মারা গেলেন পন্ডিত যশরাজ। ভারতের মারাঠা ঘরানার সেরা শিল্পী ছিলেন তিনি। সাত দশক ধরে বিশ্ব কাঁপিয়ে বেড়ানো ভারতীয় ক্লাসিক্যাল ধারার এই সংগীত গুরুর জীবনের গল্প লিখেছেন ওমর শাহেদ
৪০০ বছর পর একই ঘটনা
পন্ডিত যশরাজের কণ্ঠ নিয়ে কিংবদন্তির মতো একটি গল্প প্রচলিত আছে। এই গল্পের সূত্রপাত প্রাচীন তীর্থকেন্দ্র বেনারসে। ১৯৯৬ সালে একটি কনসার্টে ‘রাগ তোদি’ পরিবেশন করছিলেন পন্ডিতজি। এমন সময় কোথা থেকে দৌড়ে চলে এলো একটি হরিণ। মানুষের পাশ কেটে দৌড়াতে দৌড়াতে হাজির হলো একেবারে মঞ্চের সামনে। উঠতে পারল না ওপরে; কিন্তু তন্ময় হয়ে পণ্ডিতজির গান ও সুর শুনতে লাগল অবলা ওই পশুটি!
বেশিরভাগ সংগীতপ্রেমী এই মহৎ মানুষ ও বিশ্বসেরা শিল্পীকে তুলনা করতে ভালোবাসেন ১৬ শতকের মুঘল সম্রাট আকবরের সভাকবি সুর সম্রাট তানসেনের সঙ্গে। সম্রাট আকবরের দরবার থেকে যার সুরের আলো ছড়িয়ে গেছে বিশ্বজুড়ে। জানা যায়, আগ্রাতে তানসেনের গান শুনতে একদিন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল একটি হরিণ। চারশো বছর পর সে ঘটনারই যেন পুনরাবৃত্তি হলো পণ্ডিত যশরাজের ক্ষেত্রে।
জীবনে অনেক ভালোবাসা, সম্মান, স্মরণীয় মুহূর্ত পেয়েছেন পন্ডিত যশরাজ। কিন্তু হরিণের সেই ভালোবাসা কোনোদিন ভোলেননি। সেদিনের জ্বলজ্বলে সেই স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন, ‘তখন ভোর প্রায় ৬টা; ৫ হাজারেরও বেশি মানুষ গান শুনতে এসেছেন। তাদের মধ্যে হরিণকে দেখে আমার খুব শুভ লক্ষণ মনে হলো। তাকে নমস্কার জানিয়ে ফের গাইতে শুরু করলাম।’
ক্লাসিক্যাল ঘরানার উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক
জন্মেছিলেন ব্রিটিশ শাসনামলে। ১৯৩০ সালের ২৮ জানুয়ারিতে; ভারতের উত্তরের হরিয়ানা প্রদেশের হিসার শহরে। ক্লাসিক্যাল সংগীতের একটি পরিবারের বংশধর যশরাজ। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন ‘মিরাট ঘরানা’র শিল্পী। বাবা পন্ডিত মতিরাম ছিলেন একজন উল্লেখযোগ্য ক্লাসিক্যাল গায়ক। তবে ছেলেকে ৪ বছর বয়সে রেখে চলে গেলেন অনন্তলোকে। তাই বাবার কাছে গান শেখা হলো না যশরাজের। তবে ছেলেবেলা থেকে শিখেছেন বড়ভাই পন্ডিত মণিরামের কাছে। ছেলের আদরে ভাইকে শিখিয়েছেন মণিরাম। তার তবলা শিল্পী হিসেবে সঙ্গ দিয়েছেন যশরাজ। যশরাজকে হাতে ধরে তবলা বাজানো শিখিয়েছেন আরেক বড় ভাই প্রদীপ নারায়ণ। তখন থেকে বেশ কয়েকজন মারাঠি ঘরানার ও আগ্রার বরেণ্য শিল্পীর কাছে শেখার সুযোগ হয়েছে আজীবনের তৃষ্ণার্ত গানের সাধক পন্ডিত যশরাজের।
জীবনের মোড় ঘুরে গেল ১৫ বছরের কৈশোর বেলায়। একজন সংগীতশিল্পী তাকে তাচ্ছিল্য করেছিলেন ‘সামান্য একজন শিল্পী’ বলে। যশরাজের মনে বড় বাজল সেই কথাটি। সেই থেকে সুরের ভুবনে মহারাজ হওয়ার অঙ্গীকার করলেন তিনি। তাকে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেছেন বড়ভাই পন্ডিত মণিরামই। এরপর রেডিওতে নিয়মিত শিল্পী হলেন। রেডিওতে অনুষ্ঠান করতে কলকাতায় ঠিকানা গাড়লেন মাত্র ১৭ বছর বয়সে। তাদের সময়ের অসংখ্য শিল্পীর কাজের মূল কেন্দ্র ছিল এই প্রচারমাধ্যমটি।
জীবনের প্রথম কনসার্ট করলেন মাত্র ২২ বছর বয়সে। ভারতের বিখ্যাত বলিউডের সিনেমা শিল্পেও ডাক পড়তে তার সময় লাগেনি। ১৯৬৩ সালে ৩৩ বছর বয়সে সিনেমায় গান গাইতে যশরাজ চলে গেলেন মুম্বাইয়ে। কয়েকটি বলিউড সিনেমার জন্য গীত রচনা করলেও আসলে তিনি অমর হয়ে থাকবেন ভারতীয় ক্লাসিক্যাল বা উচ্চাঙ্গ সংগীতকে বিশ্বময় জনপ্রিয় করার কারিগর হিসেবে। অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে একের পর এক উন্নত থেকে উন্নততর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পারফরমেন্সে সমৃদ্ধ তার জীবন।
সহযোগীদের নিয়ে তার ঘরানার গান শেখার প্রতিষ্ঠান গড়েছেন ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়। বছরের পর বছর মারাঠি ঘরানার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন এর ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চমাত্রার ও জটিলতম অলংকার হয়ে। নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছেন ‘ঈশ্বরের অর্পিত প্রতিভা’ হিসেবে। অনেক সুরকারকে বানিয়েছেন মারাঠি সংগীত ভুবনের নিবেদক। ফলে কেবল অনিন্দ্য কণ্ঠের জন্যই পন্ডিত যশরাজ খ্যাতিলাভ করেননি। শিল্পী ও সংগীতপ্রেমীদের সামনে তিনি তুলে ধরেছেন নানা দুর্লভ রাগও। তাতে সেগুলো বেঁচে গিয়েছে চিরকালের মতো। তিনি হয়েছেন গানের অমর জাদুকর।
নারী-পুরুষ সমতা
উচ্চাঙ্গ সংগীতের ভুবনে পন্ডিত যশরাজ উদ্ভাবন করেছেন ‘যুগলবন্দি স্টাইল’। তাতে পুরুষ ও নারী গায়করা একই সময়ে, একই স্টেজে রাগ পরিবেশন করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি প্রথমবারের মতো এই স্টাইল হাজির করেছিলাম পুনেতে। যখনই বন্ধু মিনা পালনিকর শুনলেন এর কথা; বললেন, ‘যশরাজের এই রঙে যুগলবন্দির মাধ্যমে আমিও রঙিন হই।’ তিনিই এই পরিবেশনার নাম দিলেন ‘যশরঙ্গী’।’
ভারতীয় ক্লাসিক্যাল বা উচ্চাঙ্গ সংগীতে এই সাম্যবাদের প্রয়োগের জন্যও তিনি খুব পরিচিত ছিলেন। তাছাড়াও ভক্তিমূলক ভারতীয় গান যেমন ‘হাভেলি সংগীত’ ও ‘ভজন’কে ক্লাসিক্যাল পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন তিনি। এই গীতধারাগুলোকে পন্ডিত যশরাজ গভীর ব্যঞ্জনা দিয়েছেন। ফলে কোটি কোটি ভক্ত তার ভক্তিমূলক গানকে মনে-প্রাণে ভালোবেসেছেন। তিনি সারা জীবন ধরে ধারাবাহিকভাবে এমনভাবে গান করেছেন, যেটি তার অনন্য ভাব ও নিবেদনের স্টাইল হয়েছে। তার হৃদয় নিংড়ানো নিবেদনে সাতটি দশক ধরে বাঁধা পড়েছিলেন সারা বিশ্বের শ্রোতারা।
ধর্মনিরপেক্ষতা
ভারতের সবচেয়ে পুরনো সংগীত উৎসবগুলোর একটি ‘শঙ্করলাল মিউজিক ফেস্টিভ্যাল’। এখানে বহু পুরনো একটি স্মৃতি স্মরণ করে পরিচালক শোভা দীপক সিং বলেন, ‘আমার মা সুমিত্রা চরিত রাম ভারতীয় কলা কেন্দ্র এবং এই উৎসবটির প্রতিষ্ঠাতা। প্রথমটি হয়েছিল তার কার্জন রোডের বাড়িতে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। এই বাড়িটিই এখন দেশের বিখ্যাত পত্রিকা দ্য হিন্দুস্তান টাইমসের অফিস। অনানুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে হাজির হয়েছিলেন হাতেগোনা কয়েকজন গুণী শিল্পী। আয়োজনটি হয়েছিল রাতভর। শিল্পীরা ছিলেন পন্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ আলী আকবর খান, পন্ডিত যশরাজ, ওস্তাদ হাফিজ আলী খান, পন্ডিত ওঙ্করনাথ ঠাকুর, পন্ডিত কুমার গন্ধর্ব প্রমুখ।’
সেই সময় ওই উৎসবে গান করার জন্য মুখিয়ে ছিলেন পন্ডিত যশরাজ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘তাদের সঙ্গে সেই আসরে গান পরিবেশন করা বিরাট গর্বের। আজও পুলকিত হই।’ খেয়ালি ও মহাগুণী এই শিল্পী কোনো সময়ই আগে থেকে ঠিক করেন না যে এই রাগটি বা ওই গানটি গাইবেন। তিনি বলেছেন, ‘অনেক সময় এমন ঘটে যে, আমি কোনো একটি রাগ ভাবলাম আগে, কিন্তু মঞ্চে একেবারেই ভিন্ন কোনো গান গাইতে ভালো লাগল আমার।’ পন্ডিত যশরাজের এই পারফরমেন্সের অভিজ্ঞতা হলো প্রকৃত সংগীতের একটি বিরল ধারাকে দারুণভাবে দেখা। তার কনসার্টগুলো তার প্রগতিশীল, সৃজনশীল ধারা এবং ক্লাসিক্যাল টেকনিকের মাধ্যমে সবার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জাগিয়েছে। তাকে তাদের মধ্যে যুগের পর যুগ বাঁচিয়ে রেখেছে। করেছে অন্যদেরও আলোকিত। পন্ডিত যশরাজের সবচেয়ে বিখ্যাত গানগুলোর একটি ‘মেরো আল্লাহ’ ও আরেকটি ‘ওম নম ভগবতে’ প্রমাণ করেছে কীভাবে সবচেয়ে বিনয়ের সঙ্গে যেকোনো শিল্পীর জন্য সেরা শুরুটি করা যেতে পারে ও সেই সামর্থ্য রাখেন এই গুণী শিল্পী। পাশাপাশি এগুলো তার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদেরও প্রকাশ। এই গানগুলো দিয়ে এরপর বিরাট এক স্টেজ পারফরমেন্সের বিকাশ ঘটাতে থাকেন তিনি, সেটি সবাইকে বরাবর হতবুদ্ধি ও বিমোহিত করে দেয়। মানুষকে পরম আনন্দ দেয় তার প্রতিভার নানা দিকের পরম্পরার মাধ্যমে। তাতে থাকে সুরের মিশেল, সংগীতের উত্থান-পতন, আনন্দ, তার স্টাইলের নিজস্ব উপস্থাপনা। তার প্রথা ভেঙে দেওয়া ধরনটি এমন ক্লাসিক্যাল ও পরাক্রমশালী উপস্থাপনার, যেটির সবার কাছে আবেদন আছে। একেবারেই অনন্য তা। একটি নোট থেকে আরেকটি নোটে এমনভাবেই তিনি পরপর এগিয়ে গেছেন সারা জীবনভর গানের আসরগুলোতে। মিন্দ (একটি নোট থেকে আরেকটি নোটে সাহচর্যে যাওয়া), কানসুর (নোটগুলোর প্রসাদগুণ), গমক (নোটগুলোর মধ্যে দুলুনি), মুরখি (নোটগুলোর একটি সংক্ষিপ্তগুচ্ছ) এবং লেকারি (ছন্দবদ্ধ কাজ) সবগুলোই ছিল সবখানে তার প্রথাগত ক্লাসিক্যাল উপায়ে, যে মারাঠি স্টাইলের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। এই কণ্ঠস্বরটি ছিল কোনো সীমানা বা সীমাবদ্ধতা নেই এমন এক মানুষের বহুমুখিতায় ছড়ানো। সুরকে তিনি এমনভাবে তৈরি করেছেন যে কোনো মানুষ তার ভেতরে গভীরভাবে প্রবেশ করলে যেন সাগরেই প্রবেশ করে। তিনি অসাধারণ অনেক গানের গীতিকারও।
প্রতিদিনের জীবনে
গানের বাইরে মহৎ এ মানুষটি উদার মানসিকতায় ছিলেন পরিপূর্ণ। জীবনে প্রাচুর্যে ভরা ছিলেন তিনি। পন্ডিত যশরাজ মানুষকে এক করতেন। আনন্দের সঙ্গে ছাত্রদের দেওয়ার যোগ্যতায় ভরা এক শিক্ষক ছিলেন তিনি। তাতেই হয়েছেন মহাশিক্ষক। তার স্বভাবের জন্য অন্যতম প্রিয় ছাত্র সঞ্জীব অভয়ঙ্কর পন্ডিতজিকে ডাকতেন ‘দি ম্যাগনেট’ বা ‘চুম্বক’ নামে। কারণ যাকেই জীবনের সঙ্গে বেঁধেছেন পন্ডিত যশরাজ, তাকেই চুম্বকের মতো কাছে টেনে নিয়েছেন। প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং দেখাশোনাও করেছেন বছরের পর বছর। কখনো দশকের পর দশকও তার এই মেলবন্ধন পেরিয়েছে। তাতেও কখনো কোনো ক্লান্তি আসেনি ভারতের প্রাচীনতম একটি ঘরানার সেরা এ শিল্পীর। তিনি ছিলেন একজন মানুষের শিল্পী। মানুষের পাশে থাকতেন পন্ডিত যশরাজ, তাদের নিয়ে থাকতেন তিনি। বন্ধুদের মধ্যে পরিবারের বাঁধন তৈরিতে তিনি ছিলেন বিরাট সূত্রধর। গড়েছেন বন্ধুত্বের বিপুল পরিবার। তাদের সবার ভালো চাইতেন মনেপ্রাণে ও কাজের মাধ্যমে। এই গুণটি তার ছাত্রদের জন্যও ছিল। পরিচিতদের জন্যও এমন ছিলেন তিনি।
জীবনের শুরু থেকে শেষ ক্ষণ পর্যন্ত পন্ডিতজি কাজ করেছেন। সবসময় এগিয়ে গেছেন, মানুষকে এগিয়ে দিয়েছেন। তাদের সংস্পর্শে থেকেছেন। স্নেহে, সহৃদয়তায় নিজের ছাত্রছাত্রীদের গড়ে দিয়েছেন তিনি। বাবার মতো তাদের শেখাতেন, যেকোনো বিষয়ে পাশে থাকতেন, যত্ন করতেন। তবে কাউকে সংগীত শেখানোর জন্য বা জ্ঞান বিতরণের জন্য একটি কানাকড়িও নেননি তিনি। এতই মহৎ উপায়ে নিজের জ্ঞানকে বিলিয়েছেন। কেবল তাই নয়, তিনি তাদের ছবি দেখতে নিয়ে যেতেন। খাওয়াতেন ভালো রেস্তোরাঁয় ওদের পছন্দমতো, দিতেন তাদের ভালোবাসার স্মৃতি উপহার। বিরলতম এই গুণগুলো ছিল তার জীবনের মহত্ত্বের পরিচায়ক। ফলে তাকে নিয়ে প্রশংসা বচনের যেন কোনো শেষ নেই।
শ্রদ্ধার্ঘ্য
মারা গেলেন ৯০ বছর বয়সে। গত ১৭ আগস্ট; সোমবার। যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে নিজ বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। জন্মভূমি ভারতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে লকডাউন আরোপের পর তিনি মার্চে সেখানে গিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ভ্রমণের অনুমতি তুলে নেওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই থাকতে চেয়েছিলেন পন্ডিতজি। তার জ্যেষ্ঠ শিষ্যদের অন্যতম সঞ্জীব অভয়ঙ্কর বললেন, ‘তিনি একজন অতুলনীয় প্রতিভা, এমন কেবল শতাব্দীতে একটিই জন্মাতে পারে।’ দেশের এই মহাশিল্পীর প্রতি পরম শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘তার প্রতিদান সামান্য নয়। তিনি অনন্য শিক্ষাগুরু হিসেবেও গড়ে তুলেছেন অন্য অনেক কণ্ঠশিল্পীকে। শিল্পীকে কীভাবে, কোন পর্যায়ে গড়তে হয় তারও মাপকাঠি তিনি। ফলে আমাদের দেশের সংগীতের নায়ক তিনি। তার চলে যাওয়া ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের বিরাট ক্ষত। এ মোচনের নয়। গভীর ও অতি কোমল সেই স্বরযন্ত্রটি যে তারই। তিনি ভারতের পুরনো ধারার সংগীত শিক্ষাগুরুদের একজন, যারা সারা বিশ্বে এ ধারার গুণগান গেয়েছেন। ভীমসেন যোশী ও কিশোরী আমানকরের যোগ্য উত্তরসূরি তিনি। নিজে শিখিয়েছেন একেবারে শেষদিন পর্যন্ত, এমনকি অনলাইন মাধ্যমেও!’ তখনো তার স্বর অবিশ্বাস্য রকমের শক্তিশালী ছিল। কেবল লতা মুঙ্গেশকরের সঙ্গেই তা তুলনীয়। বয়সকে যেন আটকে দিয়েছিল পন্ডিতজির কণ্ঠটি। বিশ্বখ্যাত সুরকার, অস্কারজয়ী এ আর রহমান বলেছেন, ‘ভারত তার সবচেয়ে বড় তারকাদের একজনকে হারাল।’ তার আরেক জ্যেষ্ঠ শিষ্য কণ্ঠশিল্পী কালা রামনাথ বলেছেন, ‘বেড়ে ওঠার সময় তার মতো এমন বাবা আমি আর পাইনি। তিনিই আমার দেখা যে কারও জন্য সেরা ওস্তাদ। সর্বদিকেই অসাধারণ প্রতিভাবান মানুষ। সংগীত এমনই বিমূর্ত যে- নোটগুলো জায়গামতো বসিয়েও কেউ তা দেখতে পারে না। তবে তিনি আমার মনের মধ্যে সেগুলোর দেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নোটগুলোর প্রতিটিতেই সুর বাঁধা আছে। তার সঙ্গে আমি দূরদূরান্তে সংগীত নিয়ে গিয়েছি। প্রতিবারই তিনি আমার প্রশংসা করেছেন। অনেক উঠতি সংগীতশিল্পীকেও এই ভালোবাসার চাদর দিয়ে সামনে এগিয়ে দিয়েছেন। সবসময়ই তিনি তাদের গানের পর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন, শিখিয়েছেন। কোনোকিছুই নিজের মধ্যে নিজের জন্য রাখেননি। সারা জীবন গানের মাধ্যমে নিঃশ্বাস নিয়েছেন। আমাদের শিখিয়েছেন। সর্বক্ষণই শেখানোর তাড়নায় ছিলেন। খাবার টেবিলে, বেড়ানোর সময়ও সংগীত ছাড়া তার মধ্যে আর কিছু ছিল না। এই ভুবনই আমার গুরুর জীবনের আশ্রয় ও ভালোবাসা ছিল।’