চলে গেলেন বাংলাদেশের প্রথম পেশাদার নারী আলোকচিত্রী, সাংবাদিক সাইদা খানম। যার ক্যামেরায় তোলা অসংখ্য আলোকচিত্র ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গত সোমবার রাত ৩টার দিকে ঢাকার বনানীতে নিজের বাসায় মৃত্যু হয় সাইদা খানমের। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত ছিলেন।
সাইদা খানমের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি (সাইদা খানম) তার কর্মের মাধ্যমে দেশের জনগণের অন্তরে আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’ প্রধানমন্ত্রী মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে ক্যামেরার সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেন সাইদা। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত মানুষের ছবি তুলেছেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে সাইদা খানম জানিয়েছিলেন, খালা কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার কাছ থেকেই আলোকচিত্রী হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তিনি। শুরুর দিকে অনুভব করেছেন, আলোকচিত্রী হতে হলে ভীষণ সাহসী হতে হবে। নারী আলোকচিত্রী হিসেবে তাকে নানা রকম বাধা ডিঙিয়ে এগুতে হয়েছে। সাইদা খানমের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের ফটোগ্রাফি অঙ্গনের একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
সাইদা খানমের পারিবারিক বন্ধু ও চলচ্চিত্রকার মুনীরা মোরশেদ বলেন, ‘সাইদা আপা গত পরশু (সোমবার) বাসাতেই হঠাৎ পড়ে গিয়েছিলেন। এরপর থেকেই তার কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। আগে থেকেই তার কিডনির সমস্যাও ছিল। রাজধানীর বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরে মঙ্গলবার সকালে সমাহিত করা হয় তার মরদেহ।’
প্রখ্যাত এই আলোকচিত্রীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছে দেশজুড়ে। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এক শোকবার্তায় বলেন, ‘অদম্য সাহসী আলোকচিত্রী সাইদা খানমের অনুপ্রেরণায় পরবর্তীকালে এ সাহসিকতা ও মর্যাদাপূর্ণ পেশায় অনেক নারীর পদচারণা ঘটেছে। বাংলাদেশে নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ এ মহীয়সী নারী তার কর্মের মধ্য দিয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’
এছাড়া বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, থিয়েটার পত্রিকা ‘ক্ষ্যাপা’সহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে।
সাইদা খানমের ক্যামেরায় তোলা নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রহাতে প্রশিক্ষণের ছবি এখন বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও অসংখ্য ছবি তুলেছেন তিনি। সাইদার ক্যামেরায় তোলা অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় এবং মাদার তেরেসার কিছু ছবি আলোচিত হয়েছে। সত্যজিৎ রায় ও মাদার তেরেসার ছবি নিয়ে একক প্রদর্শনীও তিনি করেছেন। বাংলাদেশ থেকে সাইদাই প্রথম সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকার নিয়ে আসেন, যেটি চিত্রালীতে প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে।
১৯৩৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর পাবনায় জন্ম সাইদা খানমের। ফটোসাংবাদিকতার শুরু ষাটের দশকে, তখনকার বেগম পত্রিকায় কাজের মধ্য দিয়ে। পেশাদার আলোকচিত্রী হয়ে ওঠার পথে সাইদা উৎসাহ পেয়েছেন বড় বোন হামিদা খানমের কাছ থেকে, যিনি অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমদের স্ত্রী। হামিদা খানম ছিলেন ঢাকার গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। উচ্চতর পড়াশোনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে বোনের জন্য তিনি নিয়ে আসেন একটি রোলিকর্ড ক্যামেরা, যা তখনকার পেশাদাররা ব্যবহার করতেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ছবি তুলতে তখনকার রেসকোর্স ময়দানের দিকে রওনা হয়েছিলেন, কিন্তু ঘটনাচক্রে তা আর হয়ে ওঠেনি।
১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিতে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করেছেন সাইদা খানম। তার ছবি ছাপা হয়েছে অবজারভার, মর্নিং নিউজ, ইত্তেফাক, সংবাদসহ বিভিন্ন পত্রিকায়।
১৯৫৬ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেন সাইদা খানম। ওই বছরই জার্মানিতে তার ছবি পায় আন্তর্জাতিক পুরস্কার। ভারত, জাপান, ফ্রান্স, সুইডেন, পাকিস্তান, সাইপ্রাস ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে তার ছবির প্রদর্শনী হয়েছে।
ফটোসাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সাইদা খানমের তোলা প্রায় ৩ হাজার ছবি প্রকাশিত হয়েছে। ক্যামেরার পাশাপাশি কাজ করেছেন কলম হাতেও। তার লেখা ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘ধুলোমাটি’, ‘স্মৃতির পথ বেয়ে’, ‘আমার চোখে সত্যজিৎ রায়’, ‘আলোকচিত্রী সাইদা খানম-এর উপন্যাসত্রয়ী’।
বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সদস্য সাইদা খানম বাংলা একাডেমিরও আজীবন সদস্য। আলোকচিত্রে অনন্য অবদানের জন্য সরকার ২০১৯ সালে শিল্পকলা শাখায় সাইদা খানমকে একুশে পদকে ভূষিত করে।