ইরান-তুরস্কের মিত্র হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ঢুকছে চীন

ইরান ও তুরস্ককে উদ্ধারের জন্য রীতিমতো টাকার বস্তা নিয়ে মাঠে নেমেছে চীন। দুটি দেশেরই অর্থনৈতিক অবস্থা খুব বেশি সুবিধার নয়। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ সংকট, করোনার দুর্যোগ একদিকে যেমন ইরানকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে অপরদিকে তুরস্কও বৈদেশিক মুদ্রা সংকট, বেকারত্ব বৃদ্ধি, বাজেট ঘাটতি নিয়ে কঠিন সময় পার করছে। এই অবস্থায় ইরান ও তুরস্কে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সক্রিয় হচ্ছে বিরোধী পক্ষ। তুরস্কে ধর্মনিরপেক্ষ ও কট্টর ইসলামপন্থিরা প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বিরুদ্ধে অনেক দিন ধরেই একজোট হয়েছে। ইরানে কট্টরপন্থিরা প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করছেন। এর মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট বিরোধী পালে হাওয়া দিচ্ছে। সব মিলিয়ে ঘোর অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরান ও তুরস্ককে দুঃসময় থেকে বের করার জন্য মাঠে নেমেছে চীন।

সম্প্রতি চীন ও ইরানের মধ্যে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। উভয় দেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে চুক্তিটি। তুরস্ককেও লিরার বিনিময়ে ৪০০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার চুক্তি করেছে চীন। উভয় দেশের সঙ্গেই চীনের অর্থনৈতিক লেনদেনের বিষয়টি গত মাসে প্রকাশ্যে এসেছে। ২০১৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরানের অর্থনীতি দিন দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে। পুনরায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে চিঠি দিয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের দাবিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নাকচ করে দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সংকটের মধ্যেই করোনার আঘাত পরিস্থিতিকে আরও অবনতিশীল করেছে। তবে ইরানের অর্থনীতি নিষেধাজ্ঞার কারণে একেবারে ভেঙে পড়েনি। যদিও বেকারত্ব বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে, মূল্যস্ফীতি ঘটেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বিপরীতে আমদানি কমে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন খাতের উৎপাদন বেড়েছে। গত কয়েক দশকে ইরান একাধিকবার আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করতে হয় তা ইরানের শাসকদের ভালো করেই জানা আছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের হিসাব মতে ইরানের চলতি বছর জিডিপি কমেছে ৯ শতাংশ। ইরানের নিজস্ব হিসাবে তা আরও বেশি। তেল রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। নিষেধাজ্ঞার আগে ইরানের দৈনিক তেল  উত্তোলনের পরিমাণ ছিল ২ বিলিয়ন ব্যারেল। এখন যৎসামান্য যা উত্তোলিত হচ্ছে সেটার অধিকাংশই রপ্তানি হচ্ছে চীনে। ওদিকে তুরস্কে অর্থনৈতিক ঘাটতি দিন দিন বাড়ছেই। গত এপ্রিলে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫.৬ বিলিয়ন ডলার। অথচ ২০১৯ সালের শেষ দিকে ছিল ৫০০ মিলিয়নের কাছাকাছি। অভ্যন্তরীণ সংকট, দুর্নীতিসহ নানা কারণে তুরস্কে ঘাটতি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এর সঙ্গে করোনাকালে পর্যটক সংখ্যা ভয়াবহ রকম কমে যাওয়া তুরস্কের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতিতে চীন দৌড়ে এসেছে তুরস্ক ও ইরানের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে। চীনের লজিস্টিক কোম্পানি ৯৪০ মিলিয়ন ডলারে কোমপোর্টের ৪০ শতাংশ কিনে নিয়েছে। কোমপোর্ট মারমারা সাগরের তীরে  তুরস্কের  তৃতীয় বৃহত্তম বড় কনটেইনার টার্মিনাল। সুলতান সেলিম ব্রিজও তুরস্ক চীনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে ৬৮৮ মিলিয়ন ডলারে। তুরস্কের সব থেকে বড় অনলাইন শপিং প্লাটফরম ট্রেন্ডিওলকে চীনের আলিবাবা কিনে নিয়েছে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তুরস্ক থেকে সংকটের কথা বলে ইউরোপীয় ও আমেরিকান বিনিয়োগকারীরা চলে যাচ্ছে। এ কারণে তুরস্কের বৈদেশিক বিনিয়োগে যে শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে তা পূরণ করতে চীন এগিয়ে আসছে।

