গণমুখী কর্নেল ও সিভিলিয়ান : অ্যাঙ্গাস হিউম

করোনাকালে আধো লকডাউনে পুরনো কাগজপত্র বাতিল করার কর্মসূচি আরও কারও কারও মতো আমিও নিয়েছি। আমার সাফল্য যৎসামান্য। কোনো কোনো পুরনো কাগজ ফেলে দিয়ে আবার তুলে এনেছি। এমনি করে তুলে আনা ২০০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরের লন্ডন টাইমসের অবিচুয়ারি কলামটির দিকে চোখ যায় পাতলা শরীরের একজন সেনা কর্মকর্তা, তার পাশে আরবীয় পোশাক পরা আরও চারজন। আরবীয় পোশাকধারীদের দেখে সবার আগে লরেন্স অব অ্যারাবিয়ার কথা এবং সৈনিকের দিকে তাকিয়ে অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই’র অ্যালেক গিনেসের কথা মনে হলো। একই পাতায় আরও একটি অবিচুয়ারি-ইংল্যান্ডের ডাকসাইটে বিচারকদের একজন স্যার রিচার্ড ওয়েকার্লে আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকে প্রয়াত হয়েছেন। কয়েকটি খুন ও অপহরণ মামলায় তিনি সাজা দিয়েছেন, তিনি গ্রেস ইন-এ তরুণদের প্রিয় শিক্ষকও ছিলেন।

অ্যাঙ্গাস হিউমের অবিচুয়ারির টেক্সটের ভেতর বেঙ্গল ও বাংলাদেশ শব্দ দুটি দেখে চোখ বড় হয়ে উঠল এবং দেখলাম বাংলার চরম দুর্দিনের দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন মন্বন্তর সামাল দিতে তিনি ত্রাণ কর্মকর্তা হিসেবে এখানে কাজ করেছেন। তিনি মূলত সৈনিক এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে তখনো সক্রিয় সেনা অফিসার। কবছর পর ১৯৫১ সালে পাকিস্তান সরকার তাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার পদে নিয়োগ দেয়। তিনি দুবছরে পার্বত্য জেলার জনগণের একজন হয়ে ওঠেন, তার জনসেবার কাহিনী ব্রিটেনেও পৌঁছে, ১৯৫৪ সালে রাজাসন গ্রহণের দ্বিতীয় বছরে রানী এলিজাবেথ তাকে অর্ডার অব ব্রিটিশ এম্পায়ার (ওবিই) খেতাবে সম্মানিত করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনিই শেষ ব্রিটিশ ডেপুটি কমিশনার। অ্যাঙ্গাস হিউমের ডেপুটি কমিশনার পদ গ্রহণের ৫২ বছর পর আমারও অপর একটি পুরনো জেলায় ডেপুটি কমিশনার ও ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করার সুযোগ পূর্বসূরিদের সম্পর্কে সংগত কারণেই আগ্রহী করে তোলে। বিশেষ জেলা হিসেবে তখনকার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতি আগ্রহ আরও বেশি হওয়ার কথা।

১৮৬০ সালের আগে এই পার্বত্য অঞ্চল প্রশাসনিকভাবে চট্টগ্রাম জেলারই একটি অংশ ছিল। ১৮৫৯ সালে কাপ্তাই খালসংলগ্ন একটি সেনা দুর্গ স্থানীয় অধিবাসীরা আক্রমণ করলে বিভাগীয় কমিশনার প্রস্তাব দিলেন চট্টগ্রামের জেলাপ্রধানের পক্ষে এত বড় অধিক্ষেত্র সামাল দেওয়া সম্ভব নয়, সুতরাং পার্বত্য অংশ নিয়ে একটি জেলা সৃষ্টি করা হোক। প্রস্তাব সরকারের অনুমোদন পেল এবং ক্যাপ্টেন ম্যাকগ্রাথ নতুন জেলার প্রথম সুপারিনটেনডেন্ট নিযুক্ত হলেন। ১৮৬০ থেকে ১৯৪৭-এ পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার আগ পর্যন্ত ৫৫ জন জেলা শাসক দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের মধ্যে মাত্র চারজন ভারতীয় আর সব ব্রিটিশ। জেলার সদর দপ্তর চন্দ্রঘোনাতে স্থাপিত হলেও ১৮৬৮ সালে রাঙ্গামাটিতে স্থায়ী সদর দপ্তর নির্মিত হয়। ১৮৯১ সালে ইংরেজরা লুসাই পাহাড়কে নিজেদের দাবি করলে জেলার গুরুত্ব কমে যায়। এলাকাটিকে জেলার মর্যাদা থেকে নামিয়ে একজন সহকারী কমিশনারের মাধ্যমে শাসনকাজ চালানো হয়। ১৯০০ সালে চিটাগাং হিল ট্রাক্টস রেগুলেশন জেলার মর্যাদা ফিরিয়ে আনে এবং বিশেষ জেলা হিসেবে একজন সুপারিনটেনডেন্টের অধীনে তিনটি মহকুমা-রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও রামগড় প্রতিষ্ঠা করে মহকুমা প্রশাসক বসানো হয়। ১৯৪৭ সালে সুপারিনটেনডেন্ট পদ অবলুপ্ত করে একে ডেপুটি কমিশনার করা হয়।

