বোনের মর্মস্পর্শী স্মৃতিতে ফাহিম সালেহ

১৩ জুলাই তরুণ উদ্যোক্তা ফাহিম সালেহকে নিউ ইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। সেদিনের সেই ঘটনা এখনো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে স্বজনদের। বড় বোন রুবি অ্যাঞ্জেলা সালেহ ভাইয়ের স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন মিডিয়াম পত্রিকায়। অনুবাদ করেছেন আরফাতুন নাবিলা

ফাহিমের চলে যাওয়া

১৪ জুলাই, ২০২০। রাত ১০টা বেজে ৪৭ মিনিট। আমি আর আমার স্বামী শুয়ে ছিলাম। ঠিক তখনই আমার ফোন বেজে ওঠে। নিউ ইয়র্ক থেকে আমার খালা ফোন করেছেন। ফোন ধরতেই ভয়ার্ত কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘খুব খারাপ একটি খবর আছে।’ তিনি আরও কিছু বলতে গিয়েও বারবার আটকে যাচ্ছিলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম আমার পরিবারের কোনো সদস্যের খারাপ কিছু হয়েছে। আমার কাঁধ ততক্ষণে শক্ত হয়ে পুরো শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। বাবা-মা কারও কভিড হয়নি তো? আমি বারবার জিজ্ঞেস করছিলাম কী হয়েছে? ফোন স্পিকারে দিলাম যেন আমার স্বামীও শুনতে পারে। কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পর খালা বললেন, ‘ফাহিম আর আমাদের মাঝে নেই! ওকে খুন করা হয়েছে!’ তার কথা আমি বিশ্বাস করিনি। আমি চিৎকার করে বললাম, ‘এর মানে কী? কী বলছো এসব?’ খালার ফোন রেখে আমি আমার বোনকে (কাজিন) কল করলাম। ফোন ধরেই সে আমার নাম ধরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। জানাল, সে গোয়েন্দাদের সঙ্গে আছে। কথা বলতে পারবে না। শুধু এটুকু বলল, অনেক সময় ধরে আমরা ফাহিমের কোনো খোঁজ পাচ্ছিলাম না, এ কারণে অ্যাপার্টমেন্টে চেক করতে আসি। ফোনটা রাখার সঙ্গে সঙ্গে আমি মেঝেতে বসে পড়লাম। কোনোভাবেই খবরটি আমি বিশ্বাস করিনি। পুরো এলোমেলো অবস্থায় আমি বারবার বলছিলাম, এটা হতে পারে না! এটা হতে পারে না! আমার স্বামী আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ওরা কী বলল? আমি দেখলাম, সেও কাঁদছে। আমার ভাইয়ের এ খবর বিশ্বাস করা তার জন্যও কষ্টকর। আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না সে কাঁদছে কেন। কারণ ফাহিমের এ খবর মোটেও সত্যি নয়!