ইরান ও তুরস্কের প্রতি চীনের আর্থিক সহয়তাকে পশ্চিমারা বরাবরই ঋণ কূটনীতি বলে উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন দেশকে ঋণ দিয়ে চীন বিভিন্নভাবে আবদ্ধ করে ফেলছে। ঋণের এই ফাঁদ থেকে অনেক দেশে বের হতে পারবে না বলে শঙ্কা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হিসেবে ১৯৫০ সালে কোরীয় যুদ্ধে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। সেই তুরস্ক এখন আর্থিক সংকটের মুখে। চীন চাইছে তুরস্কের মুদ্রা লিরাকে রক্ষা করতে। চীন চাইছে  না ১৯৯০ সালে আর্জেন্টাইন মুদ্রা পেসোর মতো মুখ থুবড়ে পড়ুক লিরা। ওই সময় মার্কিন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আর্জেন্টিনায় বিনিয়োগ করে আর্জেন্টিনার মুদ্রাকে বঁঁচাতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত পারেনি। আর্জেন্টিনাও মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ আর পরিশোধ করতে পারেনি।  তবে অব্যাহত চীনা বিনিয়োগের নানা ঝুঁকি আছে। এর আগে চীন ঋণ দিয়ে কেনিয়ায় বন্দর নির্মাণ করে দিয়েছিল। পরে কেনিয়া ঋণ শোধ না করায় বন্দরটি নিয়ে নেয় চীন। তাজিকিস্তান চীনের ঋণ শোধ করছে স্বর্ণখনি ও জমি দিয়ে। কিন্তু ইরান ও তুরস্কের সামনে আপাতত কোনো বিকল্প নেই। কারণ ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আছে। আর নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকটের কারণে সম্ভাব্য গণবিদ্রোহের পথ বন্ধ করতে হলে ইরানের সহায়তা প্রয়োজন। আর তুরস্ক চেয়ে আছে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার নির্বাচিত হয়ে ন্যাটোর সদস্য হিসেবে কিছু সহায়তা করবেন এবং তুরস্ককে দেউলিয়া ঘোষণা থেকে আইএমএফকে বিরত রাখতে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। কিন্তু সেই পর্যন্ত তুরস্ককে টিকে থাকতে হবে। এসব দিক বিবেচনা করেই ইরান ও তুরস্ক চীনের ঋণের দিকে ঝুঁকেছে।

কিন্তু চীন কেন উদার হস্তে ইরান ও তুরস্ককে সহায়তা করছে? এর সহজ উত্তর হচ্ছে চীন আঞ্চলিক শক্তির তকমা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। গত শতকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সোভিয়েত রাশিয়া। সমরশক্তিতে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টেক্কা দিলেও আর্থিকভাবে তেমন শক্তিশালী ছিল না। ২১ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। বর্তমানে চীনের আর্থিক শক্তি সোভিয়েত রাশিয়ার থেকে অনেকগুণ বেশি। এই শক্তি দিয়ে চীন বিভিন্ন দেশকে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এ যুক্ত করে নিজস্ব শক্তিমত্তার পরিচয় দিতে চাইছে। চীনের এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেলে  দিয়েছে। ইরান তার বিশাল সামরিক শক্তি, তেল ও গ্যাসের ভান্ডার নিয়ে চীনের সঙ্গে মিলে পারস্য উপসাগরীয় এলাকার ভূ-রাজনীতিকে বদলে দিতে পারে। বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন ইরানের ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, যোগাযোগ খাত বিশেষ করে বিমানবন্দর, রেলপথ ও ফ্রি ট্রেড জোনে কাজ করার সুযোগ পাবে। চীন ইরানের সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করতে চায়। সম্প্রতি ইরানে একাধিকবার সাইবার হামলা হয়েছে। ইরানের পরমাণু অবকাঠামো রক্ষার জন্যও শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা দরকার।

স্বভাবতই ইরান ও তুরস্ক চীনের ঘনিষ্ঠ হতে চাইছে। তুরস্ক ও ইরানে চীনের বিনিয়োগ যত বৃদ্ধি পাবে আন্তর্জাতিক পরিম-লে চীন ততই এই দুই দেশের পক্ষে কথা বলবে। নিজের ভেটো শক্তিকে কাজে লাগবে। নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। নিজস্ব বিনিয়োগ রক্ষার জন্যই চীন উদ্যোগী হবে। এখানে উভয় পক্ষেরই স্বার্থ আছে। যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত মধ্যপ্রাচ্যের বিপরীতে নতুন এক অক্ষের সৃষ্টি করবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষ শক্তিকে আরও জোরদার করবে। রিয়াদ ও তেলআবিব আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে চীন ইরান ও তুরস্ককে তাদের মুদ্রার বিপরীতে ডলার প্রদান করবে। এতে করে চীনের নতুন মুদ্রা ই-আরএমবিকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ডলার মূল্য কমে আসবে। ই-আরএমবির মাধ্যমে অনেক দেশই তখন ইরান থেকে তেল কিনতে পারবে।

ইরান ও তুরস্ক উভয় দেশই চীনা বিনিয়োগ উপভোগ করছে। এমনকি ইরান সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ও রেলপথ তৈরির প্রকল্প থেকে ভারতকে বাদ দিয়েছে। কিন্তু চীনের সহযোগিতা নিয়ে সমালোচনাও হচ্ছে। চীনের অর্থ দিয়ে সংকট কতটা মোকাবিলা করা যাবে তা নিয়ে শঙ্কিত উভয় দেশেরই অনেক রাজনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। ইরানের সাবেক রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আহমাদিনেজাদ অভিযোগ করেছেন জাতিকে না জানিয়েই এসব চুক্তি করা হচ্ছে। রক্ষণশীল ইরানি রাজনীতিবিদ আলি মোতাহারি উইঘুরদের নির্যাতনের মুখে এই চুক্তি না করার দাবি জানিয়েছেন। তুরস্কের সরকার বিরোধীরা সরাসরি চীনের বিনিয়োগের বিরোধিতা করছেন না। তবে সরকারের সমালোচনা করার সুযোগ হাতছাড়া করছেন না।

চীনের বিনিয়োগে স্বভাবতই যুক্তরাষ্ট্র নাখোশ হয়েছে। সঙ্গে ইসরায়েলও চাইছে না ইরান ও তুরস্কে চীনের আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি পাক। আর অর্থনৈতিক সহযোগিতার কথা বলা হলেও এসব চুক্তি নেহায়েতই সহযোগিতার সাধারণ চুক্তি নয়। এ চুক্তিগুলোতে বিভিন্ন সামরিক ও কারিগরি বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। ইরানের সঙ্গে চুক্তির আওতায় অবকাঠামো খাতে বিশাল বিনিয়োগ ছাড়াও গোয়েন্দা তথ্যবিনিময় করবে দেশ দুটি। বিনিময়ে ইরান চীনকে কম পয়সায় তেল প্রদান করবে।

শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি সম্পন্ন হলে এবং তুরস্কের সঙ্গে শক্তিশালী আর্থিক সম্পর্ক স্থাপিত হলে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া মাইনরে চীনের উপস্থিতি ও গুরুত্ব বাড়বে। একদিকে চীন ভূমধ্যসাগরে  প্রবেশের সুযোগ পাবে। অপরদিকে পারস্য উপসাগর হয়ে আরব সাগরেও ঢুকে পড়বে। এসব কারণে ভূ-রাজনৈতিকভাবে সমগ্র আরবে চীনের প্রভাব সন্দেহাতীতভাবে বৃদ্ধি পাবে যা ইসরায়েলের মাথাব্যথার কারণ হবে। চীন হয়তো সরাসরি ইসরায়েলের বিপক্ষে মাঠে নামবে না। তবে প্রধান দুই বিরোধী শক্তিকে সহায়তা করে টিকে থাকতে সহায়তা করা ইসরায়েলের জন্য শঙ্কার বিষয়ই বটে। তবে এমন না যে চীন সহায়তা না করলে তুরস্ক ও ইরান ধুলায় মিশে যাবে। কিন্তু চীনের বিনিয়োগ তাদের শক্তি জোগাবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক