বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কিশোর অপরাধের হার কত? সরকারি হিসাব নেই, আর বেসরকারি হিসাবটাও কেউ জানে না। কিন্তু প্রায়ই সংবাদপত্র খুললে কিশোর অপরাধের ঘটনা চোখে পড়ে। আর তার চেয়েও বেশি অপরাধের ঘটনা থেকে যায় মিডিয়ার আড়ালে।
অপরাধ বিজ্ঞানীরা কিশোর অপরাধের যতগুলো কারণ নিয়ে কথা বলেন তার মধ্যে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কারণগুলোই থাকে মুখ্য। তবে আমার কাছে মনে হয় ‘প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা’র কারণটিও বর্তমান সময়ে কিশোর অপরাধের জন্য যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। কোনো অপরাধের পেছনে শুধুমাত্র একটি কারণ দায়ী থাকবে তা কিন্তু নয়, একের অধিক কারণও থাকতে পারে। পারিবারিক কারণের সঙ্গে থাকতে পারে অর্থনৈতিক কারণ, আবার অর্থনৈতিক কারণের সঙ্গে থাকতে পারে রাজনৈতিক কারণও।
পেছনের বছরগুলোতে কিশোর অপরাধের মূল খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখেছি পারিবারিক এবং অর্থনৈতিক কারণগুলো সবচেয়ে বেশি দায়ী এসব অপরাধের পেছনে। যদি কিশোর গ্যাং-এর কথাই বলি সেখানে সন্তানের প্রতি পারিবারিক অসচেতনতাকেই দায়ী করেছি, কিন্তু রাজনৈতিক কারণ, কিংবা হিরোইজম বা চ্যালেঞ্জ নেওয়ার প্রবণতা যে তাদের মধ্যে ভর করেনি তা বলা যাবে না। আবার যখন বন্ধুর হাতে বন্ধু খুন হচ্ছে কিংবা মার খাচ্ছে কয়েকটা টাকার জন্য, অথবা খেলায় হেরে যাওয়ার ফলে তখনো কিন্তু চিড় ধরা পারিবারিক বন্ধনকেই দায়ী করছি, কেউ হয়তো অর্থনৈতিক কারণও বলতে পারেন।
সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, মা-বাবার দাম্পত্য সংকট, দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক প্রাচুর্য, সন্তানের প্রতি বেশি মনোযোগ কিংবা মনোযোগহীনতা, বন্ধুদের মধ্যে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা, মেয়ে বন্ধু কিংবা ছেলেবন্ধুকে আকর্ষণ করার ইচ্ছা এসবই হতে পারে কিশোর অপরাধের এক একটি শক্তিশালী কারণ। তবে হ্যাঁ, শিশুকিশোরের সামাজিক পরিপক্বতার ক্ষেত্রে পরিবারের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তা অস্বীকার করার জো নেই। একটি শক্তিশালী পরিবার অনেক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করতে শেখায়। অপরাধ মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, সব অপরাধ ‘অপরাধ ঘটানোর’ উদ্দেশ্যে না-ও ঘটতে পারে, আবেগ নিয়ন্ত্রণে অপরিপক্বতা অনেক সময় অপরাধ ঘটায়। এভাবেই অপরাধপ্রবণতা অনেক সময় ব্যক্তিত্বের অনুষঙ্গ হয়ে যায়।
অপরাধের রূপ যুগে যুগে পরিবর্তনশীল। সময়ের ব্যাপ্তিতে ঘটে যাওয়া অপরাধগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ৯০ এর দশকে কিশোর অপরাধ ছিল পরীক্ষায় পাস না করতে পেরে আত্মহত্যা এবং ছোটখাটো চুরি ছিনতাই-নির্ভর। বিংশশতাব্দীর গোড়ার দিকে তা হয়ে যায় ধর্ষণ-নির্ভর। আর এখন পুরনো বিষয়গুলোর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রযুক্তি-নির্ভরতা। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় উৎকর্ষ প্রযুক্তিকে সবার নাগালে নিয়ে আসাই অপরাধের মূল কারণ। কেউ মার খাচ্ছে, কিংবা কাউকে কোপানো হচ্ছে, কারও কাটা পা নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে কেউ, এই ছবিগুলো আমাদের কাছে চলে আসে প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলেই। কারও সাহায্য দরকার, তাকে সাহায্য না করে ছবি তুলে ভাইরাল করছি এটাও তো একটা অপরাধ।
