প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি সরকার দুর্নীতির বিষবৃক্ষ রোপণ করে গেছে, বাংলাদেশ এখন তার ফল ভোগ করছে। তিনি বলেন, ‘বিএনপির কাছে ক্ষমতা হলো দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা কামানোর উপায় এবং দেশ এখন তাদের পাঁচ বছরের দুঃশাসনকালে রোপণ করা বিষবৃক্ষের মূল্য দিচ্ছে। বর্তমান সরকার একের পর এক দুর্নীতি উদঘাটন এবং এর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করছে।’ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার এক স্মরণসভায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
সভাটি হয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আলোচনা সভায় সূচনা বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। এসময় দলের কেন্দ্রীয় নেতারা দলীয় কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা এবং ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোটকে অভিযুক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হত্যাকান্ড বিএনপির অভ্যাস। তারা দেশের স্বাধীনতা ও যুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, তারা (বিএনপি) এখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লম্বা লম্বা কথাবার্তা বলছে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছে যে, তাদের আমলে বাংলাদেশ পর পর পাঁচবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সবাই তা ভালো করেই জানে।’
তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপি এত বিপুল পরিমাণ অর্থোপার্জন করেছিল যে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাজাপ্রাপ্তদের একজন বিদেশে বিলাসী জীবনযাপন করছে। আমরা এ রকম জীবনযাপন করতে পারি না, তবে তারা পারে। কোথা থেকে তারা এ অর্থ পাচ্ছে? (শুনেছি) তারা ‘জুয়ার আড্ডা’ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া দায়িত্ব গ্রহণের পর তার স্বামী সামরিক একনায়ক জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দেশজুড়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে পোস্টিং দিয়ে পুরস্কৃত করেছিলেন। জিয়াউর রহমান হত্যাকারী ফারুক-রশীদের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং বিবিসিসহ বিভিন্ন মিডিয়াকে দেওয়া তাদের সাক্ষাৎকার থেকে তা প্রকাশিত হয়েছিল এবং এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, পরবর্তীকালেও খুনিদের সঙ্গে জিয়ার সম্পর্ক ছিল।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা করিয়েছিলেন এবং তার ছেলে তারেক রহমান এতে জড়িত ছিল। যারা হামলা চালিয়েছিল তাদের স্বীকারোক্তি থেকে হামলার পরিকল্পনা এবং কোথায় ও কীভাবে তারা হামলা চালানোর ষড়যন্ত্র করেছিল তা বের হয়ে এসেছে।’ গ্রেনেড হামলার প্রমাণ নষ্ট করার জন্য বিএনপি সরকারকে দায়ী করে শেখ হাসিনা প্রশ্ন করেন, ‘বিএনপি যদি জড়িত না হয়, তাহলে কেন তারা প্রমাণ নষ্ট করেছিল?’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেদিন হামলার পর পুলিশ হতাহতদের উদ্ধারের পরিবর্তে হামলাকারীদের নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে সুযোগ দেওয়ার জন্য টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ করে।’
‘তৎকালীন বিএনপি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই ধরনের বর্বরোচিত হামলা সম্ভব হতো না। বিএনপি সরকার সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং বিদেশে পালানোর সুযোগ সৃষ্টি করেছিল।’ বিএনপি সরকার এই হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন ভেবেছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু আমি এই হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছি এবং যখন বিএনপি সরকার শুনল যে আমি মারা যাইনি, তখন তারা চারজন খুনিকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।’
গ্রেনেড হামলায় তৎকালীন অনেক বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য আহত হয়েছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এই হামলার নিন্দা জানাতে জাতীয় সংসদে একটি প্রস্তাব আনতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেত্রী খালেদা জিয়া বিষয়টি নিয়ে ঠাট্টা করে বলেছিলেন যে, তাকে (শেখ হাসিনা) কে হত্যা করবে?’
শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে যুক্তরাষ্ট্রে অপহরণের পর হত্যার পরিকল্পনা করেছিল এবং এফবিআই তদন্ত থেকে এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বিএনপির এক নেতাকে দোষী সাব্যস্ত ও সাজা প্রদান করা হয় এবং আদালতের রায়ে বিএনপি নেতা মাহবুবুর রহমান ও শফিক রহমানের নাম প্রকাশ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই অপরাধের জন্য যে ব্যক্তি সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, তিনি তারেক জিয়ার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন। আমরা এ বিষয়টি জানতে পারতাম না যদি এফবিআই এর তদন্ত না করত এবং এ ব্যাপারে রায় প্রদান না করা হতো।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রী তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে বর্তমান করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে জনগণের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সাহায্য করার জন্য দলের সকল নেতাকর্মী ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘দেশের কোনো রাজনৈতিক দল এভাবে জনগণের পাশে দাঁড়ায়নি। দলের অনেক নেতাকর্মী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন।’ তিনি নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।
কভিড-১৯ পরিস্থিতিকে একটি বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী এর সংক্রমণ থেকে রক্ষায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা লক্ষ্য অর্জনে অনেক অগ্রগতি লাভ করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, করোনাভাইরাস সবকিছু আটকে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও আমরা অর্থনৈতিক কাজের চাকা সচল রেখে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’
তার জীবননাশের অপচেষ্টা বেশ কয়েকবার করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহ অবশ্যই ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা থেকে আমাকে রক্ষা করে কিছু কাজ দিয়েছেন। এগুলো শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি যেন চালিয়ে যেতে পারি এবং সর্বশক্তিমান আমাকে সেই সুযোগ দেবেন এবং আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলব।’ বাংলাদেশের জনগণ করোনাভাইরাস থেকে যেন রক্ষা পায় এবং দেশের উন্নয়নের গতি যাতে অব্যাহত থাকে এজন্য শেখ হাসিনা সবাইকে দোয়া করার আহ্বান জানিয়েছেন।