পরদিনই আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমি নিউ ইয়র্ক চলে গেলাম। ইন্টারনেট জগৎ জুড়ে শুধু আমার ভাইয়ের মৃত্যুর খবর। এক জায়গায় লেখা, ‘ম্যানহাটনের অ্যাপার্টমেন্টে সিইওর দ্বিখণ্ডিত দেহ উদ্ধার’। অন্য জায়গায় লেখা, ‘বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে কাটা মাথাবিহীন ও দ্বিখণ্ডিত দেহ উদ্ধার করেছে নিউ ইয়র্ক পুলিশ’। তারা সবাই যাকে নিয়ে লিখছে, সে আমার আদরের ছোট ভাই। আমার ফাহিম, যাকে আমার আট বছর বয়সে বাবা-মা হাসপাতাল থেকে একটি কমলা রঙের কম্বলে জড়িয়ে বাড়ি নিয়ে এসেছিল। দুজন একসঙ্গে যত বড় হচ্ছিলাম, ততই যেন আমি বোনের চেয়ে ফাহিমের মা হয়ে উঠছিলাম। যখন সে খাবার খেতে চাইত না, আমি তার পেছনে চামচে করে ভাত-মাংস নিয়ে দৌড়াতাম। আমি তাকে গোসল করে দিয়েছি, তার ডায়াপার বদলে দিয়েছি, প্রথমবার নাকের রক্তে যখন ওর হলুদ শার্ট ভিজে গেল আমি ভেবেছিলাম ওর সঙ্গে ভয়ানক কিছু হয়েছে। সে সময় ওর বয়স ৩, আমার ১১। আজ ঠিক ৩০ বছর পর আমি শুনছি আমার সেই আদরের ফাহিমকে মাথা আর পা আলাদা অবস্থায় একটি ময়লার ব্যাগে পাওয়া গেছে। কেউ একজন আমার ভাইয়ের শরীরকে টুকরো টুকরো করে একটা ময়লার ব্যাগে ভরে রেখেছে, যেন তার জীবন, তার শরীর, তার অস্তিত্বের কোনো মূল্যই নেই! ওর সব বন্ধু মেসেজ দেওয়া শুরু করেছে। সবাই শুরু করছে এই বলে, ‘আমি জানি না আমার কী বলা উচিত!’ আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাকে বলছিলাম, আমার ছোট্ট আদুরে মিষ্টি ভাইটার সঙ্গে কেউ কেন এমন করবে? আমার কাছে এখনো সব দুঃস্বপ্ন মনে হচ্ছে। যেন আমি ঘুম থেকে উঠে দেখব সব ঠিক হয়ে গেছে।

বাবা-মাকে প্রথম কয়েক দিন আমরা সবাই মিলে সামলানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি আর আমার বোন ফাহিমকে নিয়ে আলাদাভাবে অনেক কথা বলতাম। আমরা দুজনেই শুধু ভাবতাম, ও কি ভয় পেয়েছিল? ও কি ওর জীবনভিক্ষা চেয়েছিল? ও কি খুব কষ্ট পেয়েছিল? যদি কষ্ট পায়, কতটুকু পেয়েছিল? আমরা ভেবেছিলাম আমরা আসলে ওর সঙ্গে কী হয়েছিল তার সবটাই জানতে চাই, কিন্তু সত্যি বলতে আমরা জানতে চাই ও খুব বেশি ভয় পায়নি, ও বেশি ব্যথা পায়নি, ও খুব নীরবে আর শান্তিপূর্ণভাবে চলে গেছে। আমি আশা করতাম ওকে যদি আবার একবার জড়িয়ে ধরতে পারতাম, মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে আদর করে দিতে পারতাম অথবা সবকিছু ঠিক করে দিতে পারতাম।

প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর, আমি আমার কাজিন আর বোনের সঙ্গে বসেছিলাম আমাদের ঘরে। তখন ফিউনারেল হোম থেকে একজন ফোন দিয়ে বললেন, কভিড-১৯-এর কারণে আমরা যেহেতু যেতে পারব না, তাই ছবির মাধ্যমেই আমাদের ভাইয়ের দেহ শনাক্ত করতে হবে। বলতে বলতেই তার মেসেজ এলো। আমার কেমন যেন বমিভাব লাগছিল। আমরা তিনজন দোয়া পড়ছিলাম ছবিগুলো দেখার আগে। তারপরেই সামনে এলো আমার জীবনহীন আদুরে ছোট ভাইয়ের ছবি। আমার বোন আর্তনাদ করে কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলছিল, ‘এটা এখন সত্যি! এটা এখন সত্যি!’ আমি ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। ছবির দিকে তাকিয়ে আমরা আমাদের আদরের ভাইটিকে বলছিলাম, কীভাবে তোমার সঙ্গে এমনটি হলো বাবু? আমার চোখের পানি যেন বাঁধ মানছিল না। কম্পিউটারের স্ক্রিনে বারবার হাত বোলাচ্ছিলাম আমার আদরের ভাইটির মুখে। ওকে শুধু আমি একবার বলতে চাচ্ছিলাম, ‘আমি খুব সরি ফাহিম! খুব সরি! আমার আদুরে ছোট্ট ভাই! আমার অন্তর! আমি তোমাকে বাঁচাতে পারিনি!’ বাবা আমাদের কান্না শুনতে পেয়েছিলেন। তিনি দরজায় নক করে জানতে চাইলেন কী হয়েছে। আমরা দ্রুত কম্পিউটার বন্ধ করে দিলাম। চোখ মুখ মুছে বললাম, আমরা ঠিক আছি। আমরা তাকে কখনো বলিনি সেদিন ছবিতে আমরা কেমন ফাহিমকে দেখেছিলাম।

