শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে নৃশংস হত্যাকান্ড

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে সাধারণত শিশুদের রাখা হয় সংশোধন করার উদ্দেশে। এসব কেন্দ্রে যারা কর্মরত তাদের দায়িত্ব শিশুদের নৈতিকভাবে সংশোধন করে স্বাভাবিক জীবনের উপযোগী করে গড়ে তোলা। তারা এসব শিশুর রক্ষক হিসেবেই বিবেচিত হন। কিন্তু এই রক্ষকরা যদি শিশুদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন না পূরণ করার অজুহাতে নির্যাতন করেন এবং সে নির্যাতনের ফলে শিশুদের মৃত্যু ঘটে, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো শিশুদের নিরাপদ হেফাজত। নিরাপত্তার বদলে যদি এগুলো নির্যাতনের আখড়া হয়ে ওঠে তাহলে এরচেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে। যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্যাতনে তিন শিশুর মৃত্যু এবং বেশ কয়েকজনের আহত হওয়ার ঘটনা আশঙ্কার উদ্রেক ঘটিয়েছে। 

প্রথমে বলা হয়েছিল কিশোরদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় তিন কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। পরে গণমাধ্যমের সংবাদে জানা যায়, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন কিশোরের মৃত্যু কিশোরদের দুপক্ষের সংঘর্ষে নয় বরং কেন্দ্রটির কর্মচারীদের মারধরের কারণে ঘটেছে। এ ঘটনায় যারা আহত হয়েছে তাদের জখমও সংঘর্ষজনিত নয়। হাসপাতালে ভর্তি করা আহত কিশোররা বলছে, কেন্দ্রের আনসার সদস্যরা তাদের ১৮ জনকে বেঁধে পেটানোর কারণেই হতাহতের ঘটনা ঘটে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে পেটানোর ঘটনা ঘটলেও হতাহত কিশোরদের হাসপাতালে নেওয়া হয় সন্ধ্যার দিকে। পুলিশ এ হাসপাতাল থেকেই কিশোরদের হতাহতের খবর পায়। উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে তাদের কিছুই জানানো হয়নি। কিশোরদের হতাহতের ঘটনায় কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক আবদুল্লাহ আল মাসুদকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। মূলত, একজন আনসার সদস্যের চুল কেটে না দেওয়ার ঘটনা নিয়ে কিশোরদের সঙ্গে বাগ্বিতন্ডার মাধ্যমে এ ঘটনার সূত্রপাত। জানা যায়, ওই সদস্যকে কেন্দ্রের কয়েকজন কিশোর প্রহার করলে কয়েকজন কর্মকর্তা পরিকল্পিতভাবে বেশ কয়েকজন কিশোরকে নির্যাতন করলে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী আইনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িত শিশু বা অভিভাবক কর্র্তৃক পাঠানো শিশুদের উন্নয়ন ও স্বাভাবিক জীবনে একীভূত করার লক্ষ্যে শিশু (কিশোর/কিশোরী) উন্নয়ন কেন্দ্র পরিচালিত হয়। উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে স্বীকৃত পদ্ধতিতে আইনের সংস্পর্শে আসা শিশু ও অভিভাবক কর্র্তৃক পাঠানো শিশুদের কেইস ওয়ার্ক, গাইডেন্স, কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মানসিকতার উন্নয়ন, ডাইভারশন ইত্যাদি স্বীকৃত পদ্ধতিতে রক্ষণাবেক্ষণ, ভরণ-পোষণ, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন করে কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে সমাজে পুনর্বাসিত/আদালতের  নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিশোরদের জন্য এই কেন্দ্রগুলোর একটি যশোর শহরতলি পুলেরহাটে আর অপরটি গাজীপুরের টঙ্গীতে। এছাড়া গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে কিশোরীদের জন্য একটি কেন্দ্র রয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর এই কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রক। এগুলোর মধ্যে যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে প্রায়ই নানা অঘটন ঘটে থাকে বলে গণমাধ্যমে খবর আসে। লাশ উদ্ধার, মারধরের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি শিশু ও কিশোরদের ঠিকমতো খাবার না দেওয়া ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে এটি সংশোধন কেন্দ্র না নির্যাতন কেন্দ্র? এর আগেও ২০১১ সালের ২৯ আগস্ট আকাশ (১২) নামে এক শিশুকে টিনের টুকরো দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। ২০১৯ সালের ৩০ জুন নূর ইসলাম (১৫) নামে এক শিশু আত্মহত্যা করে। ২০১৪ সালে ৫ মে কেন্দ্রে বন্দিদের সঙ্গে আনসার বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সময় নির্যাতিত কিশোররা কেন্দ্রে ভাঙচুর ও ভাঙা কাচ দিয়ে শরীর কেটে প্রতিবাদ জানায়। সব ঘটনারই তদন্ত কমিটি হলেও পরে তা ধামাচাপা পড়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলা, দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানটিতে অনিয়ম জেঁকে বসেছে। একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে চালানোর জন্য একগুচ্ছ সুপারিশও করেছিল। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেগুলোর বাস্তবায়নের খবর পাওয়া যায়নি।

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের এই নৃশংস ঘটনা দেশের শিশুদের নিরাপত্তাহীনতাকেই নির্দেশ করে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আইন এবং কঠোর শাস্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও দেশে শিশু নির্যাতন রোধ করা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত শিশু নির্যাতনকে সংবিধান পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে। করোনা দুর্যোগের এই বৈশ্বিক মহামারীকালেও থেমে নেই শিশু নির্যাতনের মতো নিষ্ঠুরতা। এমতাবস্থায়, দেশকে শিশুদের নিরাপদ আবাসভূমি হিসেবে গড়ে তুলতে ক্রমবর্ধমান শিশু নির্যাতন যেমন রোধ করতে হবে, তেমনি যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে নৃশংস ঘটনার জন্য দায়ীদের তদন্তের মাধ্যমে শাস্তি বিধান করতে হবে। এরকম নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি আমরা আর চাই না।