যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে কমলা হ্যারিসের উত্থান

মাত্র ঊনিশ বছর বয়সে ভারতের মাদ্রাজ থেকে শ্যামলা গোপালান নামের এক উচ্চাকাক্সক্ষী ছাত্রী পাড়ি জমান আমেরিকার পথে। বছরটা উনিশশো আটান্ন। ক্যানসার-বিষয়ক গবেষণায় উচ্চশিক্ষা নেওয়ার জন্য তিনি যোগ দেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের ক্যাম্পাসে। বার্কলের কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকাকেই তিনি থাকার জন্য বেছে নেন। সেখানেই তিনি স্বস্তি বোধ করেন। প্রতিবেশীরা তাকে আপন করে নেন। পরিচয় হয় এক জ্যামাইকান যুবকের সাথে। তিনিও উচ্চশিক্ষার্থে এসেছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায়। অর্থনীতির ছাত্র। নাম ডোনাল্ড হ্যারিস। তাদেরই মেয়ে কমলা, দুই বোনের মধ্যে যিনি বড়।

বার্কলের পরিবেশে বেড়ে ওঠেন কমলা। পরিবেশের এবং মা-বাবার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব আছে কমলা ও তার বোন মায়ার জীবনে। শ্যামলা এবং ডোনাল্ড দুজনেই বর্ণবাদ-উদ্ভূত বৈষম্যমূলক ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। নিয়মিতই যোগ দিতেন ‘সিভিল রাইটস’ আন্দোলনে। বার্কলে তখন প্রতিবাদী ছাত্র আন্দোলনের সূতিকাগার। ষাটের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক আবহাওয়া সৃষ্টির পেছনে বার্কলের ছাত্রদের ভূমিকা ইতিহাসের অন্তর্গত। বলা হতো ‘পিপলস রিপাবলিক অব বার্কলে!’

২০১৬-র নির্বাচনে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য থেকে প্রথম বারের মতো নির্বাচিত হন কমলা হ্যারিস ইউএস সিনেটে। তার আগে ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জোসেফ বাইডেন ঘোষণা দিলেন তার ‘রানিং মেইট’ বা ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনীত হয়েছেন সিনেটর কমলা হ্যারিস। হ্যারিসও প্রাইমারি পর্যায়ে অনেকের মধ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদের জন্য মনোনয়ন প্রার্থী ছিলেন। নানা কারণে এই মনোনয়ন ঐতিহাসিক। হ্যারিসের আগে যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র দুজন নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। প্রথমজন জেরাল্ডিন ফেরারো ১৯৮৪-তে ডেমোক্রেটিক পার্টির ওয়াল্টার মন্ডেলের টিকেটে, যে নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হন। আর দ্বিতীয়জন ছিলেন সারাহ পেলিন ২০০৮-এ রিপাবলিকান পার্টির জন ম্যাককেইনের সঙ্গে, যে বছর জিতে যান বারাক ওবামা। বলা বাহুল্য, তারা ভাইস প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। কমলা হ্যারিসই নারীদের মধ্যে তৃতীয় হলেও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রথম, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে যাচ্ছেন। হ্যারিসের বাবা-মা দুজনের কেউই জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন। এদিক থেকেও হ্যারিস প্রথম।

ভারতে আর বিশ্বব্যাপী ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের মাঝে, যুক্তরাষ্ট্রে তো বটেই, হ্যারিসের মনোনয়ন সাড়া জাগিয়েছে। তারা মনে করছেন, হ্যারিস তাদেরই মানুষ। একই কারণে জ্যামাইকানরাও উল্লসিত। কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানরাও গর্বিত, তাদের একজন এই মনোনয়ন পাওয়াতে। শ্বেতাঙ্গিনী আমেরিকান মা এবং কেনিয়ান বাবার সন্তান বারাক ওবামার মতোই কমলা হ্যারিসও আফ্রিকান-আমেরিকানদের একজন হিসেবে বেড়ে উঠেছেন। তাদের মা বুঝতে পেরেছিলেন, কমলাদেবী আর তার ছোট বোন মায়ালক্ষ্মীর সম্প্রদায়গত পরিচিতি আফ্রিকান-আমেরিকান বা ‘ব্ল্যাক’ই হতে হবে, অন্য কিছু নয়। তিনি তাদের সে পরিচয়েই বড় করেছেন। কিন্তু হ্যারিসের মনোনয়ন শুধু এই কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ নয় যে তিনি নারী, কৃষ্ণাঙ্গ, এবং ইমিগ্রান্ট বাবা-মার সন্তান। এই মনোনয়নের গুরুত্ব ডেমোক্রেটিক পার্টিতে ডান-বামের সমীকরণে হ্যারিসের অবস্থান নিয়ে। হ্যারিস প্রাইমারিতে নিজেকে মধ্যবামের প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বার্নির ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ (সবার জন্য ‘সরকারি ব্যবস্থাপনায়’ স্বাস্থ্যসেবা)-এর ডাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। পরে আবার পিছিয়েও এসেছিলেন। ডেমোক্রেটিক প্রার্থীদের প্রথম বিতর্ক অনুষ্ঠানে বাইডেনের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন। কিন্তু প্রাইমারিতে ভোটাভুটি শুরু হওয়ার আগেই নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। নানা কারণে তার নির্বাচনী কর্মসূচি সংকটের মুখে পড়ে। সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং পর্যাপ্ত নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহে ব্যর্থতা ছাড়াও একটা বড় কারণ ছিল ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালীন তার ভূমিকা। ওই সময়ে অঙ্গরাজ্যের প্রধান আইন প্রয়োগকারী হিসেবে তার কিছু কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন দলের অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং ‘বামঘেঁষা’ বা ‘লিবারেল’ বলে পরিচিতরা। এরা ছিলেন মূলত বার্নি স্যান্ডার্স এবং অংশত এলিজাবেথ ওয়ারেনের সমর্থক। এদের দুজনেই প্রার্থীদের মধ্যে ‘প্রগতিশীল’ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন সমর্থকদের কাছ থেকে এবং দুর্নাম কুড়িয়েছিলেন বিরোধীদের কাছ থেকে। প্রাইমারির সময়ে ডেমোক্রেটিক পার্টিতে এদের প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। এতটাই যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী এস্টাবলিশমেন্টের পছন্দের প্রার্থী বাইডেনের অবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল ‘সুপার টুইসডে’র আগে পর্যন্ত। এই প্রভাবের কারণেই হ্যারিসের তখনকার বক্তব্যে ‘প্রগতিশীল’ ঝোঁক দেখা যায়। তা সত্ত্বেও তাকে বিদায় নিতে হয় প্রাইমারি থেকে। কিন্তু প্রাইমারিতে যে কারণে হ্যারিস অসুবিধায় পড়েছিলেন, তাই হয়ে দাঁড়াল ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য আশীর্বাদ। বস্তুত হ্যারিস ‘এস্টাবলিশমেন্ট’-এর পছন্দেই এই মনোনয়ন পেয়েছেন।

কমলা হ্যারিসের মনোনয়ন আফ্রিকান-আমেরিকানদের ভোট পেতে সাহায্য করবে এই ধরনের চিন্তা বাইডেনের থেকে থাকতে পারে। বাইডেন নিজেও অপেক্ষাকৃত বয়স্ক আফ্রিকান-আমেরিকানদের ভোটেই বার্নিকে হারিয়ে প্রাইমারিতে জিতেছিলেন। হ্যারিস সেই সমর্থন ধরে রাখতে সাহায্য করবেন, সন্দেহ নেই। কিন্তু স্যান্ডার্স-ওয়ারেনদের সমর্থক এস্টাবলিশমেন্ট-বিরোধী প্রগতিশীলদের কি তিনি ফিরিয়ে আনতে পারবেন, বাইডেন-হ্যারিস টিকিটের পক্ষে ভোট পাওয়ার জন্য? এটিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বিরাট প্রশ্ন।

