মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন, করোনাভাইরাসের কারণে স্কুল-কলেজ খোলার মতো অবস্থা এসেছে বলে তাদের কাছে মনে হচ্ছে না। তবে এইচএসসি এবং জেএসসি ও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার বিষয়টি কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। আর কওমি মাদ্রাসার উচ্চস্তরের পরীক্ষা (দাওরায়ে হাদিস) নেওয়ার বিষয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গতকাল ভার্চুয়ালি হয় মন্ত্রিসভার বৈঠক। গণভবন প্রান্ত থেকে প্রধানমন্ত্রী এবং সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে মন্ত্রীরা এ বৈঠকে যোগ দেন। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে ‘দ্য বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (সংশোধন) অর্ডার, ১৯৭৩’ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ‘জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নীতি’ অনুমোদন এবং ‘ব্যাংকারস বহি সাক্ষ্য আইন, ২০২০’-এর নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতি অনুমোদন : ‘জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতি-২০২০’-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনে টেকসইভাবে সক্ষমতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। সেজন্য পুষ্টি পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য সরকার অনেক দিন থেকেই জোর দিচ্ছে। এ নীতি গ্রহণের ফলে মানুষের পুষ্টি উন্নয়নের জন্য আরও সুদৃঢ় ও কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, এ নীতিমালার সঙ্গে এসডিজির সংগতি রাখা হয়েছে। পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে এসডিজির উদ্দেশ্যের মিল রয়েছে। পুষ্টি নিরাপত্তা নীতিতে খাদ্যব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাল, ধান বা গমের পাশাপাশি শাকসবজি, ফলমূলসহ অন্যান্য বিষয়কেও এ নীতিমালায় বিবেচনা করা হয়েছে। নীতির সামগ্রিক কাঠামো পুষ্টি সংবেদনশীল খাদ্য ব্যবস্থার উৎপাদনে চলমান দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ পরিকল্পনার পাঁচটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছে। খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ ও খাদ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে পুষ্টিকর নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। এ নীতিমালায় খাদ্য ক্রয়, সংরক্ষণ ও সরবরাহের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাজারমুখী অর্থনীতি গতিশীল করার জন্য সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি নীতিমালায় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ নীতিমালার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট টেকসই উন্নয়নে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে উল্লেখ করে খন্দকার আনোয়ার বলেন, মেধাবী জাতি গঠনে এ নীতিমালা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যৎ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে এটি সহায়ক হবে।
হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের মূলধন বাড়ছে : অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ বাড়িয়ে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন অধ্যাদেশ সংশোধন করে নতুন আইন করতে যাচ্ছে সরকার। মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘দ্য বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন অর্ডার, ১৯৭৩’-এর সংশোধন প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের জানান, খসড়া আইনে সেবার আওতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অনুমোদিত মূলধন ও পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো হচ্ছে। অনুমোদিত মূলধন ১ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৫০০ কোটি টাকা করা হচ্ছে। আগে এটা অনেক কম ছিল। অধ্যাদেশে ১১০ কোটি টাকা করে অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন ছিল। ২০১৯ সালের ২৬ অগাস্ট এই আইন সংশোধনের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা।
ব্যাংকারস বহি সাক্ষ্য আইন : ‘ব্যাংকারস বহি সাক্ষ্য আইন, ২০২০’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ১৮৯১ সালে ব্যাংকার বুক এভিডেন্স অ্যাক্ট ছিল জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রাচীন এই আইনটি নতুন করে করা হচ্ছে। আগের আইনটি বাংলায় রূপান্তর করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনের অনেক কিছু বাস্তবতার সঙ্গে মিলে না। ব্যাংকের ডিজিটাল পদ্ধতি ওই আইনের মধ্যে ছিল না। খসড়া আইনে তথ্য প্রকাশের অনুমতির ক্ষেত্র ও আদালতের এখতিয়ার নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আগে ব্যাংকের কোনো তথ্য প্রকাশ করা হতো না। এখন কিছু ওপেন করা হয়েছে। একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য বাদে অনেক কিছুই প্রকাশ করা হচ্ছে, কারা প্রকাশ করতে পারবেন সেটাও বলে দেওয়া হয়েছে। কিছু অপরাধের শাস্তি ও বিচারের কথা বলা হয়েছে।
বিশ্বায়নের যুগে দ্রুতগতিতে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে উন্নতির জন্য আইসিটিভিত্তিক ব্যাংকিং এবং ই-ব্যাংকিংয়ের সবকিছুই এই আইনের আওতায় করা যাবে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি জানান, আইনটির খসড়া আইন মন্ত্রণালয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মতামত দেওয়ার পর এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আবার মন্ত্রিসভায় আসবে।
১৯৭২-৭৫ সালের আইন নতুন করে নয়, সংশোধন হবে : ১৯৭২ সাল থেকে ’৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত যেসব আইন হয়েছে সেগুলোকে নতুন আইনে রূপান্তর না করে সংশোধন করতে হবে বলে অনুশাসন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, ১৯৭২ থেকে শুরু করে ’৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত যে আইনগুলো এখন থেকে পরিবর্তন হবে, সেগুলো নতুন আইন হবে না, আগের আইন সংশোধন হবে। কারণ স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে সরকার ছিল তখন রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা কেমন ছিল সেটা ভবিষ্যতে এই আইনগুলো যদি হারিয়ে যায় তাহলে পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এই আইন কার্যকর থাকলে যারা গবেষণা করবেন বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করবেন তারা কিন্তু আইনগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পারবেন রাষ্ট্রের কাঠামো কীভাবে ডেভেলপ করা হয়েছিল এবং প্রশাসন কীভাবে পরিচালনা করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত যত আইন মন্ত্রিসভায় আসবে সেগুলো সংশোধনী হিসেবে আনতে হবে বলে জানান তিনি।