।
পপ আর্ট নিয়ে এত পড়ার দরকার নেই। জানার জন্য পড়ব। সাহিত্যেও একই ঘটনা, পার্শ্ববর্তী দেশের সাহিত্য সম্পর্কে আমরা কিন্তু তেমন জানি না। আমাদের এখন পুরো জিনিসটার জন্য একটি ভিশন দরকার। টার্গেট করতে হবে যে শিশুটা হামাগুড়ি দিচ্ছে তাকে। তার জন্য চিন্তা করতে হবে।
কিন্তু এ কথাও তো ঠিক যে, আন্তর্জাতিক হোক কী লোকাল ফর্ম, যে ফর্মের একটি ছবি তৈরি হোক শিল্পবোদ্ধা ও রসগ্রাহীর অভাবে সেটা ব্যাপক মাত্রায় মানুষের কাছে পৌঁছতে বা গৃহীত হতে পারছে না। এখানে শিল্প সমালোচনার অবস্থাও খুব সুখকর নয়। আমরা তো ইনস্টিটিউশন দিয়ে পাবলিককে অ্যাপ্রিসিয়েশনের জায়গায় নিয়ে আসতে পারব না।
শিল্পকলার আন্দোলন বলতে যা বোঝায় সেটা কিন্তু আমাদের এখানে দরকার নেই। এটা প্রথম যুগে দরকার ছিল। ১৯৫০ সালে যখন ঢাকা লিটন হলে ঢাকা আর্ট গ্রুপের প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হলো তখন দেখা গেছে ঘোড়ার গাড়ি করে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা দল বেঁধে চিত্র প্রদর্শনী দেখতে এসেছে। কেন এসেছে? ঢাকায় তখন বিনোদনের অভাব, চিড়িয়াখানা নেই, বোটানিকাল গার্ডেন নেই। একটা নতুন জিনিস চিত্রকলা দেখতে তারা এসেছে।
আমাদের ছাত্র অবস্থায় আমরা দর্শককে প্রাণপণে ফর্ম সম্পর্কে নানা কথা বোঝানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু এখন কেউ প্রদর্শনী দেখতে এলে তাকে আমি বোঝাই না। তার মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হলো সেটা আমি বোঝার চেষ্টা করি। আর্ট ক্রিটিসিজম বলতে যে জিনিসটি বোঝায় সেটি আমাদের দেশে এখনো গ্রো-আপ করেনি। এখনো আমাদের দেশে আর্ট অ্যাপ্রিসিয়েশন হচ্ছে। পত্রিকায় রিপোর্টিংয়ের মতো একটি রিপোর্টাজ হচ্ছে। কেউ যদি আমার কাজ দেখে কঠোরভাবে সমালোচনা করে তাহলে কিন্তু আমি উপকৃত হব। একদিকে প্যাট্রোনাইজিং হচ্ছে, আবার যাকে তুমি দেখতে পারো না তাকে নিন্দা করছ।
বাংলাদেশের আর্ট বিকশিত করতে চাইলে সরকারের একটি প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের মতো গরিব দেশে বিনোদনের অভাব। এ অভাবের কারণেই তরুণ সমাজ বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায় যদি একটি আর্ট গ্যালারি থাকত তাহলে ছোটবেলা থেকে বাচ্চারা আর্টের সঙ্গে সংযোগ অনুভব করতে পারত। আর্ট তো আমাদের দেশে একটি অভিনব জিনিস। সরকারের তো প্রচুর পরিত্যক্ত সম্পত্তি আছে, সেখানে হতে পারে অথবা শিল্পকলা একাডেমির একটি ঘরে হতে পারে। নিয়ম করতে হবে, এতে ছবি যারা দান করবে সেটা হবে ইনকাম ট্যাক্স ফ্রি। এখানে শিল্পীদের একটি রেয়াত দিতে হবে। তাহলে আর্টিস্টরা বেনিফিটেড হবে। আজ শিল্পীদের কম্প্রোমাইজ করতে হচ্ছে, বিত্তবানদের মনোরঞ্জনের জন্য তার ড্রয়িং রুম-বেড রুমের পর্দা ও কার্পেটের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ছবি আঁকতে হচ্ছে। এর থেকে তারা মুক্তি পেত।
আমাদের নাটক, চলচ্চিত্র, উপন্যাস, গল্পে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে পেইন্টিংয়ে তার কতটা এসেছে? জিরো জিরো ওয়ান পার্সেন্ট। এত বড় ভাষা আন্দোলনের কাজ কোথায়। ’৫২ সালে আমি একটি লিনোকাট করেছি, আমিনুল ইসলাম একটি করেছেন। তারপর আর কোথায়? এগুলোর প্রতি আর্টিস্টদের আগ্রহ তৈরি হলো না কেন? আমি আগে বলতাম আর্টিস্টরা হলো পরগাছার মতো। পরগাছা শব্দটা শুনতে খুব খারাপ লাগে। এ জন্য আমি এখন বলি আর্টিস্টরা হলো অর্কিডের মতো। অর্কিডও কিন্তু এক ধরনের পরগাছা।
আপনার সাম্প্রতিক কাজগুলোর প্রসঙ্গে আসি। ডানা সিরিজ আঁকছেন আপনি এখন। এর মূল মেটাফোর প্রজাপতির ডানা। এটা কেন বেছে নিলেন?
শিল্পী হব এটি কিন্তু কোনো দিন আমার বাসনা ছিল না। আমার আর্ট ভালো লাগে। বাসায় প্রচুর আর্টের বই ছিল। আমি ছোটবেলা থেকে এগুলো দেখতাম। আমি তখন না জানতাম না। কিন্তু প্যারিসে যখন পিকাসো, মাতিস, ভ্যানগগের ছবিগুলো দেখলাম, আমার মনে হলো এ ছবিগুলো আমার চেনা। কারণ আমি ছোটবেলা থেকে ওগুলো দেখেছি। আর্ট শেখার জন্য কিন্তু আমি আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তি হইনি।
আমি কমিউনিস্ট পার্টির স্টুডেন্ট উইং ছাত্র ফেডারেশন করতাম। পার্টি থেকে আমাকে সেখানে সংগঠন গড়ে তোলার জন্য পাঠানো হয়। পার্টি তখন প্রকাশ্যে কাজ করতে পারছে না। ফার্স্ট ইয়ার পরীক্ষা দিয়েই আমাকে জেলে পাঠানো হলো। তখন হাজং, তেলেঙ্গানা, কাকদ্বীপে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়েছে ১৯৪৯-৫০-এ। সেখানে প্রচার করতে গিয়ে আমি গ্রেপ্তার হই। জেলে পাঁচ মাস ছিলাম বিচারাধীন বন্দী হিসেবে। আর্টিস্ট হব ভাবিনি। আর্টের প্রতি ভালোবাসা জন্মাল ফোর্থ ইয়ারে পড়ার সময়। আমি সব সময় মনে করতাম, এখনো মনে করি যে, এ সমাজের প্রতি আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে। ফলে অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টে আমি বিশ্বাসী নই। যখন আমার বন্ধুরা অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টে চলে গেল আমি কিন্তু মনে-প্রাণে নিতে পারিনি। কিন্তু নিজেকে আবার খুব ছোট মনে হচ্ছে। আমি বোধ হয় আধুনিক নই। কিন্তু আমি তো সমাজকে বিশ্বাস করি। এখানে আমার মধ্যে একটা টানাপোড়েন চলতে থাকল। তখন আইয়ুব খানের সময়। দেশে একটা দমবন্ধ অবস্থা। আমি উপলব্ধি করলাম, আর্থসামাজিক কারণে কোথায় যেন একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি হয়েছে। স্বামী স্ত্রীকে বোঝে না, বাবা ছেলেকে বোঝে না। সবকিছুই কিন্তু অর্থনৈতিক কারণে ঘটছে। আমি দেখলাম, কোথায় যেন একটা অদৃশ্য প্রাচীর গড়ে উঠেছে। তখন আমি ওয়াল সিরিজ শুরু করলাম। ওয়াল সিরিজ আমি এঁকেছি ৯২টা।
যুদ্ধের সময় সপরিবারে পালিয়ে গিয়েছি প্যারিসে। সেখানে বসে আঁকলাম এপিটাফ ফর দি মারটারস। ছবিতে দেখালাম যোদ্ধারা মাঠে পড়ে আছে, আমার মনে হলো এদের কথা কেউ বলবে না। সবাই তার পার্টির লোককে নাম ফলকে আনবে। বাংলাদেশে এত লোক মারা গেছে সবাই তো আর পার্টির লোক না। সাধারণ মানুষ। তখন এ সব অজানা-অচেনা শহীদদের উদ্দেশ্যে আমি ছবি আঁকা শুরু করলাম। পাথরের নুড়ি নিয়ে। কারণ প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন কোনো যোদ্ধা মারা যেতো তখন তার মাথার কাছে একটা পাথর রাখা হতো। পাথরটা কিন্তু তখন আর পাথর নয়। ওটা একটা সিম্বল, উন্মুক্ত আত্মার, এটাকে মেনহির বলে। এ সিরিজ ’৭৬ সাল পর্যন্ত আমি ৩৭টার মতো এঁকেছিলাম। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় কিছু আঁকলাম। এরপরের মেজর সিরিজ উইং।
উইং শুরু করলাম ১৯৯৮ থেকে। দেখলাম মানুষের মধ্যে খুব হতাশা। মুক্তিযুদ্ধের পর মানুষ যে বাংলাদেশ চেয়েছিল সে বাংলাদেশ পায়নি। যুবক সমাজ ফ্রাস্ট্রেটেড। পত্রিকা খুললেই হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই। তখন আমার মনে হলো, জীবনের জয়গান গাইতে হবে। একজন মার্ক্সিস্ট শিল্পী হিসেবে। শুধু দুঃখের ছবি আঁকলে তো মানুষ হতাশ হয়ে যাবে। এর পরের পর্বটা সম্পর্কে তো মানুষকে জানাতে হবে। আমি তখন দেখলাম প্রজাপতি জীবনের একটা স্পন্দন, লাইফ। যা স্ট্যাগনেন্ট নয়। এখানে বসছে-উড়ছে, ওখানে বসছে। তখন আমার মাথায় এল প্রজাপতির অংশ আকার কথা। ভাইব্রেশন অফ লাইন, জীবনের স্পন্দন, জীবন যে সুন্দর, বিচ্ছুরিত হচ্ছে জীবনের জয়গান এটিকে চিত্রায়িত করতে চাইলাম। আজ পর্যন্ত এঁকেছি ৯২টি। আমার মনে হয় ১১৫-১২০ পর্যন্ত যাবে। এর পর আমি যেটা আঁকার পরিকল্পনা করছি সেটা হলো, ওয়ালেরই আরেকটি ইন্টারপ্রিটেশন।
ওয়াল সিরিজটার মধ্যে একটা গুমোট ভাব ছিল। দমবন্ধ অবস্থা ছিল। প্লাস্টার খসে গেছে, শেওলা ধরেছে, ইট বেরিয়ে এসেছে। এখন আমার তো বয়স হয়েছে। স্মৃতি কিন্তু খুব মিষ্টি, বেদনার হলেও কিন্তু মিষ্টি। আমি মাঝখানে মেমোরি বলে কিছু কাজ করেছিলাম। এখন রেমিনিসেন্ট বলে একটা সিরিজ করব। আমি ঢাকা, প্যারিস, ভেনিস, ফ্লোরেন্সে যে দেয়ালগুলো দেখেছি সেখান থেকে আঁকব। এর মধ্যে কিন্তু হতাশা নেই। একটা বেদনা-বিধুর কথা। যেমন দেয়ালগুলোতে অনেক লেখা ছিল নানা রঙের। তারপর সাদা রঙ দিয়ে সেটাকে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। জায়গায় জায়গায় রঙগুলো দেখা যাচ্ছে। এটা আঁকার প্ল্যান আছে। এটা আমি আঁকব উইংটা শেষ করার পর। ফিগারেটিভ কাজও আমি করব। ইস্ট-ওয়েস্টের যে মেলবন্ধন আমি করতে চেয়েছিলাম এটি পরিপূর্ণ হয়নি। একটি প্রদর্শনী আমার সব ফিগারেটিভ কাজ দিয়ে করতে চাই। বাংলাদেশের যে কোনো অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টিস্ট এটা হয়তো করতে সাহস পাবে না। অবশ্য এ জন্য সুস্বাস্থ্য দরকার, আয়ু দরকার। সুস্বাস্থ্য আমার হাতে, কোনো অনিয়ম আমি করি না। কিন্তু আয়ু তো আমার হাতে নেই। আমি কী করব?