একান্ত সাক্ষাৎকারে সিসিসি প্রশাসক

সময় অল্প তবুও স্বপ্নপূরণের কাছাকাছি যেতে চাই : সুজন

‘সময় স্বল্প, অথচ স্বপ্ন অনেক। তবুও স্বপ্নপূরণের কাছাকাছি যেতে চাই। এ শহরকে সুন্দর করে সাজাতে চাই। প্রাচ্যের সৌন্দর্য রানী চট্টগ্রামকে দেশ-বিদেশের সবার মনের মতো আকর্ষণীয় পর্যটন নগরী হিসেবে গড়তে চাই।’

দেশ রূপান্তরের সঙ্গে একান্ত আলোচনায় এসব মনোবাঞ্ছার কথা প্রকাশ করলেন ১৮০ দিনের জন্য মনোনীত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসক ও মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন। নগরীর দক্ষিণ কাট্টলীর বাসভবনে গতকাল সকালে দেওয়া এ সাক্ষাৎকারে সুজন বলেন, প্রশাসকের দায়িত্বের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। নেত্রী শেখ হাসিনা (আওয়ামী লীগ সভাপতি) ভালোবেসে আমায় এ দায়িত্ব দিয়েছেন। আমার ওপর পরিপূর্ণ আস্থা রেখেছেন। এ আমার সৌভাগ্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা আমার প্রতি যে অবস্থায় দায়িত্ব প্রদান করেছেন আমি তার পূর্ণ মর্যাদা ও দায়িত্ব শেষ করতে চাই। এজন্য নগর প্রশাসক হিসেবে এ খ-কালীন সময়ে আমি সরকার ও নগরবাসীর আন্তরিক সহযোগিতা চাই।

১৯৭০ সাল থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকে এবং সাবেক মেয়র ও চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সভাপতি প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর তিন যুগের সহযোগী হিসেবে পরিচিত খোরশেদ আলম সুজন বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ও চট্টগ্রামের উন্নয়ন-সংগ্রামের আন্দোলনে মহিউদ্দিন চৌধুরী তুলনারহিত। চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে তুলে নিয়েছেন। আজ আমি ছোট একটি সুযোগ পেয়েছি এ দুজনের স্বপ্ন আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের। যদিও সময় কম, কিন্তু আমার চেষ্টার ত্রুটি থাকবে না। এ শহরকে আমি মানবিক বাসযোগ্য করে যেতে চাই।

প্রশাসক সুজন বলেন, আমি খুবই পজিটিভ। নগরবাসীকে জুলুম করা যাবে না। এ নগরীকে অনেক কিছু দেওয়ার আছে। একইভাবে নগরবাসীরও করপোরেশনের কাছে অনেক কিছু পাওয়ার আছে।

নগরবাসীকে দেওয়ার ক্ষেত্রে সিসিসির বর্তমান আর্থিক সামর্থ্য কেমন এর উত্তরে গত ৬ আগস্ট নগর প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত খোরশেদ আলম সুজন বলেন, দায়িত্ব নিয়ে দেখলাম করপোরেশনের ঘাড়ে এখন ৮৫০ কোটি কোটি টাকা দেনার দায়। ঠিকাদারদের পাওনা কোটি কোটি টাকা। তাছাড়া করপোরেশনের বিদায়ী (অবসরকালীন) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাওনার পরিমাণ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।

এত টাকা কীভাবে শোধ করবেন? তার জবাবে নবনিযুক্ত প্রশাসক বলেন, আমি পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ঋণমুক্তির জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দিয়েছি। ৪০০ কোটি টাকার জরুরি তহবিল জোগান দিতে অনুরোধ করেছি। গত ১২ আগস্ট প্রেরিত ওই চিঠিতে সিসিসির সার্বিক আর্থিক অবস্থা ও জরুরি উন্নয়ন পরিকল্পনা জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখিত চিঠিতে উল্লিখিত ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

১৮০ দিনে নগরবাসীর সেবার মানোন্নয়নে প্রশাসক হিসেবে কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন জানতে চাইলে মাঠপর্যায়ের এ নেতা সুনির্দিষ্ট করে তিনটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করেন। এক. বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন, দুই. নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতিদের পরামর্শক্রমে নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও তিন. বাস্তবায়ন এবং সড়ক সংস্কার ও উন্নয়ন।

এ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রশাসক সুজন বলেন, নগরীর রাস্তাঘাটগুলো এখন ভাঙাচোরা, ঘর থেকে বের হলেই মানুষ হোঁচট খায়। আমি ভাঙা সড়ক মেরামত ও সংস্কার করে মসৃণ করব। যাতে জন ও যান চলাচল নিরাপদ এবং গতিশীল হয়। প্রত্যেক সড়ক মোড়, আইল্যান্ড সুশোভিত করব।

বর্তমানে ১৩টি গ্রুপ (ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান) সড়ক সংস্কারের কাজে নিয়োজিত রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, পোর্ট কানেক্টিং রোডসহ জনদুর্ভোগ নিরসনে সব সড়কের উন্নয়ন দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটিয়ে যান চলাচল সহজ করা হবে এবং ফুটপাতমুক্ত করে তা জনগণের হাঁটাচলার উপযোগী করা হবে।

তাছাড়া পর্যটন কেন্দ্র ফয়’স লেকে কেব্ল কার স্থাপন এবং বোটানিক্যাল গার্ডেন নির্মাণ করা হবে। সেই সঙ্গে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় পর্যটকদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত কয়েকটি আধুনিক শৌচাগার নির্মাণ করা হবে। আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যেই নগরবাসীর চোখে এসব কাজ দৃশ্যমান হবে এ আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রশাসক সুজন বলেন, আমি খুব ইতিবাচক চিন্তার মানুষ। সেই চিন্তা ও মনস্কতা থেকে এ শহরকে আমি মানবিক বাসযোগ্য করে তুলব।

নগরীর জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে নগর প্রশাসক সুজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইতিপূর্বে কর্ণফুলীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং কাজে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে। তাতে নগরবাসী জলাবদ্ধতায় নাকাল হয়েছে ও হচ্ছে। এখন সেনাবাহিনীর তদারকিতে জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ চলছে।

সাক্ষাৎকারে নতুন প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন সিসিসির আয়বর্ধনকল্পে দুটি বিষয়ে সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর ও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের মাধ্যমে সরকারের ৮৫% বার্ষিক রাজস্ব আয় হয়। সে ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কাস্টমস থেকে ৫% ট্যাক্স পাওয়া গেলে, নগরীতে যানবাহনের প্রবেশ নির্গমনে ৫% শুল্ক আরোপ করা হলে সিসিসিকে কখনই সরকারের মুখাপেক্ষী হতে হবে না। দাবিটি পূরণ হলে পাহাড়, নদী, সমুদ্র পরিবেষ্টিত চট্টগ্রামকে বিশ্বের অন্যতম সৌন্দর্য নগরী হিসেবে সাজানো খুবই সম্ভব বলে মনে করেন প্রশাসক সুজন।