আদরের ফাহিম

আমাদের পরিবার বাংলাদেশি। সেখানে আমার বাবা ক্যানভাস বিক্রেতা হিসেবে কাজ করতেন। আমরা ছিলাম নিম্নমধ্যবিত্ত। ১৯৮৫ সালে, কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি সৌদি আরবে প্রফেসরশিপ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের তুলনায় আরও ভালো জীবন কাটানোর জন্য তিনি আমাদের তিন সদস্যের পরিবারকে সেখানে নিয়ে যান। ফাহিমের জন্ম হয় ১৯৮৬ সালে। সে ছিল ভীষণ দুরন্ত, উৎসুক, দারুণ উদ্যমে ভরা আর হাসিখুশি একটা ছেলে। খুব অল্প বয়স থেকেই প্রযুক্তির প্রতি তার আগ্রহ ছিল। যখনই তার হাতে কোনো খেলনা থাকত, সে আগে খুলে দেখত কীভাবে সেটা তৈরি করা হয়েছে। আমি যত বড় হচ্ছিলাম, তত আমার বাবা আমাদের লেখাপড়া নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। ১৯৯১ সালে আমার বয়স যখন ১২, ফাহিমের ৪, আর আমার ছোট বোন সবেমাত্র হয়েছে, তখন বাবা আমাদের নিয়ে আমেরিকা চলে এলেন।

আমরা লুইসিনিয়ায় স্থায়ী হলাম। সেখানে বাবা কম্পিউটার সায়েন্সে পিএইচডি করছিলেন, মা কাজ করতেন স্থানীয় একটি লন্ড্রোম্যাটে। আমাদের পাঁচ সদস্যের পরিবার চলত বাবার অল্প বৃত্তির টাকা, অন্যের কাপড় স্ত্রী করে তা থেকে আমার মায়ের আয়, আত্মীয়দের কাছ থেকে নেওয়া লোন দিয়ে। সেবার গ্রীষ্মে, প্রথমবারের মতো বেবি সিটিংয়ের কাজ করে আমি এক ডলার পেয়েছিলাম। অনেক দিন আমার শুধু পাঁচটি টি-শার্ট আর দুই জোড়া প্যান্ট ছিল। লুইসিনিয়ার এই বছরগুলোতে বাবা যে চাপ সহ্য করেছিলেন, তা আমাদের ছোট্ট দুটি বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টের প্রতিটি কোণে স্পষ্ট ছিল। নতুন বিয়ে করে শুধু স্ত্রী নিয়ে আসার বদলে তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন তিন সন্তানসহ স্ত্রীকে। আমার বাবা পরে বিলাপ করে বলতেন, এই বয়সে কেউ আমেরিকা আসে না। তিনি জানতেন, আমেরিকায় কোনো কিছু বিনামূল্যে মেলে না। এখানে প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক বছর লাগবে। বাবার দিনরাত পরিশ্রম দেখতে আমার আর ফাহিমের খুব কষ্ট হতো। আমরা চাইতাম নিজেরা সফল হয়ে তার কষ্ট কমাতে। ফাহিমের ১০ বছর বয়সে সে এলাকার দোকান থেকে চকলেট কিনে সেগুলো তার স্কুলে বন্ধুদের কাছে বিক্রি করত। এই খবরটি প্রচার হয়ে গেলে প্রিন্সিপাল সেটি বন্ধ করে দেন। কিছুদিন পর, বাবার কাছে জন্মদিনের অগ্রিম উপহার হিসেবে জুয়েলারি বানানোর সামগ্রী উপহার হিসেবে নিয়ে সেগুলো দিয়ে নেকলেস আর ব্রেসলেট বানিয়ে খেলার মাঠের সঙ্গীদের কাছে বিক্রি করা শুরু করে। এটি ছিল তার দ্বিতীয় ব্যবসা।