অপরাধ বিজ্ঞানী কাভেন এবং ফারডিনেন্ডের মতে, অপরাধ হচ্ছে এমন আচরণ যেটা সমাজ সুস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে প্রত্যাশা করে না। আর সেই একই আচরণ যখন একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক ঘটায় তখন তা কিশোর অপরাধ হয়ে যায়। সহজ, সুন্দর, স্বাভাবিক জিনিস আমাদের পছন্দ নয়, অস্বাভাবিকতার মাঝে আমরা প্রাণ ফিরে পাই। সমাজের সর্বত্রই আজ অস্বাভাবিকতার জয়জয়কার। খুব ভালো গান, খুব ভালো নাচ, খুব ভালো নাটক, ভালো কিছু জীবন ঘনিষ্ঠ কথা আজ পাওয়া দুঃসাধ্য। বরং ট্রল, সস্তা মজা করা বা মজা নেওয়া এখনকার ট্রেন্ড। সত্যিকার অর্থে, ভালো কিছু করতে গেলে অনেক অধ্যবসায়ের প্রয়োজন, যেটার সময় ও আগ্রহ আমাদের কিশোর-যুবকদের নেই।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পারিপার্শ্বিক নানা কারণে অনেক আগে থেকেই অপরাধী তালিকায় নাম এসেছে অল্পবয়সীদের। তারা মনে করেন, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি পারিবারিক শিক্ষার অভাবও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। সন্তানের শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের প্রতি অভিভাবকদের যতটা মনোযোগ দেওয়া দরকার, তা প্রায়ই দেওয়া হয় না। আবার মাদক বিক্রেতা থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ পর্যন্ত অনেকেই নিজের সামান্য লাভের জন্য কিশোরদের অপরাধ জগতে টেনে নেন। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কিশোরদের ব্যবহার করেন। ফলে একসময় এই কিশোররা পরিবারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তখন শুধু পাড়া-পড়শির নয়, নিজের পরিবারের জন্যও তারা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের দেশের কিশোররা বর্তমানে অনেক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কিশোর অপরাধ প্রবণতা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ফেইসবুকের মাধ্যমে গ্রুপ তৈরি করে নানা অপরাধ করছে কিশোররা। ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের কুপ্রভাবে অনেকে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। বাড়ছে কিশোর অপরাধ। এখন এলাকাভিত্তিক সামাজিক কর্মকাণ্ড নেই বললেই চলে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে না, খেলার মাঠ কমে এসেছে। সামাজিকভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন না থাকায় কিশোররা সাইবার জগতে ঢুকছে। সেখান থেকে যা শিখছে, তা প্রয়োগ করতে গিয়ে তারা বিপথগামী হচ্ছে বলেই মনে করছেন অপরাধ ও সমাজ বিশেষজ্ঞরা।
এখনই যদি সমাজের সুতোটা না টেনে ধরা হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এসে পড়বে। আর এটা তো অজানা নয়, ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ সুস্থ অবস্থায় বের হয় না, কোথাও না কোথাও কাটাছেঁড়া থাকেই। একটি সন্তান বিপথে গেলে সমাজের যতটা না ক্ষতি হয়, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি পরিবারের। আর এজন্যই কোনো রাষ্ট্র সমাজের সুতোটা টেনে ধরার আগে প্রতিটি পরিবারের উচিত পারিবারিক বন্ধনগুলো টেকসই করা।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি