যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের শীর্ষ পর্যায়ের টিকিট পাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী এবং প্রথম এশীয়-আমেরিকান কমলা হ্যারিস। ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জো বাইডেন তার নির্বাচনী ‘রানিং মেট’ হিসেবে কমলা হ্যারিসকে বেছে নেওয়ার অর্থ হচ্ছে, দেশটির রাজনীতিতে এমন কিছু মূলগত পরিবর্তন হয়েছে যা কিনা আমেরিকানদের এখনই প্রয়োজন ছিল। ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর কমলা হ্যারিসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার রাজনৈতিক আবহটি তাই একবার খতিয়ে দেখা দরকার।
সম্প্রতি যুুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চালচিত্রটা কিছুটা বদলেছে। গড়পড়তা আমেরিকানদের মধ্যে এখন পদ্ধতিগত বর্ণবাদ এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা সম্পর্কে আগের চেয়ে বেশি খোলামেলা কথোপকথন হচ্ছে। ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন, বিশেষ করে জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকা- নিয়ে টানা বিক্ষোভ এবং ব্রেওনা টেলরের ঘটনায় ন্যায়বিচারের আহ্বান অনেক মার্কিনিকে পুলিশি ব্যবস্থা, ন্যায়বিচার এবং জাতিগত সাম্য সম্পর্কে আগের ধারণাগুলো পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে। এক দশকের বেশি আগে কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিনি আন্দোলনকর্মী টারানা বার্কের শুরু করা ‘মি টু’ আন্দোলন সাম্প্রতিককালে একটি জাতীয় মাত্রা পেয়েছে। ওই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সমাজের প্রান্তিক নারী ও কমবয়সী মেয়েদের ওপর যৌন হয়রানির দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করা। পরে শ্বেতাঙ্গ নারীরাও তাদের বিরুদ্ধে চালানো যৌন অসদাচরণ, হয়রানি আর সহিংসতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে ওই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা শুরু করেন। এর ওপর বৈশ্বিক করোনা মহামারী পরিস্থিতি এবং করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে জাতীয় নেতৃত্ব প্রদান করতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যর্থতাও দীর্ঘদিনের জাতিগত বৈষম্যকে তুলে ধরেছে। মাত্র কয়েক মাস আগেও বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়েছিল। বিশেষত, করোনাভাইরাস কালো নারীদের আঘাত করেছে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হারে। মহামারীজনিত মন্দা কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগকে নাজুক পরিস্থিতিতে ফেলেছে আর অর্থনৈতিক বৈষম্যকে করেছে প্রবলতর। এতেই শেষ নয়, করোনার কারণে ঘটেছে এশীয় বংশোদ্ভূত ও বিদেশিবিদ্বেষী হামলার অনেক ঘটনা।
সমাজ বহু আগে থেকেই নারীদের নৈতিক ক্রুসেডার হিসেবে দেখে আসছে যারা দুর্নীতিবাজ (পুরুষ) রাজনীতিকদের তৈরি করা জঞ্জালকে সর্বোত্তমভাবে পরিষ্কার করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের ভোটাধিকার পাওয়ার শততম বার্ষিকী উদযাপনের এই সময়ে নারীদের ভোট দেওয়ার পক্ষের ঐতিহাসিক যুক্তিগুলো খুবই চেনা লাগছে। লিঙ্গ বিষয়ে প্রচলিত গৎবাঁধা ধারণাগুলোর আলোকে মনে করা হয় (ভুলভাবে) নারীরা কম দুর্নীতিগ্রস্ত। তাই ট্রাম্প প্রশাসনের বিষয়ে দেশে প্রচলিত ধারণার আলোকে দেখলে বাইডেনের পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্টের জন্য নারী রাজনীতিক কমলা হ্যারিসকে বাছাই করা যৌক্তিক পছন্দই ছিল।
ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে কমলা হ্যারিসের নির্বাচন একজন নারী প্রেসিডেন্টের প্রতি আশাবাদেরও প্রতিফলন। তবে আমেরিকানরা প্রাইমারি (দীর্ঘ, প্রাথমিক প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া) চলাকালীন প্রসিডেন্টের পদে কমলা হ্যারিসসহ নারী প্রার্থীদের সমর্থন করেননি। এখনো কোনো নারী প্রেসিডেন্ট হননি যুক্তরাষ্ট্রে। কমলা হ্যারিস সম্পর্কে অনেক কিছুই বলার আছে। তবে যে নিয়ামক বিষয়গুলো আমাদের এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে তার দিকে আরও অনেক বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার। তার ঐতিহাসিক প্রার্থিতার বিষয়টি সঠিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করতে পারলে আমরা বুঝতে পারব এই বাছাইটি কেন প্রতীকীর পাশপাশি একইরকম তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতীকীভাবে, নারী সমাজ, অশ্বেতাঙ্গ বর্ণের বিভিন্ন সম্প্রদায়, অভিবাসী এবং অশ্বেতাঙ্গ নারীরা সবাই এই প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব দেখতে যাচ্ছেন।
সিনেটর কমলা হ্যারিসের আদি পরিচয়ের গল্পটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈচিত্র্যময় এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তনশীল জনমিতির প্রতিফলন ঘটেছে। ক্রমেই আরও বেশি করে বহু বর্ণ হয়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রে তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির ভবিষ্যতের মুখ। এশীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের মানুষেরা তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে বেশ কিছুদিন ধরেই নিজেদের মুখ দেখার বিষয়ে আলোচনা করে আসছিলেন। দীর্ঘকাল ডেমোক্রেটিক পার্টির মেরুদন্ডের ভূমিকা পালন করে আসা কৃষ্ণাঙ্গ নারীদেরও প্রতিনিধিত্ব করেন কমলা হ্যারিস। এই গোষ্ঠীটি ডেমোক্রেটিক দলকে তাদের নীতিগত প্রয়োজনের প্রতি আরও সংবেদনশীল হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছে।
রাজনীতিতে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে চাওয়া ‘হাইয়ার হাইটস ফর আমেরিকা’ এবং কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের ‘ব্ল্যাক উইমেন’স পিএসি-র মতো সংগঠনগুলো কালো নারী ভোটারদের অবিচল সমর্থন ও দলের জন্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ডেমোক্রেটদের ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে একজন কৃষ্ণকায় নারীকে বেছে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। ‘ব্ল্যাকউইমেনলিড’ হ্যাশট্যাগটি ছিল কালো নারী ভোটার এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের ক্ষমতার এক ভাইরাল স্মারক। একজন সম্ভাব্য কৃষ্ণাঙ্গ নারী ভাইস প্রেসিডেন্টের মনোনয়নের পক্ষে এই ব্যাপক সমর্থন সেই গোষ্ঠীর সাংগঠনিক তৎপরতা ও বছরের পর বছরের প্রচার-প্রচারণারই ফলাফল। সুতরাং কমলা হ্যারিস এই রাজনৈতিক ক্ষণের একেবারে সঠিক পছন্দ।
প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সরোরিটি ‘আলফা কাপা আলফা সরোরিটি এবং কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়গুলোকে শক্তিশালী করার স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ দি লিংকস, ইনকরপোরেটেড-এর মতো কৃষ্ণাঙ্গ সংগঠনগুলোর সদস্য কমলা হ্যারিস। সেই অবস্থানে থেকে নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের কালো মানুষদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকারের সঙ্গেই যুক্ত করেছেন তিনি। কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের রাজনীতি সম্পর্কে আমার আসন্ন গবেষণায় কৃষ্ণাঙ্গদের জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক এজেন্ডা এবং তাদের সদস্যদের নাগরিক আন্দোলনের দক্ষতা বৃদ্ধি উভয়টিকে এগিয়ে নিতে এই সংগঠনগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরা হবে। কমলা হ্যারিস সম্ভবত তার সঙ্গে এই ধারাটি হোয়াইট হাউজে বয়ে নিয়ে যাবেন। তিনি কৃষ্ণাঙ্গ নারী কর্মীদেরও আনবেন।’ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে এ শ্রেণিটির প্রতিনিধিত্ব দীর্ঘদিন ধরেই পিছিয়ে আছে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এদের যথেষ্ট পরিমাণে প্রভাব থাকে। তাই এটি নিছক প্রতীকের চেয়েও বেশি কিছু। এ ধরনের মৌলিক পরিবর্তনই এখন আমেরিকানদের দরকার। এতদিন প্রান্তিক অবস্থায় ছিল, কেউ কণ্ঠ শুনতে পায়নি এমন সব গোষ্ঠীকেও তিনি আমাদের সামনে উঠিয়ে আনবেন। সিনেটর হিসেবে কমলা হ্যারিস মহামারীর সময় উচ্ছেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, কালো নারীদের মাতৃস্বাস্থ্য সেবা ইত্যাদি বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া তিনি কমবয়সী অভিবাসীদের (‘ড্রিমার’) নাগরিকত্বের উদ্যোগ নেন এবং অতি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য অ্যান্টি ট্রাস্ট সংক্রান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
এলিট কৃষ্ণাঙ্গ নারী রাজনীতিকরা যেসব নীতি দীর্ঘকাল ধরে সমর্থন করে এসেছেন এগুলো তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। রাজনীতিতে কৃষ্ণাঙ্গ নারী এবং লৈঙ্গিক চিত্র বিষয়ে আমার গবেষণায় দেখা গেছে, কালো নারীরা আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের পুরো আত্মপরিচয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট হন। আমরা কমলা হ্যারিসের মধ্যেও তা স্পষ্ট দেখতে পাই।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানার পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক
বিবিসি অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