ভ্যাট মওকুফ, কর অবকাশ সুবিধাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড়ের ঘোষণা দিয়ে ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানায় সরকার। রপ্তানিতে অবদান ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু ঘোষিত সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বিনিয়োগ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। অর্থনৈতিক অঞ্চলের জমির মূল্যের ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করায় বেড়ে গেছে ব্যয়। কর অবকাশে থাকা বেশকিছু পণ্য থেকেও সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ২০২০ সালের জানুয়ারির মধ্যে অর্থনৈতিক জোনের গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি, জমি ও রাস্তাঘাটের মতো জরুরি অবকাঠামো নিশ্চিত করার কথা থাকলেও তা করা সম্ভব হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা শিল্প স্থাপনে জমিপ্রাপ্তির সংকটের পাশাপাশি উৎপাদন প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষ (বেজা) বলছে, সংকট শিগগিরই কেটে যাবে। আগামী বছরের শুরুতেই বিনিয়োগযোগ্য হয়ে উঠবে বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল। এসব বিষয়ের অগ্রগতিসহ বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ইকোনমিক জোনগুলোর বাস্তায়নের সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনায় আগামী ২০ আগস্ট পর্ষদ সভা ডেকেছে বেজা।
এক কোটি কর্মসংস্থান ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয় বর্তমান সরকার। এখানে বিনিয়োগ আকর্ষণে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার ঘোষণা দিয়ে ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সরকারের অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগকারীদের আয় ও লভ্যাংশের ওপর প্রথম ১০ বছর কর থেকে শতভাগ দিতে হবে না বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। এ বিষয়ে ২০১৫ সালে জারি করা এসআরওতে অর্থনৈতিক অঞ্চলে যেকোনো ধরনের শিল্প-কারখানা নির্মাণ কিংবা যেকোনো পণ্য উৎপাদন, সব কিছুতে ১০ বছর কর অবকাশ সুবিধার কথা বলা হয়। এছাড়া শেয়ার স্থানান্তরে মূলধনী মুনাফা, রয়্যালটি, কারিগরি সহায়তা ইত্যাদি থেকে প্রায় আয়ের ওপরও শতভাগ কর অব্যাহতি দেওয়া হয়। জারি করা এসআরওতে আরও বলা হয়, জমির মূল্যের ওপর কোনো ধরনের ভ্যাট দিতে হবে না।
নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যবসায়ীদের নেওয়া হয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে। ব্যবসায়ীরা যখন অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি কিনে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেছেন, তখন চলতি বছর এসব প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে সরকার। অর্থনৈতিক অঞ্চলে ব্যবসায়ীদের শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগের পর এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলে উৎপাদিত সব ধরনের পণ্যে কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হবে না। সব ধরনের শিল্প-কারখানা আয়করমুক্ত থাকবে না। হাতে গোনা কয়েকটি শিল্প-কারখানা ও উৎপাদিত পণ্য কর অবকাশ সুবিধা পাবে। অন্যদের এখন থেকে আয়কর দিতে হবে। এ ছাড়া ব্যবসায়ীরা ৫০ বছরের জন্য যে জমি লিজ নিয়েছিলেন, সেখানে নতুন করে জমির মূল্যের ওপর বাড়তি ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে।
আবার সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ব্যবসায়ীরা যে জমি লিজ নিয়েছিলেন, সেই লিজের বিপরীতে ব্যাংকের ঋণ মিলছে না। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া জমির বিপরীতে এনওসি না পাওয়ায় ব্যাংকঋণ মিলছে না বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের পর এখন সেসব সুবিধা প্রত্যাহার করায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, সরকারের নতুন নীতির কারণে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ হুমকিতে পড়ছে। লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা নষ্ট হতে বসেছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে সরকার বাড়তি চার হাজার কোটি ডলার ও এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের যে স্বপ্ন দেখছে, তা বাস্তবায়িত হবে না বলেও মনে করেন তারা।