স্যান্ডার্স সমর্থকদের অনেকেই হিলারি ক্লিনটনের সমর্থনে এগিয়ে আসেননি। অনেকেই মনে করেন ট্রাম্পের জেতার পেছনে এটি একটি অন্যতম কারণ। স্যান্ডার্সের সমর্থন ২০১৬’র চেয়ে এবারে অনেক বেশি জোরালো ছিল। তাই ডেমোক্রেটিক এস্টাবলিশমেন্টের আশঙ্কাও বেশি। হিলারি ক্লিনটন পাত্তা দেননি স্যান্ডার্সকে, বাইডেন এবারে না দিয়ে পারেননি। বাইডেন এবং হ্যারিস উভয়েই জানেন, স্যান্ডার্স সমর্থকদের বাদ দিয়ে নির্বাচনে জেতা দুরূহ হবে। তাই স্যান্ডার্স এবং ওয়ারেন থেকে ধার করে কিছু কিছু ‘গণমুখী প্রগতিশীল’ বক্তব্য তাদের মাঝে মাঝে দিতে দেখা যাচ্ছে। স্যান্ডার্স ও তার কিছু প্রস্তাবনার প্রশংসাও তাদের করতে দেখা গেছে। কিন্তু মোটাদাগে বাইডেন-হ্যারিসের নির্বাচনী ক্যাম্পেইন ওবামা-বাইডেন ক্যাম্পেইনের চরিত্রই ধারণ করতে যাচ্ছে। স্যান্ডার্স বা ওয়ারেনের মতো সারবত্তা নেই বাইডেনের মেনিফেস্টোতে। তাই ‘ট্রাম্পকে সরাতে হবে’ এই থিমের ওপরেই জোর দিতে হচ্ছে বেশি।

ওবামা-বাইডেন প্রশাসন কাক্সিক্ষত ফল আনতে পারেনি ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থকদের জন্য। নির্বাচনের আগে গণমুখী কর্মসূচি দিলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পরে বাম থেকে মধ্যপানে সরার একটা প্রবণতা দেখা গেছে ওবামা-বাইডেনের মধ্যে। বিশেষ করে ওবামার আট বছরের প্রশাসন যে আফ্রিকান-আমেরিকান সম্প্রদায়ের জীবনে বিশেষ কোনো ইতিবাচক ফল আনতে পারেনি, এজন্য তারা প্রচণ্ড রকমের হতাশ।  তবুও করোনাভাইরাসজনিত সংকট নিরসনে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং জর্জ ফ্লয়েড হত্যা-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বাইডেন-হ্যারিসকে কিছু বাড়তি সুবিধা দিতে পারে ২০২০-এর নির্বাচনে, সন্দেহ নেই। তবে ডেমোক্রেটিক পার্টি হোয়াইট হাউজ জিততে যাচ্ছে এখনই তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

প্রতিবাদী সমাজের অবহেলিতদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার একজন আন্দোলনকারী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন শ্যামলা গোপালান ও তার মেয়েরা। তাদেরই একজন কমলা শেষে যোগ দিলেন আইন প্রয়োগকারী কর্র্তৃপক্ষের বড়কর্তা হিসেবে। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে কমলার উত্তর ছিল তার আত্মজীবনীতে (দ্য ট্রুথস উই হোল্ড, ২০১৮), ‘আমি দেখেছি বিক্ষোভকারীদের সদর দরজায় এসে ধাক্কা দিতে, আমি চেয়েছি দরজার অন্য পাশে থেকে তাদের ঢুকতে দিতে’। আরও বলেছেন, ন্যায়বিচারের জন্য বাইরে থেকে সংগ্রাম করার গুরুত্ব তিনি বোঝেন, তবে তার অধিক আগ্রহ ভেতরের ক্ষমতায়, ‘এস্টাবলিশমেন্ট পাওয়ারে’। ডেমোক্রেটিক পার্টির ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন পেয়ে কমলা হ্যারিস এস্টাব্লিশমেন্টের অনেকটাই ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেলেন। বাইডেনের সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হলে কী করবেন বা করতে পারবেন দেখার জন্য আপাতত অপেক্ষা।

লেখক ইমেরিটাস প্রফেসর, ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

irtishad@gmail.com