বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকলশ্রমিকদের দেনা-পাওনার হিসাব এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি)। শ্রমিকদের পাওনার হিসাব নিষ্পত্তি করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি গত ৫ জুলাই বিজেএমসিকে চিঠি দেয়। চিঠিতে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে পাটকলগুলোতে নিয়োগপ্রাপ্ত শ্রমিকদের পাওনার হিসাব পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু ১ মাস বাড়তি সময় কেটে গেলেও অদ্যাবদি এই হিসাব চূড়ান্ত করতে পারেনি বিজেএমসি। অন্যদিকে বিজেএমসির কাছে বকেয়া থাকা ক্ষুদ্র চাষি ও ব্যবসায়ীরাও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বিজেএমসি বলছে, সবধরনের পাওয়া পরিশোধে আলাদা বরাদ্দ রয়েছে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। ত্রুটিমুক্ত হিসাব করতে বাড়তি সময় লাগছে।
বিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, শুধু শ্রমিকরাই নন, বিজেএমসির কাছে আরও অনেকের পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি মিল, ব্যাংক, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল রয়েছে। এগুলো পরিশোধ করা হবে। সব মিলিয়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার মতো লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গঠিত কমিটির সভাপতি ও অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগ) শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, শ্রমিকদের পাওনার হিসাবটি বিজেএমসি এখনো আমাদের কাছে পাঠায়নি। আমরা এই হিসাব পাঠাতে গত মাসেই চিঠি দিয়েছিলাম। তারা হিসাব পাঠালে এগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। এরপর এর অনুকূলে অর্থছাড়ের সুপারিশ করা হবে। তিনি বলেন, বিজেএমসি পাওনার হিসাব যত দ্রুত পাঠাবে, তত দ্রুত অর্থছাড় হবে। এখানে কোনো জটিলতা নেই।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিজেএমসি চেয়ারম্যান আবদুর রউফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বন্ধ কারখানাগুলোর শ্রমিকদের পাওনা হিসাব আমরা দ্রুত চূড়ান্ত করব। আমরা কোনো ধরনের গড়িমসি করছি না; বরং সময় নিয়ে একটি নির্ভুল হিসাব করার চেষ্টা করছি। আশা করছি সফল হব। কারণ প্রাথমিক হিসাবের ওপর বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে অডিট করানো হচ্ছে। যেন শ্রমিকরা তার ন্যায্য পাওনাটা পান। তিনি বলেন, বন্ধ হওয়া ২৫টির মধ্যে দুটি মিল চলত দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে। এই দুটি হিসাবের বাইরে থাকবে। বাকি মিলের মধ্যে ১১টির হিসাব চূড়ান্ত হয়েছে। অন্য কারখানাগুলোর হিসাবের ওপর অডিট চলছে। এই অডিট শেষ হলেই অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
বিজেএমসি কর্মকর্তারা জানান, ২৫টি পাটকল অবসায়নের পর শ্রমিকদের সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি মিলগুলো পাবে বকেয়ার ৩০৫ কোটি টাকা, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পাবে ৯৩৭ কোটি টাকা। আর ইউটিলিটি বাবদ আরও ৩০০ কোটি টাকার মতো বকেয়া রয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে পাটকলগুলো অবসায়নের আগ পর্যন্ত পেনশন বকেয়া রয়েছে এমন ১ হাজার ৬০০ কর্মকর্তা তাদের পেনশনের টাকা বুঝে পাবেন। যাদের টাকা গত সাত বছর থেকে আটকা রয়েছে।
অন্যদিকে নিজেদের বকেয়া পাওনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ক্ষুদ্র চাষি ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, বিজেএমসির কাছে তাদের পাওনা ২৬৫ কোটি টাকা। এই টাকা কবে আদায় হবে তা জানেন না তারা। এ প্রসঙ্গে পাট ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক শামীম আহমেদ মোড়ল বলেন, পাট সরবরাহকারী এসব প্রান্তিক চাষি ও ব্যবসায়ীর অধিকাংশই বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণগ্রস্ত। ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংক ঋণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দেনার চাপে তারা দিশেহারা। টাকা পরিশোধের ব্যাপারে দুঃখজনকভাবে উদাসীন হয়ে আছে বিজেএমসি। পাওনা আদায়ে আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করি।
গত ৩ জুলাই একসঙ্গে এসব কারখানার উৎপাদন বন্ধ করে দেয় সরকার। এসব কারখানায় ২৪ হাজার ৮৬৬ স্থায়ী শ্রমিকের বাইরে তালিকাভুক্ত ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক আছে প্রায় ২৬ হাজার। বেসরকারি খাতের পাটকলগুলো লাভ দেখাতে পারলেও বিজেএমসির আওতাধীন মিলগুলো বছরের পর বছর লোকসান করে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে এর পেছনে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতি দায়ী। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো ৪৪ বছরের মধ্যে মাত্র চার বছর লাভ করেছে। ৪৮ বছরে এ খাতে সরকারকে ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। প্রতি বছর শ্রমিকের মজুরিসহ খরচ মেটাতে সরকারের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।