সহজে ব্যবসাকরণ সূচকে উন্নতি আনতে আরও চার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। দেশে বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি কমাতে এক জায়গায় সব সেবা নিশ্চিতে (ওয়ান স্টপ সার্ভিস) কাজ করছে বিডা। এরই অংশ হিসেবে গতকাল ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সেবা এক জায়গায় পেতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এসব চুক্তির ফলে আগামীতে অনলাইন যোগাযোগসাপেক্ষে ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) পোর্টালের মাধ্যমে মোট ১৩টি সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে। বর্তমানে ওএসএস পোর্টালে ২১ ধরনের সেবা দিচ্ছে বিডা। গতকাল বিডা এ তথ্য জানিয়েছে।
২০১৯ সালে ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১৬৮তম, যা আগের বছর ছিল ১৭৬তম। এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান ৭২তম, ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ১১৯তম, ব্যবসা শুরুর খরচের দিক থেকে ১৩১তম, কর প্রদানে ১৫১তম। এছাড়া নির্মাণ অনুমতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৫তম, বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে ১৭৬তম এবং জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ১৮৪তম অবস্থানে। ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে ৯৯তম স্থানে আসার ঘোষণা রয়েছে সরকারের। এ সূচকে উন্নতি করতে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে ব্যবসার পরিবেশ সহজীকরণের উদ্যোগ নিচ্ছে বিডা।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ব্যবসার পরিবেশকে ১০টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে স্কোর করা হয়। যে ১০টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয় সেগুলো হলো ব্যবসা শুরু, অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি, বিদ্যুতের প্রাপ্যতা, সম্পত্তি নিবন্ধন, ঋণের প্রাপ্যতা, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, কর পরিশোধ, বৈদেশিক বাণিজ্য, চুক্তির বাস্তবায়ন এবং অসচ্ছলতা দূরীকরণ। বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশকে ৯৯তম আনতে প্রায় চার বছর আগে ৮৮টি সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরে। কিন্তু এ সময়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অনাগ্রহে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হয়নি। তবে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমাতে এক জায়গায় সব সেবা দিতে বিডা তার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ভোগান্তি ছাড়া বিভিন্ন সেবা নিশ্চিতে চার সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেছে বিডা। এর ফলে ভূমি মন্ত্রণালয় বিডায় নিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের দ্রুততম সময়ে ই-মিউটেশন, ই-খতিয়ান ও মিউটেড খতিয়ান সেবা অনলাইনে দেবে। আর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, প্ল্যান অনুমোদন, বৃহৎ ও বিশেষায়িত প্রকল্পের ছাড়পত্র এবং দখলের সনদ সেবা ওয়ান স্টপ সার্ভিস পোর্টালের মাধ্যমে দেবে। এর ফলে অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতির যে সূচকটি রয়েছে, তাতে উন্নতি আসবে। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ অবস্থানগত ছাড়পত্র প্রদান, পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান, পরিবেশগত ছাড়পত্র নবায়ন ও ইআইএ অনুমোদন দেবে। আর ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) অনলাইনে সার্টিফিকেট অব অরিজিন ও মেম্বারশিপ সার্টিফিকেট প্রদান করবে।
সমঝোতা স্মারক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া বলেন, ওএসএস মাধ্যমে বিনিয়োগে আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যাতে প্রযুক্তির ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ে কম খরচে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আন্তর্জাতিক মানের বিনিয়োগ সেবা পেতে পারেন।
এ সময়ে অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর নয়, দ্রুত এর বাস্তবায়ন ঘটিয়ে, প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ কাজে লাগিয়ে ওএসএসের মাধ্যমে একই প্ল্যাটফর্ম থেকে বিনিয়োগকারীকে আমাদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। আর সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে বিডা।’
অনুষ্ঠানে বিডার মহাপরিচালক ওহিদুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ও পরিচালক জীবন কৃষ্ণ সাহা রায় ওএসএস বর্তমান তথ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উপস্থাপনা করেন। এছাড়াও নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে জয়নুল হাসান (সচিব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়), মো. মাকছুদুর রহমান পাটোয়ারী (সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়), মো. শাহিদ উল্লা খন্দকার (সচিব, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়) এবং শামস মাহমুদ, (সভাপতি, ডিসিসিআই) প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
২০১৯ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি অনলাইনভিত্তিক ওয়ান স্টপ সার্ভিস পোর্টালের কার্যক্রম চালু করে বিডা। ভবিষ্যতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস পোর্টালের মাধ্যমে ৩৫টি সেবা প্রদানকারী সংস্থার ১৫৪টিরও বেশি সেবা প্রদান করা হবে। বর্তমানে বিডা ওয়ান স্টপ সার্ভিস পোর্টালের মাধ্যমে সাতটি সংস্থার ২১টি সেবা প্রদান করছে। এর মধ্যে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর নামের ছাড়পত্র, কোম্পানি নিবন্ধন ছাড়াও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অনলাইনে ই-টিআইএন সেবা দিচ্ছে। এছাড়া বিডা প্রকল্প নিবন্ধন, অফিস স্থাপনের অনুমতি, ভিসা সুপারিশ, কর্মানুমতি, রেমিট্যান্স সার্ভিসেসসহ মোট ১৪ ধরনের সেবা দিয়ে থাকে। অনলাইন পেমেন্টে সোনালী ব্যাংক, আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইকরণে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, বিদেশি নাগরিকদের অনুকূলে সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স প্রদানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ ও ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্রে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে সেবা দিয়ে থাকে।
এর বাইরে বৈদ্যুতিক সংযোগ প্রদান, ই-ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন, বিআইএন সার্টিফিকেট প্রদান, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্স প্রদান, আয়কর রিটার্ন দাখিল, বিদেশি কোম্পানির (ব্রাঞ্চ/লিয়াজোঁ/রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিস) নিবন্ধন, পরিচালকমন্ডলীর তালিকা পরিবর্তন, মূলধন বাড়ানো, রিটার্ন ফাইলিং আমদানি-রপ্তানি নিবন্ধন সনদ প্রদান ও ট্রেড লাইসেন্স প্রদানসহ আরও ২৮টি সেবা ওএসএস পোর্টালের মাধ্যমে প্রদান করতে এনবিআর, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ডেসকো, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।
বিডার কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে উন্নতি আনতে ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইন সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আইনটি সংশোধন প্রক্রিয়া ঝুলে আছে। আইনটি সংশোধন করা গেলে ব্যবসা শুরুর যে সূচকটি আছে, সেখানে ব্যাপক উন্নতি করা সম্ভব হবে।