৫২ শতাংশ হাসপাতাল সনদ নবায়নের আবেদন করেনি

দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর লাইসেন্স নবায়নের জন্য এক মাসের সময় বেঁধে দিয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত টাস্কফোর্স। গতকাল রবিবার নির্ধারিত সময় পার হয়েছে। এ সময় সারা দেশে লাইসেন্সের মেয়াদ নেই এমন হাসপাতালের ৫২ শতাংশই লাইসেন্স নবায়নের জন্য কোনো আবেদন করেনি। অর্থাৎ লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ এমন ৮ হাজার ৪৮১টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ৪৮ শতাংশ বা হাজারের মতো নতুন আবেদন পড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমেত, ৮ আগস্টের পর থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে চার হাজারের মতো নতুন আবেদন পড়েছে নবায়নের জন্য। সারা দেশে মোট হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাডব্যাংক মিলে মোট প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৩ হাজারের মতো। এর মধ্যে বর্তমানে লাইসেন্স আছে ৪ হাজার ৫১৯টির। এর বাইরে লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ৪ হাজার ৩০০ প্রতিষ্ঠান। সবকিছু ঠিক থাকলে এক মাসের মধ্যে এসব হাসপাতালের লাইসেন্স পেয়ে যাওয়ার কথা।

ফলে যে ৫২ শতাংশ হাসপাতাল সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে লাইসেন্স নবায়নের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনলাইনে আবেদন করেনি, তাদের ক্ষেত্রে সরকার কী ব্যবস্থা নেবে এ নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। নবায়নের জন্য আবেদন না করায় এসব হাসপাতাল কি বন্ধ হয়ে যাবে, এসব হাসপাতাল মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, নাকি নবায়নের জন্য সময় বাড়ানো হবে এমন প্রশ্ন বিভিন্ন মহলে।

এসব নিয়ে গতকাল সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ সঠিক কোনো তথ্য জানাতে পারেনি। কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই ‘ভেবে দেখবেন’ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্পষ্ট জানিয়েছে, বিষয়টি এখন আর তাদের হাতে নেই। যেহেতু এ ব্যাপারে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, তাই টাস্কফোর্স যে সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই বাস্তবায়ন করবে অধিদপ্তর। অথচ গত ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকে জানানো হয়, ২৩ আগস্টের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন না করলে বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হবে। এর আগে গত ২৩ জুলাই ৯ সদস্যের এ টাস্কফোর্স গঠন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্সের ব্যাপারে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত একটা সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। আজ (গতকাল) সেটা শেষ হলো। যারা লাইসেন্স নবায়ন বা লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে, সে আবেদনগুলো আমরা দেখব। এগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করা হবে। যারা যোগ্য হবে লাইসেন্স পাবে। আর যারা একেবারেই আবেদন করেনি, তাদের ব্যাপারে ভাবব কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। শুধু সময়সীমা শেষ হলো। সর্বশেষ পরিস্থিতি দেখে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়, দেখা হবে।

অন্যদিকে যেসব হাসপাতাল লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেনি, সেসব হাসপাতালের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দিকে তাকিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ ব্যাপারে অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজ (গতকাল) আবেদনের শেষ তারিখ ছিল। এখন আমরা সর্বশেষ পরিসংখ্যান হিসেবে করে মোট হাসপাতালের সংখ্যা, এর মধ্যে যাদের লাইসেন্স নেই ও যাদের লাইসেন্স নবায়ন হয়নি, এসব তথ্য আমরা মন্ত্রণালয়ে (স্বাস্থ্য) দেব। মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নেয়, সেই সিদ্ধান্ত আমরা বাস্তবায়ন করব।

সেই ক্ষেত্রে যেসব হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেনি, সেসব হাসপাতালের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে জানতে চাইলে এ পরিচালক বলেন, যেসব হাসপাতাল-ক্লিনিকের লাইসেন্স আদৌ নেই, সেগুলো হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। যেগুলো হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন নেই ও আবেদনও করেনি, সেগুলোর নবায়নের ব্যবস্থা করতে পারি অথবা সেগুলো হয়তো বন্ধ করে দিতে পারি। বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সেটা নির্ভর করবে মন্ত্রণালয় কী সিদ্ধান্ত দেয়, সেটার ওপর। যে হাসপাতাল ২৩ আগস্টের মধ্যে নবায়নের জন্য আবেদন করেনি, তারা নবায়নের জন্য আরও কিছুদিন সময় পাবে কি না জানতে চাইলে পরিচালক বলেন, এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।

বিশেষ করে আইসিডিডিআর,বিসহ সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত যেসব হাসপাতাল লাইসেন্স করা বা নবায়নের ক্ষেত্রে আগ্রহী নয়, তাদের ব্যাপারেও মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকার কথা জানান পরিচালক ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া। হাসপাতালের মধ্যে যাদের লাইসেন্স নবায়ন নেই, তাদের ক্ষেত্রেও আর সেসব প্রতিষ্ঠান কর্র্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর।

লাইসেন্স নেই বা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সধারী হাসপাতালের ক্ষেত্রে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের এমন সিদ্ধান্তহীনতার সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, স্বাস্থ্য বিভাগ এসব খেলা বছরের পর বছর খেলে আসছে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসপাতালগুলোকে একটা নিয়মের মধ্যে না আনতে পারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দক্ষতার অভাব। এর কারণ লোকবলের অভাব। এছাড়া খুব ভালো একটা পলিসিও হয়নি। যেমন নতুন লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়ন করার বিষয়টা বিকেন্দ্রীকরণ করা যায়। বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যে ক্লিনিক-হাসপাতাল আছে, সেগুলোর দায়িত্ব স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে দেওয়া যায়, তাহলে কিন্তু কোনো সমস্যা হয় না।

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, শুধু লাইসেন্স দেওয়া বা নবায়ন করাই মূল কাজ নয়; স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো কী সেবা দিচ্ছে, কত টাকা ফি নিচ্ছে, সব দেখভাল করতে হবে। এসব দেখার জন্য একটা পরিকল্পনা থাকবে, পলিসি থাকবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, আমরা এত প্রযুক্তির কথা বলছি, তাহলে সেটা বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন? ডেটাবেজ নেই কেন? যদি কোনো হাসপাতালের লাইসেন্স না থাকে বা নবায়ন না থাকে, সেই হাসপাতাল যদি রোগীর ডায়াগনসিস করে, তাহলে সেই রিপোর্ট যেন বেরোতে না পারে, সেটা কেন্দ্রীয়ভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন কোনো হাসপাতালের একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট চলে গেল। সে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার রিপোর্ট অধিদপ্তরে চলে যাবে। অধিদপ্তর থেকে ওই হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ডায়াগনসিস বন্ধ করে দিতে হবে। এভাবে প্রত্যেকটা বিভাগ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে।

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, স্বাস্থ্যসেবা কীভাবে জনবান্ধব হবে, সেসব চিন্তাভাবনার ধারেকাছেও নেই। একটা লাইসেন্স দিতে হয়, দেয়। নামমাত্র দেখাশোনা হয়। আর টাকা-পয়সার লেনদেন। যাদের প্রভাব আছে, তারা কোনোকিছুই মানছে না। তাই হাসপাতালগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনতে এই যে সময় দেওয়া-নেওয়া, এ খেলা আজকের নয়। এ খেলা বছরের পর বছর চলছে। এ খেলা শেষও হবে না।

যেসব হাসপাতালের লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ ও নবায়নের জন্য আবেদন করেনি, এমন হাসপাতালের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন ডা. বে-নজীর আহমেদ। তিনি বলেন, যেটা বৈধ না, সেটা যত প্রভাবশালীরই হোক, সেসব হাসপাতাল-ক্লিনিক বন্ধ করে দিতে হবে। সেসব হাসপাতালের মালিকদের আইনের অধীনে জেল দেওয়া। এরকম ঘটনা যখন ঘটবে, তখন ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোও সতর্ক হবে। অর্থাৎ সবাইকে সঠিকভাবে চলতে হবে। এর বাইরে কোনো উপায় নেই।

একইভাবে যেসব হাসপাতাল স্ট্যান্ডার্ড নয়, সেসব হাসপাতাল বাজারে না থাকাই ভালো বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেশিরভাগ হাসপাতালই লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেছে। আমি শেষ পর্যন্ত যে সংখ্যা দেখেছি, সেটা বেশ ভালো। আমরাও চাই সবাই নিয়মের মধ্যে আসুক। আমরাও চাই হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো স্ট্যান্ডার্ড হোক। যেগুলো স্ট্যান্ডার্ড নয়, সেগুলো বাজারে না থাকুক। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত সমস্ত কিছু রাখার জন্য যেটা ভালো, সেটাই হবে।

এ নেতা বলেন, অনেক হাসপাতাল নবায়নের ক্ষেত্রে নানা জটিলতার কথা বলছে। সেটা দেখা যাক। এখন তো শুধু জমা পড়েছে। সেগুলোর তথ্য যাচাই-বাছাই হবে। কী পরিমাণ থাকে, কী পরিমাণ বাদ পড়ে, সেটা দেখা যাক। তখন পরিস্থিতি বুঝে কী করা যায়, আমরা দেখব। তবে হাসপাতালগুলোর রেসপন্স ভালো।

‘তবে আমি চাই সবকিছু নিয়মের মধ্যে আসুক। জটিলতা না করে, সহজভাবে, যেসব প্রক্রিয়া দরকার, সেসব পূরণ করে যেসব হাসপাতাল বৈধ হবে, তারাই থাকবে। আর প্রক্রিয়া যদি পূরণ করতে না পারে, স্ট্যান্ডার্ড যদি বজায় রাখতে না পারে, সেসব হাসপাতালের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। আমরাও চাই না স্ট্যান্ডার্ড বজায় না রেখে কোনো হাসপাতাল-ক্লিনিক থাক’ বলেন ডা. মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা শহরের বড় হাসপাতালের বেশিরভাগই নবায়নের জন্য আবেদন করেছে ও হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ অধিদপ্তরে এসে যোগাযোগ করেছেন ও পরামর্শ নিয়েছেন। বিভিন্ন হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন করতে না চাওয়ার মূল কারণ তাদের চিকিৎসক ও নার্স সংকট। বিশেষ করে নার্স নিয়েই বেশি সমস্যা। দেশে তুলনামূলকভাবে নার্স কম। তাছাড়া আগে নার্সদের বেতন কম ছিল। সরকার তাদের বেতন বৃদ্ধি করেছে। এখন হাসপাতালগুলো এ বেতন দিয়ে প্রয়োজনীয় নার্স রাখতে চায় না। এছাড়া পরিবেশ ও মাদক ছাড়পত্র বিষয়ে জটিলতা রয়েছে।