আমাদের আলোচ্য অ্যাঙ্গাস হিউমের আগে দুজন ব্রিটিশ ডেপুটি কমিশনার ছিলেন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল জি এল হাইড এবং মেজর এল এইচ নিবলেট। তার জন্ম প্রথম মহাযুদ্ধ শুরুর বছর ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯১৪ ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটনে। ফিউনারেল সার্ভিস নোটিসে দেখা যায় তিনি ২৮ আগস্ট ২০০৫ ব্রিস্টলে ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন আর ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৪ দুপুর ১টায় ওয়েস্টব্যারি অন ট্রিম-এর ক্রাওফোর্ড ক্রেমেটোরিয়ামে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তার বাবা রবার্ট হিউম ছিলেন হোয়াইট স্টার শিপিং লাইনের মাস্টার মেরিনার। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়া এসএস ব্রিটানিকের তিনি ছিলেন চিফ অফিসার। অ্যাঙ্গাস হিউম কিং এডওয়ার্ড সিক্স স্কুলের পাঠ শেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে ভূমি জরিপের ওপর প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন।

১৯৩৯-এ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরুতেই ২৫ বছর বয়সী অ্যাঙ্গাস হিউমকে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য ডাকা হলো; ১৯৪১ সালে তিনি সমারসেট লাইট ইন ইনফ্যান্ট্র্রি ব্রিগেডে কমিশনপ্রাপ্ত হন এবং নাইন্থ আর্মির সদস্য হিসেবে সিরিয়াতে যোগ দেন সেখানে দুই ডিভিশন ব্রিটিশ ও দুই ডিভিশন ভারতীয় সৈন্য মোতায়েন ছিল। পরবর্তী সময় এই বাহিনীকে পার্শিয়া অ্যান্ড ইরাক ফোর্স নাম দেওয়া হয়। তিনি রণাঙ্গনের যুদ্ধে অংশ না নিয়ে তরুণ ক্যাপ্টেন খাদ্য সংকট মোকাবিলা করার জন্য খাদ্যসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেন। তাকে সরাসরি মেজর জেনারেল স্যার এডওয়ার্ড স্পিয়ার্স-এর কাছে কাজের জবাবদিহি করতে হতো। এই খাবার একই সঙ্গে সেনাবাহিনী এবং প্রায় ৫০০ গ্রামের জনগণের জন্য রেশন হিসেবে বণ্টনের দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। এ সময় ‘টুডে অ্যান্ড টুমরো : এ স্টোরি অব মিডল ইস্ট’ নামের একটি চলচ্চিত্র তাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বাংলায় ভয়াবহ মন্বন্তর দেখা দেয়, যুদ্ধের শেষে পদোন্নতিপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল অ্যাঙ্গাস হিউমকে খাদ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়ে বাংলায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষকে খাদ্যের জোগান দিতে গিয়ে তিনি জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পান। ১৯৪৭ সালে তিনি সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দিয়ে সিভিলিয়ান পদে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। পাকিস্তান সরকার ১৯৫১ সালে তাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার ডেপুটি কমিশনার নিয়োগ করলে তিনি সেবামূলক কাজের একটি বৃহত্তর ক্ষেত্র পেয়ে যান। গাঙ্গেয় বদ্বীপের এই উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় তিনি হয়ে উঠলেন দেবতুল্য ব্যক্তিত্ব। ১৯৫১ সালে চাকমা রাজা নলিনাক্ষ্য রায় চট্টগ্রামে মৃত্যুবরণ করলে তিনি তার মরদেহ রাজকীয় মর্যাদায় রাঙ্গামাটিতে নিয়ে আসেন এবং শেষকৃত্যে সহায়তা করেন। ১৯৫২ সালে ত্রিদিব রায়কে রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করার গুরুদায়িত্ব তিনিই পালন করেন।

পরের বছর তিনি রাজা নলিনাক্ষ্যের কন্যা রাজকুমারী অমিতি রায়কে বিয়ে করেন। নতুন রাজা প্রাদেশিক সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে পার্বত্য বিধান ও ঐতিহ্য অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করতে পারছিলেন না। তিনি সরকারকে অনুরোধ করলে অবস্থার তেমন পরিবর্তন না হওয়ায় প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করলেন।

১৯৫৪ সালে অর্ডার অব ব্রিটিশ এম্পায়ার খেতাব পাওয়ার পরও ইংল্যান্ড তাকে টানেনি, তিনি রয়ে যান। ১৯৬৩ সালে রাজকুমারী অমিতি রায়ের সঙ্গে তার তালাক হয়ে গেলে তিনি রাজকুমারী মৈত্রেয়ীকে বিয়ে করেন। তিনি পাকিস্তান চা সংসদে যোগ দেন এবং টি প্ল্যান্টার হিসেবে সুনামও অর্জন করেন।

১৯৭১ পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন রাঙ্গামাটির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তিনি পার্বত্য জনগণের অনুরোধে তাদের সঙ্গে মিলে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং এলাকাটিতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে অনুরোধ করেন।

স্থানীয় জনগণ মনে করেন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ও যথাযথ দর-কষাকষির কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর হাতে লাঞ্ছনার ঘটনা অনেক কম, তারা এজন্য অ্যাঙ্গাস হিউমের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। তিনি না ঠেকালে গোলাবর্ষণে রাঙ্গামাটি বিধ্বস্ত হয়ে যেত। এর ভিন্ন ব্যাখ্যা করার সুযোগও রয়েছে। বলা যেতেই পারে যে, তার সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর যোগসাজশ ছিল। তার প্রথম স্ত্রীর ভাই রাজা ত্রিদিব রায় ১৯৭০-এর নির্বাচিত একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং তিনি পাকিস্তানের পক্ষ সমর্থন করে সেখানেই রয়ে যান।

ঢাকা থেকে ১৯৭৩ সালে তাকে অবাঞ্ছিত ব্যক্তি ঘোষণা করা হলে তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেন এবং বলেন, এ দেশের সঙ্গে তার আবেগময় সম্পৃক্ততা রয়েছে। কিন্তু সরকারের আদেশ বহাল থাকে। ১৯৭৩ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে যান এবং মধ্যপ্রাচ্যের অভিজ্ঞতা এবং আরবি ভাষায় দক্ষতার কারণে ওমানের সুলতানের অধীন গুরুত্বপূর্ণ চাকরি পান। ১৯৭৯ পর্যন্ত সেখানে কর্মরত থাকার পর ইংল্যান্ডে ফিরে যান।

অ্যাঙ্গাস হিউম একজন খ্যাতিমান ফটোগ্রাফার ছিলেন। ২০০৪ সালে কমনওয়েলথ মিউজিয়ামে তার তোলা ছবির প্রদর্শনী হয়। সে প্রদর্শনীর অনেকটা জুড়ে ছিল বাংলাদেশের পার্বত্য জীবন। গাই মাউন্টফোর্ডের লেখা ‘ভ্যানিশিং জঙ্গল’ গ্রন্থে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের আরণ্যক জীবন লিখতে তিনি সহায়তা করেন।

মৃত্যুর সময় তিনি তিন সন্তান রেখে যান। প্রথম বিবাহজাত দুই পুত্র এবং দ্বিতীয় বিয়ে থেকে এক কন্যা।

মেজর জেনারেল এস এস ওবানের ‘ফ্যান্টমস অব চিটাগাং’ গ্রন্থে ১৯৭১-এ রাঙ্গামাটি বিজয়ের কাহিনীর সঙ্গে রাজকুমারীকে বিয়ে করা যে টি প্ল্যান্টারের কথা বলা হয়েছে, তিনি অ্যাঙ্গাস হিউম। ষাটের দশকের শেষার্ধে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকারী পরবর্তী সময়ে সচিব ও বিনিয়োগ বোর্ডপ্রধান এম মোকাম্মেল হককে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হই অ্যাঙ্গাস হিউম আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তিনি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস মোহগ্রস্ততা নিয়ে পার্বত্য মানুষের সঙ্গে জীবন কাটিয়েছেন। তার সঙ্গে যাদের গভীর বন্ধুত্ব ছিল, তাদের একজন ফিরোজ কবীর বলে তিনি জানান। ফিরোজ কবীর বিখ্যাত লেখক ও ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের ভাই। আগামীর গবেষক বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় চাকরি করা বিদেশিদের নিয়ে অভিসন্দর্ভ রচনা করবেন এ প্রত্যাশা করতেই পারি।

লেখক

সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট