পোশাক শিল্পের ক্রয়াদেশ স্থগিত ও বাতিলের কারণ দেখিয়ে শ্রমিকদের আগস্টের বেতনের জন্য সরকারের কাছে আবারও ঋণ প্রণোদনা চেয়েছে বিজিএমইএ। গত ২০ আগস্ট অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে দেওয়া এক চিঠিতে পোশাক মালিকদের শীর্ষ সংগঠনটির সভাপতি রুবানা হক এ আবেদন করেন। ক্রয়াদেশ বাতিল/স্থগিত ও নির্দিষ্ট সময়ে পেমেন্ট না পাওয়ার ফলে পোশাক খাত নিদারুণ আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে উল্লেখ করে বিজিএমইএ এই প্রণোদনা চেয়ছে।
এদিকে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একবার বলা হচ্ছে পোশাক শিল্প ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং এ মাসেই রপ্তানিতে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। এর মধ্যে আবার এ মাসের বেতনের টাকাই প্রণোদনা ঋণ চাইছে বিজিএমইএ। ফলে এ নিয়ে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। তারা মনে করছেন, সংগঠনটি মালিকরা সরকারকে চাপে ফেলে বাড়তি সুবিধা নিতে চাচ্ছেন। বৈশ্বিক করোনা মহামারীতে অন্যান্য দেশের মতো দেশের সবচেয়ে বড় খাত পোশাক মালিকদেরও কিছুটা এগিয়ে আসা উচিত। প্রণোদনার জন্য সরকারকে কোনোভাবেই চাপ দেওয়া ঠিক হচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা এমো. আজিজুল ইসলাম মনে করেন, পোশাক খাত করোনায় অনেক প্রণোদনা পেয়েছে। বর্তমানে এ খাতের রপ্তানিও ভালো অবস্থায় গেছে। এছাড়া পোশাক খাতকে সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে। তাই নিজস্ব অর্থায়নেই এ খাতকে এখন চলতে দেওয়া উচিত। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমস্যা হলো, গার্মেন্টস মালিকরা সারাদিন শুধু দাও দাও করতে থাকে। তাদের কি ১২ মাস লাভ করতে হবে? আমার মনে হয় শ্রমিকের বেতন পরিশোধের জন্য আর কোনো প্রণোদনার যৌক্তিকতা নেই।’
লিন পিরিয়ডেও (জুলাই-আগস্টে কাজ কম থাকাকে বলে) অধিকাংশ কারখানারই বুকিং ৭০ শতাংশের ওপরে। আগস্টের ১৯ তারিখ পর্যন্ত চলতি মাসে দেশের ইতিহাসে প্রথমবার ৫১ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এরপরও আগস্টের শ্রমিকের বেতন পরিশোধের জন্য প্রণোদনা চেয়েছে পোশাক কারখানা মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ।
মার্চে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে এপ্রিল-জুনের শ্রমিকের বেতনের জন্য ২ শতাংশ সুদে ঋণ প্রণোদনা ঘোষণা করে সরকার। পরবর্তী সময়ে কারখানা মালিকদের অনুরোধে জুলাইয়ের বেতন পরিশোধের জন্য ‘শেষবারের মতো’ আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে টানা ৬৬ দিন দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলেও এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া হয়। এছাড়া শিল্প খাতের জন্য সরকারের ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিকে অনুলিপি দিয়ে ওই চিঠিতে বিজিএমইএ সভাপতি উল্লেখ করেন, ‘প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা তাদের বর্তমান ক্রয়াদেশ স্থগিত/বাতিল করছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী এ পর্যন্ত ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রপ্তানি আদেশ বাতিল/স্থগিত হয়েছে, যা প্রতিদিনই বাড়ছে। আগের চলতি শিপমেন্টগুলোর বিপরীতে পেমেন্ট পেতেও ৮-৯ মাস সময় লেগে যেতে পারে। ক্রেতা কর্র্তৃক ক্রয়াদেশ বাতিল/স্থগিত ও নির্দিষ্ট সময়ে পেমেন্ট না পাওয়ার ফলে পোশাক খাত নিদারুণ আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে।’
রুবানা হক আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে সচল রাখা কারখানাগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা প্রদানের জন্য রপ্তানিকারকদের ওপর প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। এমতাবস্থায় তৈরি পোশাকর রপ্তানি বাণিজ্যের সক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে শ্রমিক-কর্মচারীদর অন্তত আগস্ট-২০২০ মাসের বেতনভাতাদি জুলাইয়ের ন্যায় সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণের হিসেবে প্রণোদনার আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী এমপি বলেন, ‘এটা সত্য যে ইতিমধ্যে আমরা বেশ ভালো রপ্তানি করেছি। কিন্তু সেই টাকাটা এখনো সবার আসতে শুরু করেনি। এখন দেখা গেছে যার টাকা আছে সে বেতন দিয়ে দিল। কিন্তু যার টাকা এখনো আসেনি সে বেতন দিতে পারছে না। এতে শিল্পে একটা অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। তাই সবার কথা বিবেচনা করে এ আবেদন। আমরা এটাকে তো ঋণ হিসেবে চাচ্ছি। শেষবারের মতোই এ সহায়তাটা আমরা চাচ্ছি। আগামী মাস থেকে আমাদের আর কোনো সহায়তার প্রয়োজন হবে না। আমরা নিজেরাই চলতে পারব।’
বিকেএমইএর পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘আমাদের ক্রেতারা রপ্তানির মূল্য নগদে পরিশোধ করছে না। তাই সরকার যদি কোনো কারণে ঋণ দিতে না পারে তাহলে অন্তত আমাদের রপ্তানি বিল সুদবিহীন ক্রয় করার ব্যবস্থা করে দিক।’
রুবানা হকের চিঠিতে পোশাক খাতের যে চিত্র তুলে ধরেছেন, পরিসংখ্যান তার উল্টো বলছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, করোনায় মার্চে পোশাক রপ্তানি ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ কমে ২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়। এপ্রিলের ৮৫ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে রপ্তানি আয় করে ৩৭৪ মিলিয়ন আর মে মাসে ৬২ দশমিক ০৬ শতাংশ কমে রপ্তানি হয় ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। তবে জুন থেকে এই খাত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। ওই মাসে মোট রপ্তানি হয়েছে ২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ কম। জুলাইয়ে ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কমে রপ্তানি হয়েছে ৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে দেড় গুণেরও বেশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন।
কারখানাগুলোর রপ্তানি বাড়ার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা দাবি করে আসছেন, তাদের বাতিল/স্থগিত হওয়া অধিকাংশ ক্রয়াদেশ আবারও ফিরে এসেছে। নতুন ক্রয়াদেশও যুক্ত হচ্ছে। এ কারণে রপ্তানির এত প্রবৃদ্ধি। তাই অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, যদি বাতিল হওয়া ক্রয়াদেশ ফিরেই আসে তাহলে বিজিএমইএর চিঠির যৌক্তিকতা কতটুকু। আবার যদি বাতিল হওয়া ক্রয়াদেশ ফিরে না আসে তাহলে রপ্তানিকৃত পণ্য সবই নতুন ক্রয়াদেশের। তাই বলাই যায় এ শিল্প করোনায় আগের চেয়েও আরও ভালো অবস্থানে আছে।
বর্তমানে কাজের অবস্থা জানার জন্য দেশ রূপান্তর বিভিন্ন পর্যায়ের ১০ জন পোশাক কারখানা মালিকের সঙ্গে কথা বলেছে। কারখানা মালিকরা জানিয়েছেন, জুলাই-আগস্ট বরাবরই এ খাতে ক্রয়াদেশ কম থাকে। এবার করোনার কারণে এটা যে হারে কমার কথা তার চেয়ে অনেক ভালো। দাম কম হলেও নিয়মিত অর্ডার আসছে। যেসব কারখানা একটু ছোট তাদের কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। কাজ না থাকায় কিছু কারখানা আগস্টের প্রথম ১০ দিন ছুটিও দিয়েছে। এমনটা প্রতি বছরই হয়ে থাকে। যেহেতু গত চার মাস ধরে নিজস্ব অর্থায়নে শ্রমিকের টাকা দিতে হয়নি তাই সবার কাছেই কমবেশি নগদ অর্থও আছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শীর্ষ এক গার্মেন্টস মালিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এখন এটাও দেখা উচিত যে আমরা কতদিন চলতে পারি। আগামী তিন মাস আমাদের সক্ষমতা যাচাই করা উচিত। এরপর যদি মনে হয় যে আমরা চলতে পারছি না তাহলে যারা যারা সমস্যায় আছে তাদের চিহ্নিত করে অর্থের জোগান দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন যদি চাইতেই থাকি তাহলে তো আমাদের ভিখারি ভাববে। পরে দেখা গেল যখন সত্যিকারের সমস্যায় পড়ব তখন সরকার আমাদের দিকে তাকাবে না।’