প্রযুক্তির প্রতি ফাহিমের ছিল অসীম আগ্রহ আর দক্ষতা। ইন্টারনেটের খোঁজ পাওয়ার পর সে তার দক্ষতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পায়। ১২ বছর বয়সে সে প্রথম ‘দ্য সালেহ ফ্যামিলি’ নামে একটি ওয়েবসাইট খোলে। আমার ছবির নিচে সে কী লিখেছিল সেটি আমার সঠিক মনে নেই বলে খুব আফসোস হয় এখন। কিছু কথা ঝাপসাভাবে মনে আসছে, যেমন ‘এই হচ্ছে আমার বড় বোন। সে খুব শান্ত প্রকৃতির কিন্তু যখন সে আমার কাছ থেকে রিমোট চুরি করে নেয়, তখন আমার ভালো লাগে না।’ ফাহিম দ্রুত বুঝতে পারে সে ইন্টারনেটে ওয়েবসাইট তৈরির মাধ্যমে অর্থ আয় করতে পারে। ১৯৯৯ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে সে তার প্রথম ওয়েবসাইটটি আপডেট করে। সাইটটার নাম ছিল ‘মাংকিডু : জোকস, প্র্যাংকস, ফেইক পুপ, ফার্ট স্প্রে অ্যান্ড মোর ফর টিন এজারস’। বাবা এসবের কিছুই জানতেন না। তিনি খুব অবাক হলেন যখন গুগল থেকে ফাহিম সালেহর নামে ৫০০ ডলারের প্রথম চেকটি আসল। ফাহিমের নিজ ভাবনায় এত অর্থ আয় করা নিয়ে তিনি সত্যিই তখন চিন্তিত ছিলেন। এরপর আমরা সবাই লুইসিনিয়া থেকে নিউ ইয়র্কের রচেস্টারে চলে আসি। আমার ভাইয়ের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক ছিল খুব সুন্দর। যদিও তারা একদমই আলাদা ছিল। যখন আমার বাবা খুব চিন্তা করতেন, তখন ফাহিম একদমই নিশ্চিন্ত থাকত। একমাত্র ফাহিমই ছিল যে বাবাকে শান্ত করতে পারত। আমার প্রোগ্রামার বাবাকে ফাহিম ওয়েবসাইটটি দেখিয়ে প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ নিয়ে বোঝাল যেগুলো সে তৈরি করতে চায়। আমাদের বাড়ির শেলফভর্তি শুধু কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের বই ছিল। ফাহিম প্রোগ্রামিং শেখার জন্য নিজে নিজে সেসব বই পড়ত। সে বাবাকে বলেছিল, ‘বাবা, আমার সাইটে টিনএজাররা আসে। আর সাইটে তাদের ব্রাউজিং গুগল এডসের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে আমি ডলার পাই।’ বাবা প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ জানলেও ইন্টারনেট বিষয়ে কিছু জানতেন না। ফাহিম তাকে বোঝায় চিন্তার কিছু নেই। বাবার কাছে সে নিজের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য অনুমতি চায়, কারণ সে জানত এখন থেকে সে নিয়মিত চেক পাবে। বাবা অবশ্য ১৩ বছরের ছেলের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করতে চিন্তায় থাকলেও বরাবরের মতোই ফাহিম বাবাকে রাজি করিয়ে ফেলে।

যখন থেকে সে ইন্টারনেট হাতে পেয়েছে, তখন থেকে সে কাজে এতটাই ডুবে থাকত যে পরদিন সকালে যখন সূর্য উঠত, তখন সে বুঝতে পারত সে আগের দিনের দুপুর বা রাতের খাবার খায়নি। ফাহিমের এই অভ্যাসে বাবা খুব রেগে যেতেন। বাবা বুঝতে পেরেছিলেন খাওয়ার বিষয়টি ফাহিমের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। ফাহিম যতক্ষণ বাসায় থাকত, ততক্ষণ বাবা নিশ্চিত করতেন কাজের সময়েও ফাহিম যাতে ঠিকমতো খাবার খায়। ফাহিম যেদিন শেষ বাড়ি আসে সেদিনও ওর জন্য আমি আর আমার বোন মিলে সারপ্রাইজ স্যান্ডউইচ বানিয়েছিলাম। ফ্রিজেই রাখা ছিল সেটা। বাবার সঙ্গে খাওয়া শেষে বর্তমান প্রজেক্ট নিয়ে সে আলোচনা করছিল। সে যখন কথা বলে তখন তার চোখগুলো যেন চকচক করে। আমি বরাবর ফাহিমের সেই উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত চোখ আর লম্বা আইল্যাশ দেখে ঈর্ষা করতাম। ফাহিম যখন বাড়িতে থাকত না, বাবা সব সময় ওকে নিয়ে ভাবতেন। ফাহিম ঠিকমতো খাচ্ছে কি না এই চিন্তাই সর্বক্ষণ থাকত তার। যেদিন ফাহিমের দাফন হয়, সেদিন বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার ফ্যামি (ফাহিম) কী খাবে সেটা নিয়ে আমি আর কোনো দিন চিন্তা করতে পারব না। এখন আমি কীভাবে বাঁচব?’ আমার কাছে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই আর কখনো উত্তর আসবে না।

কয়েক বছর আগে বাবাকে যখন কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় জোর করে কাজ থেকে বিরতি দেওয়া হয়, তখন বাবা-মা যেন নিজের খেয়াল রাখতে পারে সেজন্য ফাহিম নিয়মিত প্রতি মাসে তাদের চেক পাঠাত। এর আগে সে মায়ের জন্য প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট টাকার ফান্ড করে দিয়েছে, যেখান থেকে মা ইচ্ছামতো খরচ করতে পারে। আমরা বাইরে গেলে কখনোই বাবাকে বিল দিতে দিইনি। যখন আমি কাজ করতাম আর ফাহিম কলেজে ছিল, তখন খরচ আমি করতাম। কিন্তু ২০০৯ সালে কলেজ ছাড়ার পর থেকে ট্রিট দেওয়ার দায়িত্ব সে নেয়। বাইরে খেতে গেলে বাবা সব সময় লুইসিনিয়ায় আমরা প্রতি সপ্তাহে শনিবার কেবল ডমইনোর ৩.৯৯ ডলারের একটা পিজ্জা খেতে পারতাম সে স্মৃতি মনে করতেন। প্রতি শনিবার, বাবার নীল রঙের সেকেন্ড-হ্যান্ড ভক্সওয়াগনে বসে আমরা সেই বড় সাইজের পিজ্জা আর সোডার বোতল শেয়ার করে খেতাম। আমাদের পুরো সপ্তাহের সেটাই ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

২০০৩ সালে, মাত্র ১৭ বছর বয়সে, ফাহিমের সঙ্গে ইন্টারনেটে ‘কে’-এর পরিচয় হয়। কে এসেছিল ওহিও থেকে। সে ফাহিমের ব্যবসার সবচেয়ে দীর্ঘতম ব্যবসায়িক সঙ্গী এবং বন্ধু হয়ে ওঠে। তারা দুজনে মিলে ‘উইজটেন’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করে, অ্যাভাটর বা ডলজের ডিজাইনসহ আরও মেসেঞ্জার সার্ভিস নিয়ে কাজ করে। তাদের দুজনের আয়ে ফাহিম অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে হাই স্কুলে থাকতেই। বেন্টলে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়েই তার কাছে প্রচুর অর্থ ছিল। বাবার কাঁধের থেকে বোঝা কমানোর জন্য সে তার লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছিল। ২০০৯ সালে ফাহিমের গ্র্যাজুয়েশন যখন শেষ হয়, তখন জব মার্কেট বেশ ক্ষতির মধ্যে ছিল। উইজটেনও খুব একটা লাভ করতে পারছিল না। ৫০ হাজার ডলারের আইটির চাকরির অফার বাতিল করে ফাহিম আমাদের বাবা-মায়ের বাড়ির বেজমেন্টে বসে পরবর্তী পণ্য নিয়ে ভাবা শুরু করে। তত দিনে প্র্যাংক ডায়াল আমার ভাইয়ের সবচেয়ে বড় শখ হয়ে উঠেছে। প্র্যাংক আর সারপ্রাইজ দেওয়া ছিল ফাহিমের ব্যক্তিত্বের অন্যতম একটি অংশ তা সে বাড়িতে থাকুক আর না থাকুক। আমরা সব সময় জানতাম সে কোনো না কোনোভাবে আমাদের বাসার কোনো কোনায় আছে। ২০১৮ সালে, নাইজেরিয়ায় কাজ করার সময়, সে পাঁচ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে নিউ ইয়র্কে আসে মা দিবসে মায়ের হাতে ফুল তুলে দিতে। শেষবার বছরখানেক আগে আমি যখন ফাহিমকে দেখেছিলাম, তখন সে তার ভাগ্নিকে প্রথমবার দেখার জন্য সারপ্রাইজ প্ল্যান সাজিয়ে চলে এসেছিল। ফাহিমের মস্তিষ্ক ছোট-বড় যেকোনো আইডিয়া নিয়ে জাদুর মতো কাজ করত। দেশীয়, স্থানীয়, বৈশ্বিক সবকিছু নিয়ে ভাবত সে। আপনি

হয়তো বুঝতেও পারবেন না সামনে তার পরিকল্পনা কী অথচ সে দ্রুত সেটা করে ফেলবে। সে কখনো চুপচাপ বসে থাকত না। ভাবনাকে বাস্তবে দেখার আগ্রহ তাকে খুব উজ্জীবিত করত। ৩৩ বছর বয়সে জোকস আর প্র্যাংকস বাদ দিয়ে ব্যবসা নিয়ে সে খুব পরিণতভাবে ভাবতে শুরু করে। প্রযুক্তি দিয়ে কীভাবে বিশ্বকে বদলে দেওয়া যায়, বিশেষ করে দরিদ্রদের কীভাবে উন্নয়ন করা যায়, তা নিয়ে ভাবত। একদম শূন্য থেকে বড় হলেও ধনী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সে মিশত না। নাইজেরিয়ায় মোটরবাইক অ্যাপ গোকাডা নিয়ে সে বলত, এই ড্রাইভাররা আমার ওপর ভরসা করে। শুরুতে যেভাবে বাবার কষ্ট কমানোর জন্য সে কাজ শুরু করে, ঠিক সেভাবে পরে দরিদ্রদের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে সে।

ফাহিমের বিদায়

কয়েক বছর ধরে, ফাহিম যে শুধু প্রফেশনালি পরিণত হয়েছিল, তাই নয়, ব্যক্তিগতভাবেও সে বেশ গোছানো হতে শুরু করেছিল। নতুন বাসা সাজানো নিয়ে খুব উচ্ছ্বসিত ছিল। রান্না, অন্যান্য কাজ, তিন বছরের কুকুর লায়লা সবকিছুর প্রতি ফাহিমের প্যাশন ছিল অন্যরকম। ভবিষ্যৎ নিয়ে ওর অনেক পরিকল্পনা ছিল। সব ছাপিয়ে ১৯ জুলাই, রবিবার আমার আদরের ভাইকে আমরা হাডসন ভ্যালেতে দাফন করি। আমাকে আমার ভাইয়ের দাফনকাজের আয়োজন করতে হয়েছে। দাফনের তিন দিন আগে ফিউনারেল হোম থেকে রিপোর্ট দিয়ে জানানো হয়, কোমরের সঙ্গে ফাহিমের পা আর ধড়ের সঙ্গে মাথা সেলাই করা সম্ভব হচ্ছে না। এ খবর শোনার পর, আমি চোখ বন্ধ করে দুই হাত আমার বুকের ওপর ফারাওয়ের মতো করে রেখে ফোনটাকে আরও জোরে চেপে ধরলাম। হাত মুঠো করে আমি অন্তরের কষ্টটা কমানোর চেষ্টা করছিলাম। আমি ফোনের অপর পাশে থাকা লোকটিকে শুধু অনুরোধ করলাম, ফাহিমের শরীরের অংশগুলো যেন শুধু ক্যাসকেটের মধ্যে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা হয়। দাফনের আগের দিন তিনি আমাকে আবার ফোন করে জানালেন কাজটি সহজ নয়। তবে তাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব তারা করবেন। দাফনের দিন সকালে আমার বোনের বিছানায় ভোর ৩টা পর্যন্ত অনুভূতিহীন আমি শুয়ে ছিলাম। ফাহিমের রুম থেকে আমার বাবা-মায়ের কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।

দিনটা শুরু হলো খুব গরম আবহাওয়া নিয়ে। মাঠের সবুজ গাছগুলোর পাতা বাতাসে নড়ছিল। আমরা সবাই তাকিয়ে ছিলাম ফাহিমের ক্যাসকেটের দিকে। দেখে মনে হচ্ছিল সে কত আরামে ঘুমাচ্ছে। ওর শরীর ঢাকা ছিল সাদা কাপড়ে, ধড়ের জায়গায় রাখা ছিল আইস প্যাক, চিকন আর লম্বা সুন্দর আইল্যাশগুলো কী সুন্দর দেখাচ্ছিল। চুলগুলো সব সময়ের মতো স্পাইক করা ছিল না, মনে হচ্ছিল আঁচড়ে কপালের সঙ্গে মিশিয়ে রাখা। রোদের আলোয় কী চকচক করছিল চুলগুলো! বাবা ক্যাসকেটের কাছে গিয়ে সব সময়ের মতো ফাহিমকে ডাকতে লাগলেন। বিলাপ করে কান্না শুরুর আগে ধীরকণ্ঠে বললেন, ‘ফাহিম সালেহ, আমি তোমাকে বলেছি না চুল শুকনো রাখতে? বলিনি তোমাকে? মা শুধু বারবার বলছিলেন, ‘ঘুমাও বাবু। তুমি এখন আরাম করো।’ কবরস্থানের লোকরা আমার ভাইয়ের ক্যাসকেট মাটিতে নামানোর সময় বাবা শুধু চিৎকার করে বলছিলেন, ‘ফাহিম, যেও না! ফাহিম, ফাহিম, ফাহিম, ফাহিম...!’

আজ থেকে এক মাস আগে, ১৩ জুলাই আমার ভাই নিজ অ্যাপার্টমেন্টে খুন হয়। মাঝে মাঝে বিশ্বাস হয় না যে ফাহিম নেই। কিন্তু যখন এই নিষ্ঠুর, জঘন্য আর অসহনীয় বাস্তবতাটা সামনে আসে, তখন চোখের সামনে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাই না। অসহ্য যন্ত্রণা হয়। ফাহিম ছিল আমাদের জন্য খোদার বিশেষ উপহার, আবার সেই উপহারকে নিয়েও নিয়েছেন তিনি। এখন বাবা সারা দিন সময় কাটান ফাহিমের কুকুর লায়লার সঙ্গে। ছেলের ভিডিও আর উন্নয়নের গল্পগুলো পড়েন। মা সারা দিন কাঁদেন। রাতে তিনি আর ঘুমাতে পারেন না। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের পরিবারের এবারের ছুটির দিনগুলো কাটানো খুব কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাহিম সব সময় গার্লিক ম্যাশড পটেটো রান্না করত, আমি আর আমার বোন মিলে ম্যাক আর চিজ বানাতাম। এ বছর থেকে আর কখনো ফাহিম থাকবে না। বাবা-মায়ের রান্নাঘরের দরজা পেরিয়ে ছেলেটা আসবে না, ঠা-ায় বসে থাকবে না, মেঝেতে ওর জ্যাকেট আর ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলবে না, রান্নাঘরে ওর জায়গা দখল করবে না, পরিবারকে ঘিরে থাকবে না, ফোন ঘেঁটে আর কখনো গার্লিক ম্যাশড পটেটোর রেসিপি খুঁজে বের করবে না। ফাহিম আর নেই, কখনো ফিরবে না।