রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইন্টারনেট সুবিধা

মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা এবার পাচ্ছেন ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা। পাশাপাশি প্রতিটি পরিবার পাবে দেশি মোবাইল ফোন অপারেটরদের দুটি করে সিম ব্যবহারের সুযোগ। তবে তা বাধ্যতামূলকভাবেই রেজিস্ট্রেশন করতে হবে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া বিশেষ কার্ড দেখিয়ে। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কেউ সিম ব্যবহার করলে নেওয়া হবে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা। এদিকে আগামী ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের এই দফায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার দিনকে সামনে রেখে ক্যাম্পগুলোতে সভা করার অনুমতি চেয়েছে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা। তবে এখনো সভা করার অনুমতি মেলেনি।

গতকাল রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে রোহিঙ্গাদের মোবাইল সিম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা অবৈধ পন্থায় মোবাইল সিম ব্যবহার করে আসছিলেন। এক শ্রেণির দালাল চক্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করা মোবাইল সিম ব্যবহার করে নানা অপকর্মও চালিয়ে আসছিলেন তারা। মাদক পাচারসহ মিয়ানমারে নানা ধরনের যোগাযোগ করে আসছেন এইসব সিম দিয়ে। কিছুদিন আগে রোহিঙ্গাদের মোবাইলে কথা বলা রোধ করতে জ্যামার বসিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিও করা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জনসুরক্ষার স্বার্থে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বৈধ উপায়ে মোবাইল ফোনের সুবিধা পাচ্ছিল না। তবে সেখানে কাজ করা বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার নানা সুপারিশে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে।

এই প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন এই সিদ্ধান্তের কারণ হচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বৈধভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ থাকলেও নানা উপায়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের বিভিন্ন মোবাইল ফোন কোম্পানির সিম অবৈধভাবে ব্যবহার করে আসছিলেন। এমনকি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মিয়ানমারের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেন তারা। এইভাবে সিম ব্যবহারের ফলে একদিকে সরকার রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি তারা নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডের মাত্রা বাড়ছে। অপরাধীদের আইনের আওতায়ও আনা যাচ্ছিল না।

ওই কর্মকর্তা বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও এসব তথ্য সরকারের উচ্চ পর্যায়কে অবহিত করেছে। এমনকি সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের সিম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়াসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এসব দিক বিবেচনা করেই মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জানিয়েছেন, নানা দিক পর্যালোচনা ও বিবেচনা করে বাস্তবতার আলোকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মোবাইল নেটওয়ার্ক চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা যাতে কোনো ধরনের অপরাধ কর্মকান্ড চালাতে না পারেন সে জন্য গোয়েন্দা নজরদারি করা হচ্ছে।   

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের চোরাচালানসহ অন্যান্য অপরাধমূলক বিষয়ে কথোপকথন চালিয়ে আসছেন। ভিন্ন দেশের নেটওয়ার্ক থাকায় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে এসব মনিটরিং করতেও সমস্যা হচ্ছে। যে কারণে অনেক তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব হতো না। এতে করে বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য অনেকটা ঝুঁকি তৈরি হয়। বাংলাদেশের সিম ব্যবহার করার সুযোগ মিললে রোহিঙ্গারা কী করছেন বা কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন সেই তথ্য আমরা সহজেই পেয়ে যাব।

গতকাল রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে জননিরাপত্তা সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), পররাষ্ট্র সচিব, বিজিবি, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।  

সভা সূত্র জানায়, গতকালের সভায় আলোচনায় উঠে আসে মিয়ানমার থেকে আগত মোবাইল নেটওয়ার্কের সিগন্যাল এখন বাংলাদেশের ১০ কিলোমিটারের বেশি এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ওই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশি মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা আরোপ করা হলেও মিয়ানমারের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সবধরনের মোবাইল যোগাযোগ চালিয়ে যেতে পারছেন রোহিঙ্গারা। কক্সবাজারের উখিয়া এলাকায় মিয়ানমারের একাধিক মোবাইল অপারেটরের সিমকার্ড গোপনে বিক্রি হয় ক্যাম্প এলাকায়। বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা পর্যন্ত হয়েছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকারের পক্ষ থেকে মিয়ানমারকে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক টেলিকম ইউনিয়নের নীতিমালা অনুযায়ী এক দেশের জন্য বিভাজিত বেতার তরঙ্গের কাভারেজ কোনোভাবেই অন্য দেশের সীমান্তের ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না। মিয়ানমার কর্র্তৃপক্ষ যেন এ ব্যাপারে দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ নেয়। ওই সময় দেশের চারটি মোবাইল অপারেটর রোহিঙ্গাদের কাছে কোনো সিম বিত্রিক্র করতে পারবে না বলে বিটিআরসি থেকে নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

এদিকে আগামীকাল ২৫ আগস্ট মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার দিন। এই দিনকে সামনে রেখে কক্সবাজার ক্যাম্প এলাকায় বিভিন্ন এনজিও সংস্থা সভা করার অনুমতি চেয়েছে সরকারের কাছে। রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে দিনটি যাতে পালন করতে পারেন সে ব্যাপারে স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যাতে ফলাও করে প্রচার করা হয় সে ব্যাপারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী সেলের কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ক্যাম্প এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারে গুরুত্বারোপ করা হয়।