বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রথম প্রশ্ন দাঁড়াল পাকিস্তানের কারাগার থেকে বাংলাদেশের জাতির জনকের মুক্তি। দেশের জনগণ একদিকে যেমন অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছে অন্যদিকে নিমজ্জিত হচ্ছে ভয়ানক শঙ্কায়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখবে তো!
প্রথম থেকে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের প্রধান কারাগার লায়ালপুর জেলে রাখা হয়েছিল। সেখানে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সামরিক আদালতে তার বিচার শুরু হয়। বিচারের রায় ছিল পূর্বনির্ধারিত। ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। বিচারটা ছিল প্রহসনের। তবুও অকুতোভয় ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আদালতে নিশ্চুপ বসে থাকতেন। বিচারের সপ্তম দিন তার পক্ষে নিয়োগ করা আইনজীবী জিজ্ঞেস করলেন মুজিব নিজের পক্ষে কোনো অবস্থান নিতে চান কি না। উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। আমাকে অথবা আমার জনগণকে বিচার করার কোনো অধিকার এদের নেই। আইনের দিক দিয়ে কোনো বৈধতা এই আদালতের নেই’ (আহমেদ সালিম, পাকিস্তানের কারাগারে শেখ মুজিবের বন্দীজীবন, (অনুবাদ : মফিদুল হক), ঢাকা, সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৮, পৃ. ৪৮)। বঙ্গবন্ধুর বিচার প্রসঙ্গে একসময় পশ্চিম পাকিস্তানের নানা পেশাজীবীরা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে থাকেন। পশ্চিম পাকিস্তানের লেখক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী, আইনজীবী, সাংবাদিক, ছাত্রনেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের একটি গোষ্ঠী শেখ মুজিবুর রহমানের আশুমুক্তি ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে ইয়াহিয়া খানের বরাবরে আবেদন করেছিলেন।
অবশেষে প্রহসনের বিচরের রায় দেওয়া হলো ৩ ডিসেম্বর। দোষী সাব্যস্ত করে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসির দন্ড দেওয়া হয়। এরপর তাকে লায়ালপুর কারাগার থেকে নিয়ে যাওয়া হয় পাঞ্জাবের মিয়ানওয়ালি জেলে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তার কারাকক্ষের পশে কবর খোঁড়া হয়েছিল। এর সমর্থন পাওয়া যায় আহমেদ সালিমের গ্রন্থে। তিনি লিখেন, ‘জেলের ডেপুটি সুপার ফজলদাদ একদিন ব্যারাকে এসে আটজন বন্দিকে বাছাই করলেন। এদের দিয়ে আট ফুট লম্বা, চার ফুট প্রশস্ত ও চার ফুট গভীর গর্ত খোঁড়া হলো। উপস্থিত সবাই বুঝতে পারলেন সেই রাতেই শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেওয়া হবে। ৯টার মধ্যে কবর খোঁড়া সম্পন্ন হলো। কিন্তু সেই রাতে কিছু ঘটল না। শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সেই রাতে জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করে শেখ মুজিবকে ফাঁসি না দেওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, যদি মুজিবকে ফাঁসি দেওয়া হয় তবে বাঙালির ক্রোধের লক্ষ্য হবে পূর্বাঞ্চলে মোতায়েন করা পাকবাহিনীর সর্বোচ্চ অফিসার থেকে সর্বনিম্ন সৈনিক পর্যন্ত সবাই। ভুট্টোর উপদেশ অনুসারে ইয়াহিয়া খান মুজিবের ফাঁসি স্থগিত রাখেন। কয়েকদিনের জন্য কবর ভরাট করা হয়। পনের দিন পর একইভাবে গর্ত খোঁড়ার হুকুম আসে। এবারও শেখ মুজিবের ফাঁসি দেওয়া হলো না। এমনি প্রক্রিয়া তিনবার ঘটেছিল এবং তিনবারই তার ফাঁসি পিছিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে পাকিস্তানের রাজনীতি জটিল রূপ নেয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পরাজয় ঘটল। বাংলাদেশ নামে নতুন রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করল। এজন্য ইয়াহিয়া খানকে দোষী সাব্যস্ত করে পাকিস্তানে প্রচন্ড বিক্ষোভ শুরু হয়। তখন ইয়াহিয়া খানের পদত্যাগ দাবিতে সোচ্চার গোটা পাকিস্তান। এটি অনেকটাই স্পষ্ট যে জুলফিককার আলী ভুট্টোর কু-পরামর্শের একটি বড় প্রভাব ছিল বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যায়। অর্থাৎ দমননীতির মাধ্যমে বাঙালির অধিকার আন্দোলনের দাবিকে অবদমিত করা। অথচ এই ভুট্টোই তখন ইয়াহিয়ার পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার। এই অবস্থায় ইয়াহিয়া খানের টেকা সম্ভব ছিল না। বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের তিন দিন পর একাত্তরের ১৯ ডিসেম্বর তিনি ভুট্টোর হাতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দিয়ে অন্তরালে চলে গেলেন।
ইয়াহিয়া খান পদত্যাগ করে ভুট্টোর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরও বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেওয়ার আশা ত্যাগ করেননি। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নিজ ভাষ্য থেকে একটি তথ্য পাওয়া যায়, ‘ভুট্টো আমাকে জানিয়েছিলেন, ইয়াহিয়া খান যখন তাকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চেয়েছিলেন তখন বলেছিলেন যে, মুজিবকে শুরুতে না মেরে তিনি মহাভুল করেছেন। তিনি আরও বলেছিলেন এখন আপনাকে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে অনুগ্রহ করে পেছনের তারিখ দিয়ে নির্দেশ জারি করে মুজিবকে মেরে ফেলার সুযোগ আমাকে দিন। কিন্তু ভুট্টো এতে সম্মত হননি’ (মোনায়েম সরকার ও আশফাক-উল-আলম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ঢাকা, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ : আগামী প্রকাশনী, ২০১৪, পৃ. ৩১৯-৩২০)।
সময়ের বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের চাপ অনুভব করলেন ভুট্টো। বুঝতে পারলেন বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়াই এখন জরুরি। পরবর্তী পদক্ষেপ খুব দ্রুত ঘটতে লাগল। ২৬ ডিসেম্বর একটি সামরিক হেলিকপ্টার এসে শেখ মুজিবকে রাওয়ালপিন্ডির বাইরে এক বাংলোয় নিয়ে যায়। ৮ জানুয়ারি ১৯৭২-এ আর্মি কমান্ডোদের প্রহরায় মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন। এই স্থানান্তরিত হওয়ার মধ্যে বঙ্গবন্ধু আঁচ করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে।
১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি একটি চমকপ্রদ খবর প্রকাশিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমে। ইউএসএ টুডে নেটওয়ার্কের ((USA Today Network))-এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ‘দেস মইনস রেজিস্টার’-এ (DES Moines Register) উইলিয়াম জে. কোহলিন লিখেন, ‘এই সপ্তাহেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিনা শর্তে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেতে যাচ্ছেন। রবিবার রাওয়ালপিন্ডিতে এ কথা প্রচারিত হয়। খুব শিগগিরই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো এ ব্যাপারে ঘোষণা দেবেন।’ বঙ্গবন্ধুর মুক্তির প্রশ্নে পাকিস্তানের জনমত যাচাইয়ের জন্য ভুট্টো ৩ জানুয়ারি করাচিতে এক জনসভার আয়োজন করেছিলেন। এদিন সন্ধ্যায় পাকিস্তান টেলিভিশনের নিউজ বুলেটিনে জানানো হয় করাচির জনসভায় শেখ মুজিবের মুক্তির পক্ষে জনগণ রায় দিয়েছে। এ সময় ইসলামাবাদের কাছে সোয়ান নদীর তীরে সিহালা শহরে সিহালা গেস্ট হাউজে বঙ্গবন্ধুকে রাখা হয়েছিল। পাকিস্তানের হরিপুর কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সহচর ড. কামালকে। এদিন তাকেও নিয়ে আসা হয় সিহালা গেস্ট হাউজে। নেতার সঙ্গে সাক্ষাতে এক আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়।
ইতিমধ্যে একটি কৌশল অবলম্বন করেছিলেন ভুট্টো। বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কী হবে সে প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ভুট্টোর একটি মিটিং হয়। এই দুই নেতার কথোপকথন তুলে ধরেছেন রবার্ট পেইন (Robert Payn, Massacre: The Tragedy at Bangla Desh and the Phenomenon of Mass Slughter Throughout History, New York, 1972)। এখানে তা উল্লেখ করা হলো। ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বললেন “প্রথমেই আমাদের এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে যে, আমাদের দুটি পৃথক জাতি হওয়া চলবে না। যেভাবেই হোক আমাদের সম্পর্ক অটুট রাখতে হবে। অবশ্য তা আগের মতো নয়, তবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান বলে চেনা যায় এমন একটি দেশ হিসেবে। আর যা হোক না কেন, আমাদের ধর্ম ও উদ্দেশ্য অভিন্ন। দেখুন শেখ সাহেব, সবকিছুর পরও আমরা এখনো এক জাতি। সেই সত্যের মুখোমুখি এখন আমরা। আমাকে বিশ্বাস করুন, আমরা এই বন্ধন ছিন্ন করতে পারি না। এ কথা আমাদের উভয়ের ভাবা উচিত। অবশ্য পশ্চিম পাকিস্তানে বসে এ কথা আমাদের আলোচনা করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। আমরা একটি নিরপেক্ষ দেশে আলোচনার জন্য মিলিত হতে পারি। উদাহরণ স্বরূপ ইরানের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে শাহিনশাহ আশা করেন, আমরা ইচ্ছা করলে তেহরানে আলোচনায় বসতে পারি। তিনি অনুগ্রহ করে তার একটি প্রাসাদ আমাদের ব্যবহারের জন্য দিতে রাজি হয়েছেন। ইরান যদি আপনার পছন্দ না হয়, তাহলে আমরা সুইজারল্যান্ডে মিলিত হতে পারি শুধু আমরা দুজন।’ মুজিব ব্যঙ্গোক্তি করে বললেন, ‘এখন আমরা যেমন মিলিত হয়েছি।’ ভুট্টো বললেন, ‘ঠিক তাই, কোনো রকম বাধা ছাড়াই আমরা এ কাজটি করতে পারি। আমরা দুজন নীতি সম্পর্কে একটি যৌথ বিবৃতি তৈরি করতে পারি। আমরা বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতে পারি। আমি একটি খসড়া তৈরি করেছি। আপনার তা পছন্দ হবে। আপনাকে আমি এটি দেখাতে চাই।’
মুজিব বললেন, ‘না’। ভুট্টোর উত্তর, ‘কেন নয়?’ উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘কারণ, আমি এখন পর্যন্ত আপনার বন্দি। এমনকি আমার স্ত্রীকে আমি টেলিফোন করারও অধিকারী নই। আমি জানি না, তিনি এখনো জীবিত আছেন কি না। আমার ছেলেমেয়েরাও কি জীবিত আছে? আমার বৃদ্ধ পিতামাতাও কি জীবিত আছেন? আমার মন্ত্রীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে কীভাবে আমার সামনে আপনি যে কাগজের টুকরা রেখেছেন তাতে আমি দস্তখত করতে পারি? আপনার ইচ্ছা পূরণের জন্য আপনি আমাকে জোর করে রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। আপনি আমাকে গুলি করতে পারেন, কিন্তু ঢাকায় গিয়ে আমার মন্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়া পর্যন্ত আমি কোনো কাগজে দস্তখত দেব না। আমাকে এখানে আটক রাখা হলে আমি আপনার বন্দি এবং আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আপনি আমার দস্তখত গ্রহণের চেষ্টা করছেন। ফলে এখান থেকে আমাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না মুক্তি দেওয়া হয়, আমি নীরব থাকব।’ শেষ বারের মতো অনুরোধ করে ভুট্টো বলেন, ‘একটি অখ- ও অবিভাজ্য পাকিস্তান গঠনের ব্যাপারে আপনি কি আমাকে সাহায্য করবেন, না করবেন না?’ শেখ মুজিব নীরব থাকেন।
৮ জানুয়ারি ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার জন্য জেলখানায় আসেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে অভিবাদন জানিয়ে বলেন, মুজিব এখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। মুজিব উত্তরে বলেন ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের নেতা হিসেবে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, পূর্ব পাকিস্তানের নয়। হালকা হাসিঠাট্টার পর ভুট্টো জানালেন, পূর্ব পাকিস্তান এখন স্বাধীন বাংলাদেশ। মুজিব এখন ঢাকা ফিরে যেতে পারেন। দিল্লি হয়ে তিনি যাবেন। সেখানে তাকে গার্ড অব অনার নিতে হবে। ভুট্টো আদেশ দিলেন মুজিবকে নতুন কয়েকটি প্রিন্সকোট দিতে’ (মুনতাসীর মামুন, বঙ্গবন্ধু কীভাবে আমাদের স্বাধীনতা এনেছিলেন, মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৬, পৃ. ৬৫)।
আমরা মনে করি ইতিহাসের এই অধ্যায়গুলো বারবার আমাদের প্রজন্মের সামনে আসা উচিত। বাঙালির মুক্তি আর বাংলার মর্যাদা রক্ষায় বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কতটা আত্মত্যাগ করেছিলেন, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও কতটা দৃঢ়চিত্ত ছিলেন তার ছবি এ প্রজন্মের মনে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা যেমন বাড়াবে তেমনি দেশের প্রতি ভালোবাসার অনুভূতিও আরও প্রবল করবে।
লেখক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com