প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় বাদ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকল্পের নামে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে সতর্ক অবস্থানে সরকার। বিভিন্ন প্রকল্পে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়ে দীর্ঘদিন থেকে সমালোচনা হচ্ছে। অপচয় রোধে বিভিন্ন সময় অনুশাসন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপরও প্রকল্পের কেনাকাটায় অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো এবং অপ্রয়োজনীয় গাড়ি কেনা ও স্থাপনা নির্মাণের ঘটনা বন্ধ হয়নি। এ পরিস্থিতিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে গতকাল মঙ্গলবার একটি প্রকল্পের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় এমন দুটি বাংলো নির্মাণের প্রস্তাব নিজ হাতে কেটে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামীতে প্রকল্পের জন্য এমন ডাকবাংলো নির্মাণ না করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

গতকাল গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে একনেকের বৈঠকে সংযুক্ত হন তিনি। একনেক চেয়ারপারসন হিসেবে এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট সচিবরা রাজধানীর শেরে বাংলানগরে পরিকল্পনা কমিশনের একনেক সম্মেলন কেন্দ্র থেকে বৈঠকে যোগ দেন।

‘বারৈয়ারহাট-হেঁয়াকো-রামগড় সড়ক প্রশস্তকরণ’ প্রকল্প এবং ‘খুলনা সড়ক জোনের আওতাধীন মহাসড়কে বিদ্যমান সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ পুরাতন কংক্রিট সেতু বা বেইলি সেতুর স্থলে কংক্রিট সেতু নির্মাণ’ প্রকল্প নির্মাণ পরিদর্শনের জন্য বাংলো দুটি নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়। তবে প্রধানমন্ত্রী অপ্রয়োজনীয় বাংলো নির্মাণের প্রস্তাব বাতিল করে দেওয়ায় দেশের প্রায় ৬ কোটি টাকা খরচ বাঁচল।

একনেক বৈঠক শেষে পরিকল্পনা কমিশন থেকে ব্রিফিং করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী বাংলোর বিষয়ে বলেছেন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সারা দেশে অনেক বাংলো রয়েছে। কাজেই কোনো প্রকল্পের আওতায় নতুন করে বাংলো নির্মাণের প্রয়োজন নেই। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, তারা মনে করেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় প্রকল্প এলাকায় কর্মকর্তাদের অস্থায়ী অবস্থানের প্রয়োজন নেই। দিনে গিয়ে পরিদর্শন শেষে কর্মস্থলে ফেরা সম্ভব। ব্রিটিশ আমলে বাংলো বানানো হতো। কারণ তখন যোগাযোগ উন্নত ছিল না। 

গতকালের একনেকে আরও কিছু অনুশাসন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে সব মহাসড়ক থেকে টোল আদায়। দাউদকান্দি-গোয়ালমারী-শ্রীরায়েরচর (কুমিল্লা)-মতলব উত্তর (ছেঙ্গারচর) জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্প প্রসঙ্গে তিনি এই কথা বলেছেন। নির্মাণ ব্যয়ের খরচের কথা বিবেচনায় সামান্য হলেও টোল আদায় করতে হবে। তবে টোল আদায় প্রক্রিয়ায় যাতে সড়কে যানজট সৃষ্টি না হয়, সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে বন্যা ও নদীভাঙন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভাঙনের মুখে থাকা বিভিন্ন স্থাপনা রক্ষায় মডেলিং করতে হবে। যাতে এসব নদী ভাঙনের আগে এগুলো রক্ষা করা যায়। বন্যা প্রতিরোধে খাল খননেরও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এছাড়া বাঁধ রক্ষায় স্লুইস গেট নির্মাণ বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সারা দেশে কতগুলো এ ধরনের গেট আছে, তার হিসাব তুলে ধরবেন তারা।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আমাদের রাস্তা বানাতে হবে। রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। মেরামত করতে হবে। মেরামত না করলে আপনারা সবাই বিরক্ত হন। সুতরাং টোল করে সামান্য টাকা চাঁদা দিয়ে যাবেন। এটা উনি (প্রধানমন্ত্রী) মনে করেন, এটা বোধহয় ফ্রি হওয়া ঠিক নয়। আমি তার সঙ্গে শতভাগ একমত। তবে টোলের সিস্টেমটা দ্রুত করতে হবে।

একনেকে গতকাল মোট ৭টি প্রকল্প পাস হয়েছে। এর মধ্যে ৬টি নতুন, বাকিটি সংশোধিত প্রকল্প। এসব প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব ব্যয় ২ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। বাকি অর্থের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অনুদান ২৬১ কোটি টাকা ও ভারতীয় ঋণ (দ্বিতীয় এলওসি) রয়েছে। 

অনুমোদিত প্রকল্পগুলো হলো বারৈয়ারহাট-হেঁয়াকো-রামগড় সড়ক প্রশস্তকরণ, দাউদকান্দি-গোয়ালমারী-শ্রীরায়েরচর মতলব উত্তর (ছেঙ্গারচর) জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্তকরণ এবং খুলনা সড়ক জোনের আওতাধীন মহাসড়কে বিদ্যমান সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ পুরাতন কংক্রিট সেতু/বেইলি সেতুর স্থলে কংক্রিট সেতু নির্মাণ। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বাউফল উপজেলার ধুলিয়া লঞ্চঘাট থেকে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপাশা রক্ষা প্রকল্প, কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ (দ্বিতীয় পর্যায়), মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের গভীর সমুদ্রে টুনা ও সমজাতীয় পেলাজিক মাছ আহরণে পাইলট প্রকল্প ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ‘ইমার্জেন্সি মাল্টি সেক্টর রোহিঙ্গা ক্রাইসিস রেসপন্স প্রজেক্ট (১ম সংশোধিত) প্রকল্প’।