এ বিষয়ে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যয় যত কম হবে তত ভালো। জমি ক্রয়ে ভ্যাট আরোপের বিষয়টি এবারই প্রথম হয়নি। আগের বাজেটে সেটা হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা চান এটা প্রত্যাহার হোক। আমরাও মনে করি এটা না থাকাই ভালো। এতে করে কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস অনেক বেড়ে যায়। ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করতে আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, এনবিআরসহ বিভিন্ন জায়গায় অনুরোধ করেছি। আশা করছি, এই ভ্যাট প্রত্যাহার করা হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশে ব্যবসা করা এমনিতেই কঠিন। আর এখন কভিড পরিস্থিতিতে ব্যবসায় মন্দা চলছে। তাই এখন বিনিয়োগ আকর্ষণে আরও বেশি সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে সরকারি-বেসরকারি মিলে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার যে সিদ্ধান্ত নেয়, তাতে বিনিয়োগ করলে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রণোদনার কথা বলা হয়। তবে সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প উদ্যোক্তাদের শিল্প-কারখানা নির্মাণের কাজ যখন দ্রুত এগিয়ে চলছে, তখনই গত ১০ মে এক গেজেট প্রকাশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়, ২০১০ সালের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইনের ৫ নম্বর ধারায় যেকোনো শিল্প-কারখানা ও যেকোনো পণ্যে ১০ বছরের যে কর অবকাশ সুবিধার কথা বলা হয়েছে, সেটি পুরোপুরি থাকবে না।
এনবিআরের নতুন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে উৎপাদিত চিনি, আটা, ময়দা, সিমেন্ট, লোহা ও লৌহজাত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আয়ের ওপর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু থেকে ১০ বছরের জন্য দেওয়া আয়কর সুবিধা প্রত্যাহার করা হলো। এই প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে এসব পণ্য ও শিল্প-কারখানা আর কর অবকাশ সুবিধা পাবে না। আয়ের ওপর কর দিতে হবে। এসব শিল্প-কারখানা ও পণ্যের বাইরে যেসব শিল্প-কারখানা ও পণ্য উৎপাদন হবে, সে ক্ষেত্রে প্রথম তিন বছর শতভাগ কর অবকাশ সুবিধা, চতুর্থ বছর ৮০ শতাংশ। এভাবে দশম বছরে ২০ শতাংশ আয়কর অব্যাহতি পাবে। ঘন ঘন এই নীতি বদলের সমালোচনা করে ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে দাবি করেছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে সব ধরনের শিল্প-কারখানা ও পণ্যে কর অবকাশ সুবিধা দিতে হবে। কর ও ভ্যাট নীতিতে ধারাবাহিকতা থাকতে হবে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন কিছু কৌশল আসছে যেটা সাংঘর্ষিক। এগুলো স্ট্রিম লাইনে আনতে হবে। কোনো পলিসি গ্রহণের আগে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়। পরিবর্তন আনতে হলে পলিসির মধ্যে ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। কীভাবে ব্যবসায় বিনিয়োগ পলিসিগুলো সহজ করা যায় তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। ২০১৯ সালে যে ভ্যাট আইন পাস হয়েছে, তাতে কিছু ধারা সংযুক্ত করতে হবে, যাতে আইনে সংঘর্ষিকতা না হয়। তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় শিল্প-কারখানায় কিছু সুযোগ সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিসিকসহ কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে ওই সুবিধা অব্যাহত রয়েছে। এখন অর্থনৈতিক অঞ্চলে এসব সুবিধা প্রত্যাহার না করে বরং বাইরে যেসব শিল্প রয়েছে, সেগুলোকে কীভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রবেশ করানো যায়, তা ভাবতে হবে।
বিনিয়োগ আকর্ষণে থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগ টানতে নানা ধরনের ছাড় দিচ্ছে। থাইল্যান্ড নতুন শিল্প স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ১৩ বছরের জন্য কোনো জমির ভাড়া না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। একইভাবে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ৫ বছর জমির কোনো ভাড়া না নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। অথচ বাংলাদেশে উল্টো জমির মূল্যের সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে বিনিয়োগকে ব্যয়বহুল করা হচ্ছে, যা বিনিয়োগের জন্য অন্যতম প্রধান বাধা বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বেজা সূত্রে জানা যায়, ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি লিজ নিয়েছেন ৫০ বছরের জন্য। জমির নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করে সেখানে ভূমি উন্নয়ন করে এখন অবকাঠামো নির্মাণ করছেন। এনবিআর এখন বলছে, বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমির লিজ ভাড়ার ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে ব্যবসায়ীদের। ২০১৮ সালে বাস্তবায়ন শুরু হওয়া ভ্যাট আইনে জমিকে উপকরণ বা ‘ইনপুট’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে জমিকে ইনপুট হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে আগে পণ্যের উৎপাদন খরচের সঙ্গে ভ্যাটের সমন্বয়ের সুযোগ থাকলেও নতুন বাজেটে সেই সুযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। দিনশেষে যার প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের ওপর। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে অর্থনৈতিক অঞ্চলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। যদিও ভূমি উন্নয়ন, বিভিন্ন ধরনের স্ট্যাম্প ডিউটি ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর অব্যাহতি বহাল রাখা হয়েছে।